এমনই একজন অন্তেবাসী বাউল আমাকে সমাদর করে চিঠি লিখে নেমন্তন্ন করেছিল জয়দেব কেঁদুলির মেলায়। পরে সেই বেণীমাধব দাস আর তার ‘ফকির বাউল আখড়া’য় আমি অনেক ভদ্রসন্তানকে নিঃসংকোচে নিয়ে গেছি। আখড়ার মধ্যমণি হয়ে একটা বড় কাঠের ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছে বেণীমাধব। প্রসন্ন চোখমুখ, সেবাপরায়ণ মন, কৃষ্ণকান্ত দেহ। আখড়ায় যে আসছে, একটানা গান শুনছে, ঘড়ি ঘড়ি হাতে এসে যাচ্ছে ধূমায়িত চা। পরে সকলেই পাবে অন্নসেবা— অবশ্য মাটিতে বসে, সকলে সবজাতিবর্ণ মিলে সেই সেবা— অজস্র স্বেচ্ছাব্রতী কর্মী নিরলস খেটে যাচ্ছে পরিবেশন ও রান্নার কাজে। অথচ বেণীমাধব তো কোনও সম্ভ্রান্ত মহান্ত নয়— চেয়েচিন্তে ধারকর্জ করে সে চাল ডাল গুড় সবজি এনেছে। আখড়ার মধ্যে ছোট ছোট খুপরি করে আয়োজন করেছে অতিথিদের বিশ্রামের, মেয়েদের আব্রুর। তার ছেলেবেলার স্মৃতি বলতে গ্রাম-নদী-দারিদ্র্য। ছাড়াছাড়াভাবে লেখাপড়া শিখে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে ইস্তফা, তার মধ্যেই আটবার স্কুল বদল— এ-আত্মীয় ও-আত্মীয় বাড়ির কৃপায় যেটুকু যেমন আশ্রয় জুটেছিল। তারপরে দরিদ্র সংসারে অবশ্যম্ভাবী শিশুশ্রমিকের হরেক বৃত্তি নেওয়া— চায়ের দোকানে বয়, সবজি বিক্রি, সাইকেল সারাই, হকারি। মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে পায়ে হেঁটে আশপাশের গ্রামে ভিক্ষাবৃত্তি। পরে একা একা, খঞ্জনি বাজিয়ে।
এবারে বেণীমাধব হিসেব করে দেখল গাঁয়ে গাঁয়ে পায়ে হেঁটে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ নামগান শোনালে গেরস্থরা তেমন একটা উপুড়হস্ত করে না, তাই অন্য গান চাই, অন্তত রোজগার বাড়াতে গেলে। গান তো অনেকই জানা ছিল তার কিন্তু যন্ত্র? যন্ত্র কেনার পয়সা কই? থাকার মধ্যে ওই সেই সাবেক খঞ্জনি জোড়া। হঠাৎ একজন একটা গুপিযন্ত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল বাজাতে। মজার কথা হল যে দিল যন্ত্রটা সে নিজে সেটা বাজাতে জানত না। বেণীমাধব কিন্তু স্বল্পায়াসেই বাজাতে পারল। আর তাকে দেখে কে?
