‘বাংলার বাউল’ কথা দুটি যতটা উত্তেজক ও আকর্ষণময়, তেমনই অতল আর সমস্যাবহুল। বাউল কে, বাউল কী, বাউল কোথা থেকে, কবে থেকে, এ সব প্রশ্ন যদি বা মেটে তারপরে নতুন প্রশ্নের জট তৈরি হয়। আঠারো উনিশ শতক থেকে দীপ্যমান বাংলার বাউল বিশ শতকের রসিক ও বুদ্ধিজীবীদের আগ্রহ ও গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। এককালে ভদ্রলোকশ্রেণি তাদের ঘৃণার চোখে দেখেছেন, নৈষ্ঠিক মুসলমানরা ফতোয়া জারি করেছেন ধ্বংসের, তবু তারা নানা লোকায়ত বর্গের ধারার সঙ্গে গা ঢেলে দিয়ে অবিনাশী উদ্ভিদের মতো বেঁচে বর্তে আছে। একেবারে হালফিল, দু’-এক দশক, বাংলার বাউল সারাদেশে ও বিদেশে অভূতপূর্ব মান্যতা পাচ্ছে। এরা যতটা বাউল সাধক তার চেয়ে বড় গায়ক। যেমন পূর্ণদাস, পবনদাস বা আরও অনেকে। ব্যঙ্গ করে এদের বাংলার বা ভারতের সাংস্কৃতিক রপ্তানিযোগ্য বলেছেন কেউ কেউ। সেই অত্যুক্তি না হয় আমরা গায়ে নাই-বা মাখলাম, কিন্তু বাংলার বাউল নিজের মোপেডে ঘুরবেন, সঙ্গে বিদেশিনী, দৃশ্যটি বেশ অভিনব। অভিনব, কেননা আবহমান বাউলের সাধনা তো মগ্নতার, আত্মগোপনের। তাঁরা ভিক্ষাজীবী, আখড়াধারী বা গরিব গৃহী। বাউলরা বরাবর নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থেকে কায়সাধনা ও গান গেয়ে এসেছেন। বাসাছাড়া পাখির মতো বন্ধনহীন তাঁদের জীবনে পথ চলাতেই সমধিক আনন্দ। আর ছিল কতই মেলা— কেঁদুলি, রামকেলী, দধিয়া বৈরেগীতলা, পাথরচাপুড়ি, সোনামুখি, কোটাসুর, অগ্রদ্বীপ, ঘোষপাড়া। ওদিকে মানভূমের খাতরা, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়ে, রাজশাহীর খেতুরী বা প্রেমতলী। এসব মেলায় সারা দেশের বাউলরা এসে মিলতেন, গান হত সারারাত— তত্ত্বগান, ভাবগান, ফকিরি গান, শব্দগান। আবার মনঃশিক্ষা বা আখেরিচেতনের গান, ‘দৈন্যতা’র গান, দেহতত্ত্ব। ছিল কেন, এখনও সবই আছে তবে মর্যাদাবান হয়ে নেই। মেলার আসরে রসিকের চেয়ে দর্শক বেশি, তত্ত্বজ্ঞের চেয়ে গবেষক বেশি, একতারার চেয়ে ক্যামেরা বেশি। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার বাউল’ বইয়ে ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছিলেন:
এই সব স্থানের খবর পাইয়া বহু ‘গবেষণা’ করনেওয়ালা ডক্টরেটপ্রার্থী বিদ্বজ্জনের সেখানে ভীষণ সমাগম ঘটে।… কেঁদুলির নিত্যানন্দ দাস তো একদিন আমাকে বলেন বাবা, বৎসরান্তে এখানে আসিতাম। কিন্তু তোমাদের পিস্তলের মতো পেন্সিল ওঁচানো দেখিয়া স্থানটা ছাড়িতে হইল।
