এইখানে একটু খোলামেলা কথা বলতেই হবে। কলম-ওঁচানো গবেষকবৃন্দ যতই না কেন নিন্দিত হন তবু বাউলদের নিয়ে কাজের কাজ তো তাঁরাই কিছু কিছু করেছেন, করে চলেছেন। এদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্মপ্রতিষ্ঠান বা সমাজসেবী সংস্থা বাউলদের জন্য তেমন কিছু করেছেন বলে তো শুনিনি।
এটাও মনে রাখতে হবে, বাউল সুর বলে স্পষ্ট, নির্দিষ্ট কোনও কাঠামো নেই। অঞ্চল ভেদে তা আলাদা। বাউলদের সম্পর্কেও এ কথাটা বলা চলে। অঞ্চল ভেদে তাদের ধরনধারণ জীবন প্রণালী আলাদা। সেইজন্যই রাঢ়ের বাউলদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার বাউলদের খুব গভীর মিল খোঁজা নিরর্থক। আবার রাঢ়ের বাউলদের ঘনিষ্ঠ যেমন সহজিয়া বৈষ্ণবরা, নদিয়া মুর্শিদাবাদে তেমনই বাউলদের গায়ে গায়ে রয়েছে ফকিররা। বাউল আসলে তবে কি এক সমাধানহীন দ্বৈত? তার জীবনের কবোষ্ণ তাপ, তার পোশাকের মণ্ডন-ধর্ম, তার গানের উদার মানবিকতা, তার বন্ধনহীন পথচলা— এক অলক্ষ্য অন্বিষ্টর মতো। বাংলার বাউল যেন এক মগ্ন স্রোত, তার চোরা টানে প্রতিদিন আমাদের অবশ্যম্ভারী অবগাহন চলছে।
কিন্তু সেই অবগাহনের মধ্যে রয়ে যাচ্ছে ফাঁক ও ফাঁকি। এটা ততদিন ছিল না যতদিন বাউল ফকিররা তাদের নিজেদের পরিবেষ্টনীর মধ্যে থাকতে পেত, নিজেদের মতো আত্মমগ্ন সাধনার পথে। সত্তর-আশির দশক থেকে হঠাৎ শহরবাসী মধ্যবিত্ত এ-বর্গের গান সম্পর্কে এবং বেশি করে এদের জীবনধারা সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে ওঠে। তার সবটাই হুজুগ বা গিমিক নয়। আসলে নাগরিক জীবন ও তার বিনোদনের উপকরণগুলি কৃত্রিম আর ক্লান্তিকর হয়ে উঠছিল ক্রমশ— বাংলা গানও একটা পুনরাবৃত্তির ছকে ঢুকে পড়েছিল। কাজেই একটা নতুন স্বাদ আর পরিবর্তন সবাই চাইছিলেন। আমাদের সাবেক ইতিহাসতত্ত্বের ধারণা ও ইতিহাস চর্চাও খুঁজছিল এক নতুন পথরেখা— তাই লুপ্ত অথবা ক্ষীণ গৌণধর্মগুলির শিকড়সন্ধানে ব্রতী হতে চাইলেন অনেক ইতিহাসসন্ধানী। জেগে উঠল শত জল ঝরনার ধ্বনি।
সেইসঙ্গে এই সময়খণ্ডে একটা নতুন জিনিস হল— বাউলদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে গান শোনাতে আগ্রহী হলেন কেউ কেউ। তাঁরা আমেরিকাবাসী বাঙালি। বলা বাহুল্য তাঁদের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল না সেদেশে ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ বা বৈরাগ্যবাণী প্রচার করা। পূর্ণদাস ও অন্যান্য ক’জনের গানে বিদেশে কিন্তু একটা ভুল বার্তা পৌঁছে গেল। শতবর্ষ আগে শিকাগোয় স্বামী বিবেকানন্দ যে-বেশ ধারণ করে তাদের মাতিয়েছিলেন, সেই গেরুয়া আলখাল্লা লুঙ্গি পাগড়ি ও কোমরবন্ধধারী বাংলার বাউল তাদের তারসপ্তকের উচ্চনিনাদে ও বৃত্তাকার নাচে কোনও কোনও বিদেশির মন মজাল। তারা এবার ঘন ঘন দেখতে চাইল বাউলদের— হঠাৎ বাউল-অনুরাগী বিদেশিদের সংখ্যা বেড়ে গেল। সাধন-সর্বস্ব একটি সম্প্রদায়কে হতে হল পারফরমার।
