এই প্রসঙ্গে একটা বিতর্কযোগ্য প্রসঙ্গ সেরে নেওয়া যেতে পারে। ববীন্দ্রনাথের প্রণোদনায় ক্ষিতিমোহন সেন মধ্যযুগের সত্তসাধকদের সাধনার স্বরূপ সন্ধানে ব্যাপৃত হন এবং সেই সূত্রে বাংলা বাউলদেব লুপ্তস্রোতের কিছু পরিচয় ব্যক্ত করেন লেখালেখি করে। ১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা বক্তৃতায় তিনি বিষয়রূপে বেছে নেন ‘বাংলার বাউল।’ তাঁর লেখায় পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের বহু অজানা বাউলের খবর মেলে। যেমন কুষ্টিয়ার পাঁচু ফকির, রাজবাড়ির মেছেলচাঁদ, ঢাকা জেলার শাহনাল, ধামরাই টাঙাইলের পাগলচাঁদ। তার মতে: ‘বাংলা ভাষার আরম্ভ হইতেই বাউলের পরিচয় মেলে। তবে গুরু পরম্পরা একবার খোঁজ করিয়া (১৮৯৮ সাল) ১২/১৩ পুরুষ পর্যন্ত কোন মতে পাইয়াছিলাম।’ ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন তিনি কাশীতে প্রথম বাউল দেখেন নিতাইকে, পরে ঢাকা জেলার রাজবাড়িতে পরিচয় হয় দাশু বাউলের সঙ্গে। দাশুর আখড়ায় পরিচয় ঘটে দুর্লভ ও বল্লভের সঙ্গে ‘তাঁহাদের কাছেই আমি বড় বড় দুইটি বাউলধারা ও বহু বাউল গানের সন্ধান পাই।’ যাই হোক ক্ষিতিমোহন সেন তাঁর ভাষণে মদন, ঈশান যুগী, গঙ্গারাম, বিশা ভূঁইমালি, জগাকৈবর্ত প্রমুখের হালহদিশ দেন। তাঁদের গানের নমুনা পেশ করেন। এঁদের বাউল পদাবলি পড়ে রবীন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হয়ে ক্ষিতিমোহনকে বলেন— ‘এমন সহজ এমন গভীর, এমন সোজাসুজি সত্য এত অল্পকথায় এমন অপূর্বভাবে প্রকাশ করিবার শক্তি আমাদেরও নাই। আমার তো ইঁহাদের রচনা দেখিয়া রীতিমতো হিংসা হয়।’
রবীন্দ্রনাথের ঈর্ষাযোগ্য এমন বাউলপদ পরে কয়েকটি রবীন্দ্র বক্তৃতায় ও রচনায় উদ্ধৃত হয়েছে। বাকি সংগ্রহ যা ক্ষিতিমোহনের ছিল তা তিনি প্রকাশ করতে চাননি। চারু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবীণা’-য় ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত ন’খানি বাউলগান সম্পূর্ণ মুদ্রিত হয়েছিল। বাংলার বাউলদের সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত ও সুবৃহৎ বইটি যার লেখা সেই উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য নির্দ্বিধায় ঘোষণা করেছেন যে ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত গানগুলি নির্ভরযোগ্য বাউল গান নয়, তাঁর কথিত বাউলদের অস্তিত্ব ও বিবরণ সন্দেহজনক। উপেন্দ্রনাথের প্রশ্ন ও মন্তব্য একটু তুলে দিচ্ছি— ‘বাংলার এ কোন্ অবাস্তব বাউলদের কথা তিনি আমাদিগকে শুনাইতেছেন? ইঁহারা কাহারা? কোথায় ইঁহাদের বাড়ি? ইঁহাদের কি কখনও বাংলায় আবির্ভাব ঘটিয়াছিল?’
