অক্ষয়কুমারের এই বর্ণনায় একটা বড় ফাঁক থেকে গেছে। বলা হয়নি যে এসবের সