এ একেবারে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, পাকা প্রফেশনাল। আদিত্য মুখোপাধ্যায় এদের সম্পর্কে হতাশ হয়ে কিছুটা ভগ্নহৃদয়ে লিখেছেন:
‘বাউল’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই মনের ক্যানভাসে একটি উদাসী মানুষের ছবি ভেসে ওঠে— গেরুয়া পোষাক, ধম্মিল্ল করে বাঁধা চুল, বগলে গাবগুবি বা আনন্দ-লহরীর চোরা সুর। কিন্তু যতদিন যায়, বাউলের পোষাকও বদল হয়। কেঁদুলীর মেলায় গেলে এ সত্যটি সুন্দর ধরা পড়ে। পবন দাস এখন জিন্স্ ব্যবহার করে বেশি, নিতাই দাস প্যান্ট-সার্ট পরে, নক্ষত্র দাস, বিপদতারণ দাস, কার্তিক দাস সবাই সাধারণ মানুষজনের মতোই থাকেন। গৌর আর সে গৌর নেই, বিশ্বনাথ দাস মারুতি কেনার নেশায় মগ্ন, আনন্দ দাস ভারতে গান গাইতে পছন্দ করে না।… আবার একজন বিদেশিনীর সঙ্গ না করলে এই সময়ের বাউলের মনও ভরে না, পকেটও ভরে না, সঠিক অর্থে বাউল জীবন বৃথা হয়ে যায়।
এই পর্যন্ত পড়ে আমাদের দু’-একটি মন্তব্য করতেই হয়। প্রথমত, বীরভূমের বাউলরাই তো একমাত্র বাউল নয়, সারাদেশে নানাভাবে নানা সাধন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে বাউল— তাদের সবাই এমন প্রদর্শনকামী বা লোভাতুর নয়। নদিয়া-মুর্শিদাবাদ-বর্ধমান-মেদিনীপুর বা বাঁকুড়ায় প্রচুর বাউল দেখা যায়, যারা সৎজীবনযাপনে আত্মসুখী, দরিদ্র ও ভক্তপ্রাণ। মোপেড বা মারুতি তো দূরের কথা, তাদের অনেকের একটা সাইকেলও নেই, গান গেয়ে উদয়াস্ত টহলদারি করছে, তবু পেট ভরে কই? সেই কবেকার কুবির গোঁসাই মনের দুঃখে লিখেছিলেন:
মুষ্টিভিক্ষে করে আমি খেতে পাইনে
উদর পুরে।
ঘরে ঘরে ঘুরব কত
ভূত খাটুনি খাটব কত?
এখনও গড়পড়তা বাউল-ফকিরদের এটাই ভবিতব্য, তবে তারা বেশির ভাগই অভিযোগহীন, স্বভাবে শান্ত। কেমন তাদের আস্তানা? অনুপম দত্ত বর্ণনা দিয়েছেন এইরকম:
আশ্রমটি অজয় বাঁধের ধার ঘেঁষে ছোট একটি দোচালা ঘর। একফালি বারান্দা। সামনের খানিকটা জায়গা ঘিরে ঢোল কলমীর বেড়া। এখানে তার বৈষ্ণবী গাঁয়ে গাঁয়ে মাধুকরী করে বাউলের সংসার চালায়।… বাউলের সংসারে সামান্য সচ্ছলতাটুকু নেই। তার ঘর-জোড়া সস্তা কাঠের তক্তায় ছেঁড়া কাঁথা, তুলো-ফেটে বেরুনো বালিশ। ঘরের কোণে হাঁড়ি কলসীর আবর্জনার ভেতরে মশাদের গুহাবাস, ছারপোকা আর আরশোলার জন্মঘর।
বাউলদের তুলনায় ফকিরদের অবস্থা আরও করুণ, শোচনীয়— অবশ্য খাঁটি ফকিরিয়ানার সেটাই তো শর্ত। বীরভূমের শাসপুরে আমিন শা ফকিরের খোঁজে গিয়েছিল লিয়াকত আলি। ফকির তখনও ফেরেননি। তাই অপেক্ষাতুর লিয়াকত দেখছেন:
