বাতুলের ন্যায় এই সম্প্রদায়ের মানুষ লোকেরা ছিন্ন বস্ত্রখণ্ড সংযোজিত করিয়া পরিধান করিয়া থাকে। ভজনগীত কালে নৃত্য ও বেশভূষা নিরীক্ষণ করিলে ইহাদিগকে বাতুল বলিয়াই অনুমিত হয়। বাতুল হইতে ইহাদের বাউল নাম হইয়াছে।
এর মধ্যে মধ্যে লালন শাহ ফকিরের তিরোধান ঘটেছে এবং সারা মধ্যবঙ্গ জুড়ে তাঁর ব্যাপক অনুসারীদের খবর মিলছে হাজারে হাজারে। ১৮৯০ সালে তাঁর প্রয়াণ সংবাদসহ ৩১ অক্টোবর ‘হিতকরী’ পত্রিকা কুষ্টিয়া থেকে যে প্রতিবেদন-প্রবন্ধ প্রকাশ করে, তাতে লেখা হয়েছে:
তিনি ধৰ্ম্মজীবনে বিলক্ষণ উন্নত ছিলেন…নিজে লেখাপড়া জানিতেন না; কিন্তু তাঁহার রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাহাকে পরম পণ্ডিত বলিয়া বোধ হয়।…সকল ধৰ্ম্মের লোকই তাঁহাকে আপন বলিয়া জানিত।
এই প্রথম একজন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ভদ্রলোক লালনের জীবনপ্রণালী ও গান সম্পর্কে শিষ্ট এমনকী প্রশংসাযুক্ত উক্তি করলেন। দেখা যাচ্ছে ১৮৯০ সাল নাগাদ বাউল-ফকিররা ততটা অপাঙ্ক্তেয় নেই বা নিন্দাযোগ্য হয়নি। লালনের সমসময় এবং তিরোধানের পর মধ্যশিক্ষিত গ্রামবাসীশ্রেণি শখের বাউলের দল গড়ে এক ধরনের ভাবমূলক এবং নির্বেদচিন্তার গান গাইতে শুরু করেছিলেন। প্রধানত কাঙাল হরিনাথের রচিত ও অন্যান্যদের সেই গান কলকাতা ও ঢাকাতেও জনপ্রিয় হয়েছে। সেইসব ভাববহুল গানের ধাঁচে আকৃষ্ট হয়ে অনেক নগরবাসী ভদ্রলোক বাউল গান লিখতে থাকেন, যার সেরা নমুনা মেলে কবি বিহারীলালের ‘বাউল বিংশতি’-তে।
কিন্তু বাউলদের গান রচনা তাঁদের জীবনের একটা প্রকাশপিপাসু বাসনার সৃজন হলেও আসল সাধনা তাদের দেহতত্ত্বগত করণকৌশল, যা গোপ্য ও গুরুকেন্দ্রিক। সমাজের ধর্মধারণা ও আচরণের সাত্ত্বিক মূল স্রোতের প্রতিবাদী বা বিরুদ্ধবাদী এই সাধকরা এমন সব বিশ্বাসের কথা বলতে থাকলেন যা উচ্চবর্গের সমাজ ও ধর্মবোধকে প্রত্যক্ষভাবে আঘাত করতে লাগল। শ্রীরামকৃষ্ণ এই সাধনাকে স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা করলেন। ব্রহ্মবাদী সম্প্রদায়ের ভাল লাগেনি এমন ইহকেন্দ্রিক দেহসর্বস্ব সাধনাকে। বিশেষত বাউল ফকিররা অনুমানবাদে মোটেই বিশ্বাসী ছিল না, পূর্ব ও পরজন্মে ছিল সন্দিহান, মন্দির মসজিদের ছিল বিরোধী।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়; বাউল ফকিরদের মতো অন্যান্য গৌণধর্মীদের, বৃহত্তর হিন্দুসমাজ উনিশ শতকে বৈশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও নিন্দা করেই ক্ষান্ত হয়েছে— প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামেনি। এই প্রতিবাদ প্রতিরোধ ও বাউল উৎসাদনে নেমেছিল মুসলমান সমাজের কট্টর অংশ। শরিয়তি অনুশাসন থেকে বেরিয়ে এসে দলে দলে বহু সাধারণ অশিক্ষিত মুসলিম বাউল ফকির হতে