এভাবেই বেণীমাধব হয়ে গেল বাউল গানের গায়ক। তার বংশে প্রথম একজন গানের এই নতুন জীবিকাধারী হয়ে উঠল। তারপরে একদিন একজন প্রবীণ বাউল বেণীকে নিয়ে গেল ‘নিরাময়’ নামের যক্ষ্মা হাসপাতালে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রুগি আর নার্সদের গান শোনানো, সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। অনেক পয়সা হত কিন্তু ভাগের সময় দেখা যেত কম। কী ব্যাপার? সেই বুড়ো বাউল থলির মুখটা নিচু করে পয়সা নিয়ে নিত অদ্ভুত কায়দায়। সন্দেহ হত কিন্তু বেণী ভয়ে কিছু বলতে পারত না, যদি সে তাকে সব জায়গায় না নিয়ে যায়। বেণীকে কে আর চেনে? কেই বা গাইতে দেবে? একদিন রাগে দুঃখে শূন্য থলেতে হাত পুরে বেণী টের পায় থলের মধ্যে আটটা খোপ, তার চারটেয় এমন কৌশল যে উপুড় করলেও পয়সা পড়বে না। প্রবঞ্চিত বেণী খেপে উঠে চেঁচায়, লোকটা ধরা পড়ে রেগে যায়। তাকে মারে লাথি চড় ঘুসি। জীবনে বলতে গেলে এই প্রথম বাইরের লোকের হাতে মার খাওয়া। খুব কান্না কাঁদল বেণীমাধব। অভিজ্ঞতা এমন করেই তাকে বড় করে তুলল দিনে দিনে। কিন্তু যাবে কোথায় সে? একা একা তো সর্বত্র গান করার সুযোগ ঘটে না, দলে থাকতে হবে। কোনও একটা বাউলের দলে।
কিন্তু সে সময়ে অর্থাৎ বেণীমাধবের কৈশোরে এত তো বাউলের দল ছিল না, ছিল না তার এখনকার মতো জনাদর। বীরভূমে তার চেনা পরিধির মধ্যে ছিল মাত্র দুটো দল। একটা নবনীদাসের আরেকটা স্থানীয় পঞ্চরত্নের দল। তাতে সদস্য ছিল গঙ্গাধর দাস, নারায়ণ দাস এরা। গানটা বেণী ভালই গাইত। গঙ্গাধরের মনে ধরে গেল, তাকে নিয়ে নিল দলে। পারিশ্রমিক একরাতে দু’ টাকা। অনেকে গান শুনে ব্যক্তি-শিল্পীকে আলাদা পয়সা দিত, দলের নিয়ম ছিল সে পয়সা যার যার তার তার। কিন্তু বেণীকে তা দেওয়া হত না— অন্যেরা নিয়ে নিত। বঞ্চনা ও অত্যাচারের এতেই শেষ নয়। স্রেফ দলে টিকে থাকার জন্যে বড়দের তোয়াজ করা, ফাইফরমাশ খাটা বা গা-হাত-পা টিপে দেওয়া। তার অন্যথা হলেই মার। কেঁদে লাভ নেই, ক্ষোভ চেপে রাখতেই হবে। কারণ দলে তো কেউ তাকে ধরে রাখেনি। অথচ দলে তাকে থাকতেই হবে, নইলে তার নাম-যশ ছড়াবে কী করে? খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা লাভের দুর্দম খিদে তখন বেণীমাধবের। নিজের একটা আলাদা পরিচিতি চাই-ই চাই, অতএব চোখ বুজে শাসন শোষণ মেনে নিয়ে কেটে গেছে তার কৈশোর কাল।
তারপরে যৌবন সূচনাতেই তার সুনাম ছড়িয়ে গেছে, পঞ্চরত্ন দল ছেড়ে সে গড়ে তুলেছে বেণীমাধবের দল। স্বাধীন আর স্বয়ম্বশ। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন সে কেঁদুলি মেলার আখড়াধারী। অতিথি, দুঃস্থ, ক্ষুধার্ত ব্যক্তি এবং মান্যমানদেরও সে এখন সেবা দিতে পারে।
বাউলদের নিয়ে বা তাদের তত্ত্ব ও জীবনদর্শন নিয়ে যারা ইতিহাস ধরে জানতে চায় তাদের চোখে না পড়ে পারে না যে প্রথমদিকে বাউল ও ফকির এই দুই সাধনপন্থা বা আচার আচরণ ক্রিয়াকরণ বিষয়ে কোনও স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ ছিল না। ১৮৪৬ সালে ইন্ডোলজি চর্চাকারী এইচ. এইচ. উইলসন সাহেব গৌণধর্মী সাধকদের বিবরণে বাউলদের কথা এনেছিলেন। অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৭০ ও ১৮৮৩ সালে লেখা তাঁর দুটি বইতে প্রায় উইলসনের ধারণার প্রতিধ্বনি করে গেছেন। বাউলদের ধর্মাচরণ ও জীবনযাপন সম্পর্কে এঁদের ধারণা ছিল কিছুটা ভ্রান্ত, অস্পষ্ট অথচ বিরুদ্ধ। ১৮৯৬ সালে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ তো বাউলদের সম্পর্কে যথেচ্ছ কটুক্তি করেছেন। ১৮৯৮ সালে মৌলবি আবদুল ওয়ালি তাঁর একটি দীর্ঘ নিবন্ধে মুসলমান ফকির ও হিন্দু বৈরাগী বলে বিভাজন করেছেন— লালনকে (মৃত্যু ১৮৯০) তিনি ফকিরদের দলভুক্ত করেছেন। এঁদের লেখালেখির সমসময়ে নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘বিশ্বকোষ’-এ ‘বাতুল’ থেকে ‘বাউল’ এমন মত প্রতিষ্ঠা করে মন্তব্য করেছেন।