এমন মারাত্মক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে সবশেযে উপেন্দ্রনাথ দুটি সিদ্ধান্তে এসেছেন। প্রথমত, ‘ক্ষিতিমোহন বাবর গান কয়টি সারা বাংলায় প্রাপ্ত বাউল গান হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ের।’ দ্বিতীয়ত, ‘বাংলার বাউলদের যে সাধন তত্ত্ব ও সাধন পদ্ধতির কথা ক্ষিতিমোহনবাবু তাঁহার দুইটি প্রবন্ধে বলিয়াছেন, তাহা বাংলায় বর্তমানে যে বাউলদের দেখিতেছি ও যাহাদের গান পাইতেছি, তাহাদের সম্বন্ধে ঠিক খাটে না।… বাংলার বাউলদের সম্বন্ধে এই মতবাদগুলি তিনি কোথায় পাইলেন?’ অভিযোগ দুটি গুরুতর। সেই সঙ্গে ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত গানগুলির বাণী বিষয়ে উপেন্দ্রনাথের মন্তব্য: ‘বাংলা সাহিত্যের সহিত যাঁহারা পরিচিত, তাঁহারা একবার পড়িলেই বুঝিতে পারিবেন যে এই গানগুলির মধ্যে যথেষ্ট “আধুনিক হস্তক্ষেপ” আছে এবং ইহা পল্লীর অশিক্ষিত বা সাবেকী ধরণের অশিক্ষিত বাউলদের রচনা নয়।’ সাধারণ পাঠকদের অবগতির জন্য উপেন্দ্রনাথের সন্দেহসংকুল কয়েকটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি—
১) ‘নিঠুর গরজী, তুই কি মানসমুকুল ভাজবি আগুনে।’ (উপেন্দ্রনাথের মতে মানসমুকুল এই সমাসবদ্ধ অলংকার সৃষ্টি আধুনিক রচনারীতি। তেমনই সন্দেহজনক, গানের অন্তর্গত ‘যুগযুগান্তে’ এবং বেদনা না লিখে ‘বেদন’ শব্দের ব্যবহার)
২) ‘হৃদয়কমল চলতেছে ফুটে কত যুগ ধরি। তাতে তুমিও বাঁধা আমিও বাঁধা উপায় কি করি।’—এ গানের দার্শনিকতার সঙ্গে বাংলার বাউল ধর্মের কোনও যোগ নেই, এ রচনাভঙ্গিও সম্পূর্ণ আধুনিক কালের— অভিযোগ উপেন্দ্রনাথের।
৩) ‘তারে অরুণ এসে দিল দোলা রাতের শয়নে’— (‘লাইনটি নিতান্ত অতি আধুনিক গন্ধী’)।
৪) ‘আমার ডুবলো নয়ুন রসের তিমিরে/ কমল যে তার গুটালো দল আঁধারের তীরে। উপেন্দ্রনাথের মন্তব্য: ‘এইরূপ বাক-চাতুর্য ও কল্পনা আধুনিক কালের কবিদের রচনা ছাড়া বর্তমানে বাউলদের গানে মিলে না, তাহা এই পনেরো-ষোল বছর ধরিয়া প্রায় দেড় সহস্র বাউলগান সংগ্রহ ও পর্যালোচনার অভিজ্ঞতার ফলে বুঝিতে পারিতেছি।’
এমন স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ এবং ভয়ানক অভিযোগ সম্পর্কে আমরা নিজস্ব কোনও মতামত বা নতুন বিতর্ক তুলব না। কেবল ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ তৃতীয় খণ্ডে ব্যক্ত অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য পেশ করব। তিনি বলছেন:
এই গানগুলির প্রামাণিকতা সম্বন্ধে ডঃ ভট্টাচার্যের সংশয় নিশ্চয় সুধীজনের চিন্তা উদ্রেক করিবে… অবশ্য অবিশেষজ্ঞ হইয়াও বলিতে বাধা নাই যে, উল্লিখিত চার ও পাঁচ সংখ্যক গান (‘আমি মজেছি মনে/ না জানি মন মজল কিসে আনন্দে কি মরণে’ এবং ‘আমার ডুবলো নয়ন রসের তিমিরে’) দুইটির ভাব ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিমা আধুনিকমনা সুশিক্ষিত ব্যক্তির রচনা বলিয়া মনে হইতেছে।
অনির্ণীত এবং অমীমাংসিত এক সমস্যা বাংলার বাউল গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এর থেকে সন্দেহ না জেগে পারে না যে, বাউল গান বলে বিপুলাকার সংকলনবদ্ধ যে অজস্র গান আমরা হাতে পেয়েছি তার সব প্রামাণিক ও খাঁটি বাউলের রচনা তো? কথাটা ওঠে আরও এজন্য যে, উনিশ শতকে ‘সখের বাউল’ নামে একাধিক বাউল বা বাউলের দল প্রচুর গান লিখে গেয়ে বেড়াতেন। তার সবচেয়ে সফল নমুনা মেলে কাঙাল হরিনাথ বা ফিকিরচাঁদের গানে। বাউল না হয়েও তিনি উৎকৃষ্ট বাউল গান লিখেছেন। বাংলার বাউলগানের ধারা এ সব গানেও সম্পন্ন ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত বাউল গান— সাধনা-লব্ধ ও পরম্পরাজাত ক্রমশ নকলের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
