১৩২০ বাংলা সনের ১৩ই পৌষ জন্মেছিলেন বলহরি ঘাটকৈর গ্রামে। বাবা শ্রীকান্ত দাস, মা শরৎসুন্দরী। ছোটবেলা থেকে গানপাগল আর মিষ্টিগলা। তবে শৈশবেই পিতৃহারা, তাই মাতৃস্নেহে পালিত। মায়ের সঙ্গে সর্বদা মেয়ে সেজে থাকতেন এবং তার ফলে স্বভাবে আচরণে মেয়েলিপনা এসে যায়। নারীসাজ তাঁর এত স্বাভাবিক ও নিখুঁত ছিল যে একবার জমিদার নরেন্দ্রনাথ সাহাচৌধুরীর সঙ্গে কলকাতা ভ্রমণে এলে পুরুষরা ট্রামে তাঁকে লেডিজ সিট ছেড়ে দেন।
বলহরি বললেন, ‘মেয়ে সেজে থাকতাম, গান গাইতাম, তাই যাত্রাদলে ডাক এল— একচেটিয়া ফিমেল পার্ট— খুব লোকপ্রিয় ছিলাম। দেশভাগের বছরে পাবনা জেলার সুজানগর থানার শ্যামগঞ্জের হাটে আমাকে নিয়ে তো রায়ট বাধার জোগাড়। হাটে বছিরুদ্দিন মিঞা নামে এক ধনী মুসলিম আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল, “হিন্দুরা সব চলে যাচ্ছে, আমি এ মেয়েডারে ছাড়ুম না।” যাকে বলে “বলপূর্বক নারীহরণ” বুঝলেন? তারপরে চারদিকে রটে গেল, সাগরকান্দী থানায় খবর গেল হাট থেকে হিন্দুরমণী নিয়ে যাচ্ছে বছির মিঞা। পুলিশ এসে বন্দুকে ফাঁকা আওয়াজ তুলে লোকজন সরিয়ে ঘিরে ধরে। ব্যাপার দেখে সাগরকান্দীর ননী পোদ্দার হেসে বলে, “আরে বছির তুই কাকে নিয়েছিস? এ তো আমাদের বলহরি— ঐ যে গান গায়।” আমি কিন্তু রা কাড়িনি বুঝলেন, ভাবছিলাম দেখা যাক রগড় কদ্দুর গড়ায়।’ বলহরি একটু থেমে রসান দিয়ে বললেন, ‘এ ঘটনার আগে আমি আরেকবার অপহৃত হই। সেবার সরাসরি যাত্রার আসর থেকে আয়ুব খানের খানসেনা আমাকে সখীর সাজপরা অবস্থায় ধরে তাদের ব্যারাকে নিয়ে গিয়ে তোলে। তারপরে বুঝতেই পারছেন, ব্যাটাদের সেকি আফশোস।’
এমন আদ্যন্ত রসিক মানুষটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলেন বৈরাগ্যপন্থী। ঘর সংসার করেননি। লালন শাহর প্রশিষ্য মহম্মদ কুতুব আলির কাছে বলহরি নেন তত্ত্ব জ্ঞানের দীক্ষা শিক্ষা। তবে কায়াসাধন করেননি। গানে গানে মাতিয়ে দিয়ে গেছেন দুই বাংলা অর্থাৎ সীমান্তের এপার আর ওপারের উত্তরবঙ্গ। না, ফরাক্কার এপারে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় সমভূমি তার বিচরণস্থল ছিল না। পশ্চিম ও পূর্ব দিনাজপুরে ছিল এবং এখনও আছে অনেক শিষ্য, প্রধানত গানের। সীমান্তে তার ছাড়পত্র লাগত না। গানের সুরের আসন পেতেছিলেন ভক্তদের প্রাণে। এ অঞ্চলের সকল গায়ক তাকে ‘বাউল সম্রাট’ শিরোপা দিয়েছিল। ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী ও রসিক। আশি ছুঁই ছুঁই বয়সে, আমার অনুরোধে, বলহরি একহাতে একতারা নিয়ে কোমরে আরেক হাত রেখে যে-আশ্চর্য নাচ নেচেছিলেন লালনের গানের সঙ্গে, তাতে একটা অন্য নাচের ঘরানার ছাপ ছিল। তাঁর মৃত্যুতে নিঃসন্দেহে উত্তরবাংলার বাউল গানের পরিমণ্ডল বিষণ্ণ ও কিছুটা রিক্ত হয়ে গেছে।
