অতি উৎসাহে বাউল বা লোকসঙ্গীত শিল্পীকে আমরা সরিয়ে আনি তার জীবনচর্যা থেকে। তার ফলে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়ে যায়। ক্রমশ সেও আমাদের কৃত্রিমদ্রব্য সরবরাহ করতে থাকে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বাস্তব বিশ্লেষণের মধ্যে যেমন সমাজ সত্য আছে তেমনই আর্টের সত্য আছে। বাউলকে যদি তার নিজস্ব সাধন ভজনের জগতে না থাকতে দিই, বারেবারে তাদের টেনে আনি আলোকোজ্জ্বল শহুরে মঞ্চে, আমাদের বিনোদনের কারণে, তবে তারা সাজগোজ কৃত্রিম গায়ন আর চটকদার ভাবভঙ্গিতে গ্রস্ত হবে তাতে সন্দেহ কি? বাউলরা তো কোনওদিন আত্মবিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত ছিল না— থাকত আপন আপন ভজন কুটিরে, ঘুরত পথে প্রান্তরে, মেলা মচ্ছবের সম্মিলনে। গানকে জানত তত্ত্ব বলে। তার ছিল তিনটে পর্যায়— আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব আর দেহতত্ত্ব। এ ছাড়া ছিল দৈন্য ও মনঃশিক্ষার গান। কোথায় গেল সেইসব আত্মগুপ্ত ঠাঁইনাড়া স্বভাবের বাউল সাধক? নবনীদাসের কথা মনে পড়ে। জন্মেছিলেন একশো বছরেরও আগে বীরভূম জেলার গুনুর ভুমরি গাঁয়ে। পিতামহ অনন্ত গোঁসাই। পিতা অক্রূর গোঁসাই। সামান্য লেখাপড়া শিখে দশ বছরে মন্ত্র দীক্ষা চাঁদপুরের খেপি মায়ের কাছে। তারপরে বৈরাগ্য দীক্ষা নারায়ণ গোঁসাইয়ের কাছে। এবারে শুরু হল একসঙ্গে সংসার আর গানের জীবন, ভ্রাম্যমাণ সত্তার পরিক্রমণ। স্ত্রী ব্রজবালা আর বোন ফুরুবালা। একে একে সন্তান হল অন্নপূর্ণা-রাধারানী-পূৰ্ণদাস লক্ষ্মণদাস-চক্রধর।
কিন্তু মানুষটা সংসারী ছিলেন না। গান গেয়ে বেড়াতেন গাঁয়ে গাঁয়ে আর মাঠে মাঠে বাউল তত্ত্ব নিয়ে গানের পাল্লাদারি হত বোন ফুরুবালার সঙ্গে। নবনীদাসের দীক্ষিত শিষ্য ছিল মাত্র দুজন— হরিদাস মহান্ত আর ক্ষুদিরাম দাস। সুদর্শন হরিদাস পরে বিয়ে করেন ফুরুবালাকে, নবনীর সেটা পছন্দ হয়নি। সে যাই হোক, সারাজীবনই নবনী খ্যাপা ঠাঁই বদলেছেন। বিয়ের আগে ছিলেন জয়পুর গ্রামে, সেখানে থেকে উঠে আসেন বসোয়া-বিষ্ণুপুরে। বেশ কিছুকাল ছিলেন নানুরে। পরে ক্রমান্বয়ে বাস্তু গড়েছেন ও ভেঙেছেন— উবরুন্দি চিৎগাঁ, রায়ান-বেলুটি, সিন্দূর, ফতেপুর, কুলেড়া হয়ে পারুলডাঙা, সবশেষে সিউড়ির কেন্দুয়া পল্লিতে এসে দেহ রাখেন। ভবঘুরে স্বভাবের উদাসীন এই সাধকের গান ও জীবনচর্যায় মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ কিন্তু শান্তিনিকেতনে তাঁকে ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর গলায় অসামান্য বাউল গান শহরবাসী কোনওদিন শোনবার সুযোগই হয়তো পেত না; যদি না ঘটনাচক্রে সিউড়ির ডাক্তার কালীগতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হতেন নবনীদাস। গুণগ্রাহী চিকিৎসক কেবল যে তাঁর শরীরের দেখভাল করেছিলেন তাই নয়, তাঁর উদ্যমে নবনী ও পূর্ণ রেডিয়োতে গান করেন, অংশ নেন কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে। বলতে গেলে পঞ্চাশের