দেশ ভরেছে বাবু বাউলে
তারা জামা জোড়া পরছে এখন
ডোর কৌপীন খুলে ফেলে—
দ্যাখো বাবু বাউলে।
কোথায় গেল সে আংরাখা
কোথায় গেল মালা
কোথায় গেল পায়ের নূপুর
কোথায় গেল ঝোলা।
তারা ঘুরছে এখন পার্কে লেকে
রেডিও নিয়ে বগলে।
বটের বাউল কোথায় পাব
বট ভেঙেছে ঝড়ে
সাধনা নাই শখে সবাই
বেতারে গান করে।
রাধাময় কয় যা আছে তা
ক্যামনে রাখি আগুলে।
শেষ পঙ্ক্তির আর্তিটুকু সত্য ও মর্মন্তুদ— যা আছে, এখনও যা আছে, তা কেমন করে আগলে রাখা যাবে?
আসলে তো জীবনচর্যাটাই বদলে গেছে চলে গেছে— ধ্যান ও অন্তর্বীক্ষণের গভীর নির্জন প্রহর। রাধাময় দাসদের মতো বিচিত্র সাধকদের সন্ধান কে আর দেবে? তাই তার কথা একটু বলি।
বর্ধমানের অন্তর্গত খাসপুরে রশীদ ডাক্তারের যে পুত্রসন্তান জন্মায় ১৯৩০ সালে তার নাম রাখা হয় কাজী নুরুল ইসলাম। বীরভূমের খুজুটিপাড়ায় কাটে নুরুলের ছাত্রজীবন। পরে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের সান্নিধ্যে জেগে ওঠে সৃজন প্রতিভা নিজের লেখক নাম নেন কুমুদকিঙ্কর। তারপরে বর্ধমান শহরে সংক্ষিপ্ত বসবাসকালে তিনি জড়িয়ে পড়েন সুভাষপন্থী রাজনীতিতে—পরে তাতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চলে আসেন সেই পুরনো খুজুটিপাড়ায়। সেখানে আলাপ ও ভাবসম্পর্ক গড়ে ওঠে সেখানকার সরকারি হাসপাতালের নার্স আশালতার সঙ্গে। এই আশালতা একজন ব্রাহ্মণকন্যা। বীরভূমের কুণ্ডলা গ্রামের তারকনাথ মুখোপাধ্যায় তার পিতা। বিয়ে হয় সিউড়ির ধ্বজাধারী চট্টরাজের সঙ্গে। আঠারো বছর বয়সেই ঘটে আশালতার বৈধব্য এবং সেইসঙ্গে পিতৃবিয়োগ। এরপরে সেবিকাবৃত্তি ও খুজুটিপাড়ায় নুরুলের সঙ্গে প্রণয়। ইত্যবসরে নুরুল ইসলাম পেয়ে গেছেন ভাব-জগতের দিশা। তাই সংসার, সমাজ ও ধর্মের বন্ধন কাটিয়ে মুর্শিদাবাদের রাধার ঘাটে নিতাই খ্যাপার কাছে তার আশ্রমে নেন মন্ত্ৰীক্ষা ও সন্ন্যাস। নুরুল ইসলামের নতুন নাম হয় রাধাময় গোস্বামী। আশালতাকে ধর্ম ও সাধনসঙ্গিনী করে কেন্দুলিতে আশ্রম গড়েন রাধাময়। ১৯৮৯ সালে সেখানেই তার প্রয়াণ ঘটেছে। এমন বিচিত্র জীবনকাহিনি কত যে আমার সংগ্রহে আছে!
যেমন ধরা যাক, মাস কয়েক আগে হঠাৎ লোকমুখে খবর পেলাম বলহরি দাস দেহ রেখেছেন। এতবড় এই দেশে এটা কী আর এমন খবর? কিন্তু আমার কাছে অনেকটাই। বছর তিনেক আগে উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জের অন্তর্গত সুভাষগঞ্জে তরণীসেন মহান্ত-র আস্তানায় বলহরিকে প্রথম দেখি। তখনই বেশ বৃদ্ধ।
বলহরিকে যখন দেখি তখন তিনি আশি ছুঁই ছুঁই বয়সের। ধবধবে ফরসা পাঞ্জাবি ও ধুতি-লুঙ্গি পরনে। গলায় একগাদা মালা— স্ফটিক-প্রবাল-পদ্মবীজ ও রুদ্রাক্ষের। সুদর্শন, চমৎকার নম্ৰ কণ্ঠস্বর। মানুষটি রসিক। বললেন, ‘কারুর নাম বলহরি শুনেছেন? আসলে বাবা-মা জন্মকালেই আমার স্বরূপ তত্ত্ব বুঝে খরচের খাতায় নাম তুলে দিয়েছিলেন। নইলে শ্মশানযাত্রায় যে বুককাপানো হুংকার তোলে মানুষ সেই বলহরি নাম দেবেন কেন? তা আমিও হয়ে গেলাম জ্যান্তে-মরা অর্থাৎ বাউল। কিন্তু সে তো অনেক পরে, যৌবন পেরিয়ে… তার আগে খুব মজার লাইফ আমার।’
বলহরি দাসের ‘লাইফ’ জানার আগে এটা কবুল করা দরকার যে, বীরভূম-বাঁকুড়া-মুর্শিদাবাদ-বর্ধমানে যেসব গেরুয়াধারী বাউল দেখি বলহরি সে-গোত্রের নন। তার বহির্বাস শ্বেতশুভ্র, কারণ তিনি উত্তরবঙ্গের বাউল। উত্তরবঙ্গের বাউল কথাটা স্বরিরোধী কারণ ওই অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে এবং বেশ কিছুকাল পরেও কোনও বাউল-ট্রাডিশন ছিল না। জলপাইগুড়ি, রায়গঞ্জ, কোচবিহার, মালদহ, পশ্চিম দিনাজপুর, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং এসব জায়গায় বাউল আখড়া, বাউল গান, বাউল সাধনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। অঞ্চলের জনবিন্যাসে মিশ্র সংস্কৃতির ভূমিপুত্রদের সঙ্গে মিশে আছে ওপার বাংলার উদ্বাস্তুরা— তাদের জীবনে বাউল সংস্কৃতি তেমন ছিল না, যদিও লালন সমকালে অর্থাৎ দুশো বছর বা তার আগে কুষ্টিয়া-পাবনা-রাজশাহী-রংপুর ধরে বাউলদের একটা ধারা ছিল। কিন্তু মৌলবাদী আলেম মুসলমানরা এ অঞ্চলে বাউলখেদা আন্দোলনে দুর্বার ছিল। হয়তো সেই কারণে আত্মগোপনকারী বাউলরা ছড়িয়ে গেছে নানাদিকে।
দেশত্যাগী যেসব বাউল এখন উত্তরবঙ্গে বা বিশেষ করে পশ্চিম দিনাজপুরে বেশ নাম করা তাদের কয়েকজনের নাম ও জন্মস্থানের পরিচয় দিলে বোঝা যাবে ওই অঞ্চলের বাউলদের পরিচয়। বলহরি দাসের জন্ম রাজশাহীর নওগাঁ মহকুমার মান্দা থানার ঘাটকৈর গ্রামে। নৃপেন্দ্রনাথ বা খেড় ঘোষ জন্মেছেন নওগাঁ মহকুমার বদলগাছি থানার রথপাড়া গ্রামে, তরণীসেন মহান্ত-র জন্ম পাবনা জেলার অষ্ট মুনিষাগ্রামে, গোবিন্দদাসের জন্ম বগুড়া জেলায় গোবিন্দপুর গ্রামে, বিনয় মহন্ত জন্মেছেন উত্তর করিঞ্জির মাকৈল গ্রামে, ধীরেন মোহন্ত জন্মেছেন রংপুর জেলার বদরগঞ্জে। এঁরা এবং এঁদের মতোই বেশ কিছু উদ্বাস্তু মানুষ গত এক দুই দশকে গড়ে তুলেছেন উত্তরবঙ্গের বাউলসমাজ। এঁদের একটা বড় বাৎসরিক সমাবেশ (সূচনা ১৯৮৯) হয় রায়গঞ্জের সুভাষগঞ্জে ১লা বৈশাখ তারিখে প্রধানত তরণীসেন মহান্তর উদ্যোগে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেখানে একটা স্থায়ীমঞ্চ গড়ে দিয়েছেন। বলহরি সেই মঞ্চের ভেতরদিকে একটা প্রকোষ্ঠে বসে কথা বলছিলেন। তার কথা বলবার আগে জানা দরকার যে উত্তরবঙ্গের বাউলরা সংযত স্বভাবের ভক্তপ্রাণ ব্যক্তি। কেউই গেরুয়া পরেন না, সকলেই শুভ্রতার অনুরাগী। মাথায় চুড়া করে ধম্মিল্ল বাঁধেন না, নৃত্যের পরম্পরা নেই বলা যায়। এঁরা প্রধানত সংসারী ও শান্ত। গানের চটকের চেয়ে গানের তত্ত্ব বিষয়ে বেশি আগ্রহী, তাই আসরে প্রশ্নোত্তরমূলক (যেমন ‘গুরু-শিষ্য,’ ‘শরিয়ত-মারফত’, ‘ভক্ত-ভগবান’) গানের পাল্লাদারি খুব জনপ্রিয়। এঁরা কেউ বিদেশ যাননি বা সাহেব মেমদের পাল্লায় পড়েননি। বাড়ি গাড়ির বা প্যান্ট শার্টের দেখনদারি নেই। হাতে বড়জোর একটা হাতঘড়ি। এবারে শোনা যাক বলহরি-বৃত্তান্ত।