থাকে। ওহাবী, ফরায়জি ও আহলে হাদিস আন্দোলন এবং সংরক্ষণশীল মুসলিম মানসের বিরুদ্ধাচরণে বাউলরা বিপন্ন হয়। তাদের ওপর দৈহিক অত্যাচার ও সামাজিক বয়কট চলতে থাকে। এ সবের বিশদ নমুনা পাওয়া যায় ১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ বইতে। এই পক্ষের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল ইসলাম ত্যাগীদের দুরাচার— এবং অজ্ঞ গ্রামবাসী মুসলমান শ্রেণির মধ্যে তাদের দুর্বার অনুপ্রবেশের আশঙ্কা। ফৎওয়ায় বলা হয়েছিল:
মোছলমানের মধ্য হইতে একদল লোক বাহির হইয়াছে, যাহারা, ‘বাতেনী দোরবেশ ফকীর’ বলিয়া দাবী করে। উহাদের প্রকাশ্য নাম ‘বাউল’ বা ‘ন্যাড়ার ফকীর’।
লক্ষণীয় যে ধর্মত্যাগীদের একই সঙ্গে বাউল ও ফকির বলা হয়েছে। পরবর্তীকালেও নানা রচনায় দেখা গেছে বাউল আর ফকিরদের সমার্থক বলে মনে করা হয়েছে। বাউলবিরোধী আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য লালন শাহ ফকির ও তার অনুসারী লালনপন্থীরা। ধর্মপ্রাণ শরিয়তনিষ্ঠ মুসলিম মানসে বাউলদের সম্পর্কে ঘৃণা ও বিদ্বেষ উৎপাদনের জন্য ফৎওয়ায় নানা অলীক অভিযোগ পেশ করা হয়েছিল। যেমন:
তাহারা মোছলমানের দোরবেশ, আলি, শাহ্, ফকিরের পরিচয়ে মোছলমান সমাজে মিলিয়া মিশিয়া, তাহাদের কন্যা ও ভগ্নিকে বিবাহ করতঃ গুপ্ত শক্তভাবে পর্দ্দায় থাকিয়া নানারূপে ছলে, বলে ও কৌশলপূৰ্ব্বক পবিত্র কোরআন ও এছলামকে ধ্বংস করার মানসে, বিষম থোকার জাল ফেলিয়া, মোছলমান সমাজকে জর্জ্জরিত ও মূর্খ মোছলমানকে ধর্ম্মভ্রষ্ট করিতেছে। আবার হিন্দুজাতির বৈরাগী সাজিয়া, কামাখ্যা, নবদ্বীপ, কাশী, বৃন্দাবন, কান্তজী প্রভৃতি হিন্দু তীর্থস্থানে তীর্থ ও দেবদেবীর পূজা করিয়াও থাকে।
এ-বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, অভিযোগ মূলত ভেকধারীদের সম্পর্কে। একদিকে তারা দরবেশ-অলি-ফকির সেজে মুসলমান সমাজে ধ্বংসের বীজ পুঁতছে, আরেকদিকে হিন্দু বৈরাগী সেজে তীর্থ ও ভজনপূজন করছে। তার মানে এরা ঠিক ধর্মাচারী নয়— ভণ্ড, মেকি ও প্রতারক। কিন্তু অভিযোগ কেবল এইটুকু বা এত সামান্য নয়। বলা হয়েছে:
তাহারা হায়াজ নেফাজের রক্ত, বীৰ্য্য, মল, মূত্র, গর্ভপাত শিশুর মাংস, গাঁজা, ভাঙ্গ, মদ ইত্যাদি নাপাক জিনিস ভক্ষণে রিপুদমন করে। স্ত্রী যোনি ও অগ্নিকে ছেজদা করে। দলে দলে স্ত্রীপুরুষ একত্র উলঙ্গ হইয়া নাচিয়া গাহিয়া কাম-রিপু দমন হইয়াছে কিনা তাহার পরীক্ষা এবং তাহাতে যে বীর্যপাত হয়, তাহা ময়দার সহিত মিশাইয়া রুটি প্রস্তুত করতঃ ‘প্রেমভাজা’ নামক উপাদেয় (?) মারফতী খানা খায়। তাহারা পরস্পর পরস্পরের স্ত্রীকে ব্যবহার করিয়া হিংসা রিপু দমন করে ও স্ত্রী-পুরুষ মিলিত হইয়া খমক, খঞ্জরী, জুড়ি বাজাইয়া দেহ-তত্ত্ব ফকীরি গান করতঃ ভিক্ষা করিয়া বেড়ায়।