দেখা যাচ্ছে, বাউলদের জীবনযাপনের ধরন এবং বাউল গান অনেককেই টেনেছে, কিন্তু অন্তরঙ্গতা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু অন্য স্বরও ফুটে উঠেছে। বাউলদের সম্পর্কে এমন কিছু ভাল ও মন্দ মন্তব্য কয়েকজনের রচনা থেকে উদ্ধৃত করব, তার থেকে তাদের হাল চাল কিছু জানা যাবে। প্রথমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য:
একসময় বাউলগান সম্পর্কে আমার খুব আগ্রহ জেগেছিল। কোথাও কোনো বাউলের গান শুনলেই টুকে রাখতাম।… বারবার ছুটে গেছি কেঁদুলির মেলায়, শীতের মধ্যে সারা রাত জেগে বসে থেকেছি অজয় নদীর ধারে ছোট ছোট আখড়ায়। খুবই দুঃখের কথা, কয়েক বছরের মধ্যেই আমি বাউল গান সম্পর্কে গোপনে গোপনে হতাশ হয়ে পড়ি।… মন দিয়ে বারবার শুনলে, বাউল গানেও একঘেয়েমি এসে যায়। তিন চার রকমের বেশী সুর বৈচিত্র্য নেই। গানের মাঝে মাঝে ‘ও ভোলামন’ বলে একটি দমফাটানো তান আসলে শ্রোতাদের চমকে দেবার একটা কায়দা মাত্র। শুধু গান শোনার আনন্দের জন্যই একসঙ্গে তিন চারটের বেশী বাউল গান শোনা যায় না, তখন হাই ওঠে, কিংবা ফ্যাসানের বশবর্তী হয়ে কৃত্রিম বাহবা দিতে হয়। সাহেবরা প্রকাশ্যে গাঁজা খেতে শুরু করার পর এদেশের ভদ্রসমাজের অনেক ছেলেমেয়েদের মধ্যেও গাঁজা টানার চলন হয়েছে। সাহেবদের পরবর্তী শিকার ঐ বাউলরা। দলে দলে বাউলদের আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংলণ্ড সফর শুরু হয়ে গেল। সাহেবদের দেশ ঘুরে আসার আগে ও পরে একই বাউল গান শুনে দেখেছি, অনেক তফাৎ। তার গায়ে যেন আঠেরো ঘা।
আসলে বাউল গানের কাছে আমাদের খুব বেশী প্রত্যাশা করাটাই ভুল। বাউল গান বাউল গানেরই মতন। আমরা তার থেকে আংশিক আনন্দ পেতে পারি মাত্র। তার বেশী কিছু নয়। সমস্ত পৃথিবীর সভ্যতাই নগরকেন্দ্রিক। আমরা আর ইচ্ছে করলেই গ্রামীণ হয়ে যেতে পারিনা। স্বতঃস্ফূর্ত গানের প্রতি আমাদের অন্তরীণ বাসনা আছে বলেই আমরা বাউল গান বা লোকসঙ্গীতের কাছে গেছি বারবার। কিন্তু মন্দিরের সিঁড়িতে বসা একান্ত বাউলের গান বা ভেসে যাওয়া নৌকোয় মাঝির গান শোনবার সৌভাগ্য আমাদের দু’ একবারই হয়। বারবার পেতে গেলে সব কিছুর মধ্যেই একটা সাজানো ব্যাপার এসে পড়ে। মঞ্চে ওঠবার আগে বাউল প্যান্ট শার্ট ছেড়ে পরে নেয় গেরুয়া পোশাক, শ্রোতাদের দাবিতে মজার গান হিসেবে পরিবেশন করে এইরকম গান: ‘এঁড়ে গরু বেড়া ভেঙে খেজুর গাছে চড়েছে।’