এখন দৃশ্যটা আরও ঘোরতর। কেবল পেন্সিল-ওঁচানো গবেষক নয়, নাগরিক ফোটোগ্রাফারের ফ্ল্যাসবাল্বের ঝলক, টেপরেকর্ডারের আমদানি, ভিডিও রেকর্ডিং ও কর্ণভেদী মাইক সবই দেখা যাবে। অমিত গুপ্ত তাঁর ‘বাংলার লোকজীবনে বাউল’ বইতে হালের রাঢ় খণ্ডের বাউলদের নাম সাকিনের পরিচয় রেখেছেন। তাঁর সংগৃহীত একটা সদ্যকালের গান হল ‘কৃষ্ণ নামের মিষ্টি চুরুট/ মুখে রাখো সর্বক্ষণ।’ এই একটা গানের বাণী ধরে আমরা হালফিলের বাউল জগতে (বিশেষত রাঢ়ের) ঢুকে পড়তে পারি। আদিত্য মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ধর্ম ও সংস্কৃতির আলোকে বাউল’ বইয়ে এমনতর কৃষ্ণনামের মিষ্টি চুরুট খাওয়া বাউলদের বিবরণ দিয়েছেন।
তিনি জানাচ্ছেন গৌরখ্যাপা বিদেশ ঘুরে এসে বাড়ি করেছেন, মোটর সাইকেল চেপে ঘুরছেন। হাতে বিদেশিনীর দেওয়া সোনার হাতঘড়ি। পবনদাসের গানের শুরু ট্রেনের কামরায়, ১৯৮৮ সালে তিনি ‘বিদেশিনী মিমলু সেনের সঙ্গে প্যারিসে। সাধক জীবন তাঁর শেষ।’ লাভপুরের ধনডাঙার কার্তিক দাস, শৈশবে গ্রাম্য যাত্রাগানে বিখ্যাত ছিলেন। এখন ‘ডিস্ক ক্যাসেট বিদেশ সব হয়ে গেছে।’ কৃষ্ণবাহাদুর থাপার জন্ম নেপালে, থাকেন পানাগড়ে। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে স্ত্রী আর পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে কেঁদুলি মেলায় আসেন এবং মনোহর খ্যাপার আখড়ায় গান শুনে মজে যান। তারপরেই কণ্ঠে নেন বাউল গান। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা, ফ্রান্স ঘোরা বাউল কৃষ্ণবাহাদুর এখন প্রয়াত। ‘বিশ্বনাথ বাউলের বড় ছেলে আনন্দও এক বিদেশিনীর (৪৩-এর বেশি বয়সের জার্মান মহিলা কেরিন) প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে পুনরায় ফিরে এসেছে ঘরে।’ বাংলার বাউল বলতে কি এঁদের প্রসঙ্গকে গণনায় আনতে হবে?
শেষ পর্যন্ত বাউল কি তবে একটা মনগড়া মিথ? একটা আশ্চর্য জীবনযাপনের ধরন? বিদেশের বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে বাউল— ‘Child of Transcultural Studies’। সে ‘Sings and dances mad songs of ecstacy’। ব্যাপারটা প্রকৃতপক্ষে কি তাই? আমাদের অবশ্য ভিন্নতর অভিজ্ঞতা আছে। বলবার কথা সেটাও। রাঢ়ের বাউলদের অর্থ কীর্তি সচ্ছলতার বাইরেও তো একটা বৃহৎ বঙ্গ আছে। বর্ধমানের একটা অংশ, নদিয়া আর মুর্শিদাবাদ জুড়ে সাধক বাউলদের অভাব কই? তাঁরা বিদেশেও যান না, সিন্ধু পারের সুন্দরীরা তাঁদের সাধনভ্রষ্টও করেন না। অখণ্ড নদিয়ার খণ্ডিত অংশ, যা আজ বাংলাদেশ, তা তো বাউল গানের স্বচ্ছ স্রোতেবেগে প্রাণবান। সীমান্ত পেরিয়ে তার কিছু সুবাস আজও পাই। বাউলদের তো কোনও দেশগত বেড়া নেই। তাই এ বাংলার বাউল আসরে ও মেলায়, ও-বাংলার বাউলদের কত গান আমরা শুনি। তবে সে গানের ধরন ধারণ আলাদা। নৃত্যবিরল ভাবময় সেসব বাউল গান একটু অন্য ধাঁচের, হয়তো সুর কাঠামোটাও একটু স্বতন্ত্র।