আমিনের বউ মাঝবয়সী, রঙ বেশ ফরসা। তবে পরণের মোটা রঙিন ফুলছাপ সস্তা শাড়িটি খুব ময়লা। উঠোনে, খোলা আকাশের নীচে, রোদ্দুরের মধ্যে, মাটির উনুনে কালো তোবড়ানো হাঁড়িতে ভাত রান্না হচ্ছে। পাতার জ্বালে আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই বেশি। উঠোনের ওদিকে মাটির বাড়ি, অবশ্য ওটিকে যদি আদৌ বাড়ি বলা যায়। বাড়িটি জরাজীর্ণ ও বিধ্বস্ত— কোনরকমে খাড়া হয়ে আছে। খড়ের চাল পচে ধ্বসে গেছে। ঠাঁই ঠাঁই খড়ও নেই। উঠোনে ও বাড়ির দাওয়ায় নানান জিনিস বিশৃঙ্খলভাবে পড়ে আছে। বাড়ির মধ্যে মুরগী চরছে, ন্যাংটো শিশু ঘুরছে। আধন্যাংটো একটি বালক কোমরের পেছনে কাস্তে গোঁজা, মাথায় করে একবোঝা ঘাস নিয়ে এসে দাওয়ার ওপর ধপ্ করে ফেলল। উঠোনে এপাশে অন্য কারোর বাড়ির পেছন দিক। তারই ছাচের নীচে ছায়ায় খেজুরপাতার তালাই বিছিয়ে আমাকে বসতে দিয়েছেন। বউটি। পরক্ষণেই এনে দিয়েছেন খাবার জল।
এ ধরনের দীনহীন ও শ্রীহীন বসত বাড়ি যে সবার তা নয়। করিমপুরের কাছে গোরভাঙায় আজহার ফকির ছিলেন সম্পন্ন গৃহস্থ। জোতজমি, পাকাবাড়ি, গ্রামজোড়া মান্যতা। ছেলেরাও ফকিরি মতে রয়েছে। ছোট ছেলে মনসুর ফকির এখন গান গেয়ে বেশ নাম করেছে। তবে আজহার ছিলেন তাত্ত্বিক সংসারজীবী ও গীতিকার, মনসুর শুধুই গায়ক। বাড়ির দাওয়ায় বসেছে গানের আসর। আমাদের চোখ চলে গেল গায়কের ঝাঁকড়া চুলের ওপাশে দাওয়ার কোণে— সেখানে রয়েছে একটা তাগড়াই রাজদূত মোটর সাইকেল।
কিংবা ধরা যাক, বর্ধমানের হাট গোবিন্দপুরে সাধন দাসের কুটির। শ্রীময়, শান্ত ও সচ্ছল। দৈন্যের কোনও ছাপ নেই। দিব্যি মোরাম বিছানো রাস্তা, চমৎকার সব খড়ে ছাওয়া ভজনকুটির। বিন্যস্ত গাছগাছালি, ফলফুলের বাগান। একটা নতুন ঘর গাঁথছে সাধনের শিষ্যরা গতরে খেটে। সাধনদাস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাকের সফিস্টিকেটেড মানুষ। জাপানি সাধনসঙ্গিনী মাকি কাজুমি অঙ্গন আলো করে আছে।
এইখানে স্পর্শকাতর বিদেশিনী প্রসঙ্গটি একটু ভেবে দেখা দরকার। সব বাউলরাই যে বিদেশিনী মেমদের নিয়ে আছেন তা নয়। হয়তো সাকুল্যে জন দশ-পনেরো বাউলের কপালে নেকনজর জুটেছে মেমদের তাতেই বদনাম রটেছে সকলের নামে। এখানে একথাটা তো বুঝতে হবে এই শ্বেতাঙ্গিনী বিদেশিনীরা কেউই মহীয়সী নারী নয়— কেউই আসেনি ভারত উদ্ধারে। তারা কেউ মার্গারেট নোবল বা মীরা রিশার নয়, তারা পশ্চিমি বণিক সভ্যতায় দিগভ্রষ্ট রমণী। অর্ধশিক্ষিত কিংবা নেশাগ্রস্ত, কামুক কিংবা বখে যাওয়া। সামান্য দুয়েকজন জিজ্ঞাসু ও গবেষক। তবে এটা ঠিক যে তাদের কল্যাণেই বাউলদের বিদেশি সংযোগ ও ডলার রোজগার এ প্রসঙ্গে আমি একবার লিখেছিলাম :