বলহরি ছিলেন জন্মসূত্রে নিম্নবর্গের নমঃশূদ্র। একথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল যে এখনকার পশ্চিমবঙ্গের যত গায়ক বা গায়িকা বাউল গান গেয়ে বেঁচে আছেন ও সংসার চালাচ্ছেন তাদের একটা বড় অংশ নিম্নবর্গ থেকে আসা। ভদ্ররকম জীবিকা জোটেনি তাদের— কায়িক শ্রমে আছে কুণ্ঠা বা আলস্য। অগত্যা বাউলের আসর তাঁদের দিশা দিয়েছে। বেশি গান হয়তো সঞ্চয়ে নেই, নেই তেমন গানের শিক্ষা, কিন্তু আছে উদ্যম ও মরিয়া লড়াই।
অন্য সব পথ বা জীবিকা ছেড়ে কেন যে এরা বাউলের মার্গে আসে তার কারণ এক একজনের কাছে এক এক রকম, তবে অনেকে আসে গানের নেশায়। যেমন ধরা যাক কার্তিকের কথা। মাঠে চাষ করা, মাছ-ধরা, মুনিশ-খাটা এক শ্রমজীবী ঘরের ছেলে সে, হঠাৎ কীভাবে খমক, খঞ্জনি, একতারা, ডুবকি আর দোতারার সুর তাকে উদ্ভ্রান্ত করেছিল কে জানে। তার আড়ষ্ট হাতের খমক বাজনা আর অপটু গলার গান শুনে তবু তাকে ভরসা দিয়েছিল বন্ধুরা, বাড়ির লোকজন— ভাইবোন, বাবা-মা। শেষমেশ বাগদি ঘরের কার্তিক হয়ে গেছে বাউল। মাধবদাস বাউলের কাছে দীক্ষা— বাউল পথের আর বাউল গানের। কিন্তু গুরুর সঙ্গে আড়াআড়ি ঘটে গেল। কারণ গুরুর আশ্রমে আশ্রিত একটি মেয়ের সঙ্গে তার প্রণয়। দুজনে একসঙ্গে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল গুরুর কাছে। গুরু তাকে তাড়িয়ে দিলেন। আশ্রমচ্যুত, নিরাশ্রয়, অন্ন নেই— সে এক কঠিন সময় গেছে কার্তিকের। এদিকে দুর্জয় মনের টান দুজনের— আসঙ্গ পিপাসা। অদম্য সেই টানে আবার যোগাযোগ, আবার পলায়ন। এবার দুজনকে আশ্রয় দিলেন জীবন গোঁসাই। তাঁর কাছে হল বাউল মতে কায়া সাধনার শিক্ষা। মেয়েটি হল সাধনসঙ্গিনী।
কাহিনিটি যত সরলরৈখিক, জীবন তত বক্র। কাজেই কার্তিকের কঠিন আত্মসংকটের দিনগুলো পেরোনোর কথা এ-আখ্যানে উহ্য থাকল। দুজনের দুখের কুটির, দিন গুজরান, মাধুকরী, গান গেয়ে গেয়ে গলা চিরে যাওয়া, সাধনসঙ্গিনীর ভিক্ষাবৃত্তি, আবার সন্তান পালন ও ক্ষুন্নিবৃত্তি— এমনতর দিনযাপন গড়পড়তা বাংলার বাউলের জীবনে নির্মম সত্য। এর কোথাও বিদেশভ্রমণ, ডলার উপার্জন, লালসা কিংবা ভোগবাদের স্পর্শমাত্র নেই। অথচ এরাই এখনকার বাউলের গরিষ্ঠ অংশ। মেলা মচ্ছবে এরাই সকল অতিথিকে সেবা দেয়, শুশ্রুষা দেয়, ভালবাসে। জন্ম এদের প্রধানত হীন বা অচ্ছুৎ বংশে— হাড়ি, ডোম, বাগদি, দুলে বা রাজবংশী এরা, অনেকে ‘অর্জল’ পর্যায়ের মুসলমান অর্থাৎ নিকিরি বা জোলা বা নলুয়া— শরিয়তি খানদানে তারা অস্পৃশ্য— বেশরিফ।