দশকে সেই প্রথম কলকাতার রসিকদের খাঁটি বাউল গান শোনা। মনে আছে আজও নবনীদাসের সেই মগ্ন গায়ন ও দীন বেশভূষা। তখন গেরুয়ার এত বিলাসিতা আসেনি বাউল সমাজে, ছিল সাদা ধুতির লুঙ্গি আর সাদা মার্কিনের ফতুয়া। এই বর্গের সব সাধক বাউলই এখন দেহ রেখেছেন। তাঁদের নাম ও রূপ অবশ্য অনেকের স্মৃতিতে এখনও ধরা আছে, যেমন ধরা যাক— ত্রিভঙ্গ খ্যাপা, রাধেশ্যাম দাস, চিন্তামণি দাসী, রূপদাসী, হরিদাস গোঁসাই, মনোহর গোঁসাই। গাঁয়ের পর গাঁ পায়ে হেঁটে পার হতেন, কাঁধে কাঁথার ঝোলা নিয়ে। নগ্ন পা, নগ্ন গা। অঙ্গে শুধু ডোর কৌপীন আর তহবন্দ। মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল, সর্বকেশধারী বৈরাগী। মাধুকরী ছিল একমাত্র ব্রত। প্রসন্ন আনন, শান্ত স্বভাব, স্বল্পভাষী কিন্তু উৎফুল্ল।
পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা ঘুরে বাউল-ফকিরদের হালহকিকত জানতে গিয়ে আমি দু’রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বেশির ভাগ বাউলই অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত, মোটামুটি চলে যায় গান গেয়ে, মাধুকরী করে, অবরে সবরে কারুর কারুর ডাক আসে সরকারপোষিত অনুষ্ঠানে, কিছু অর্থলাভ ঘটে। আর আছে কিছু সুযোগসন্ধানী বাউল, তৎপর ও চৌকস, ভাল গায়, ভাল কথা বলে। আলাপ হলেই একটা নাম ঠিকানা লেখা (অবশ্যই ইংরিজি অক্ষরে) কার্ড ধরিয়ে দেয়, তাতে গেরুয়া রঙের প্রিন্টে একতারা ছাপা আছে লোগো হিসেবে। এই একতারা একটা শো পিস, এর নানা সাইজ। আমি বর্ধমানের তথ্য দপ্তরে এক বাউলের ছবি তুলেছি, যার পরনে র-সিল্কের আলখাল্লা এবং হাতে দশ-বারো ইঞ্চির একটা ঝকঝকে পালিশ করা মিনি একতারা— ওটার কাজ অলংকারের। হয়তো পিন পিন করে একটু বাজে কিন্তু আসরের নানা বাজনার জগঝম্পে সেই ক্ষীণ ধ্বনির কীইবা মূল্য! তবে হ্যাঁ, ভারী দেখনদারি আর বাউলের নানা অঙ্গভঙ্গির সহায়ক যন্ত্র।
প্রশ্ন উঠেছে এখানেই— পরিবর্তমান দেশকালে, প্রতিযোগিতামূলক বাউল গানের বিশ্বে বাউল কি নবনীদাস বা রাধেশ্যামদের মতো সরলসিধে ভাবনিষ্ঠ সাধক থাকবে, না দেখনদারি ঝলমলে পোশাক পরে নেমে পড়বে অন্যকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে? এই তো সেবার কেঁদুলির মেলায় গিজগিজ করা মানুষের ভিড়ে সবাইকে সচকিত করে একটা লাল মোপেডে চড়ে আবির্ভূত হলেন বিশ্বনাথ দাস। ঝাঁকড়া চুল, আজানুলুণ্ঠিত লাল সিল্কের আলখাল্লা, পিঠে বাঁধা বন্দুকের মতো গেরুয়ামোড়া ছুঁচালো একতারা, যেন বাদ্যযন্ত্র নয় শস্ত্র। তার এহেন পোশাক পরিচ্ছদ বা ঔজ্জ্বল্য বিষয়ে প্রশ্ন করতে সে কোনও দ্বিধা না রেখেই বলল, ‘চিরকালই কি খালিপায়ে খালিপেটে বাউল কষ্ট করবে? এখন অবস্থা ফিরেছে। গান গেয়ে টাকা আসছে, বিদেশ যাচ্ছি আমরা, মান মর্যাদা পাচ্ছি। এ সব মেলা মচ্ছবে তাই একটু দেখাচ্ছি। এর ফলে অনেক বায়না হবে, অনেক আসরে গান করার ডাক আসবে। রোজগার হবে। তা না করে আখড়ায় ধুনি জ্বেলে বসে, গাঁজায় দম দিয়ে ভোম মেরে বসে থেকে কী লাভ?’
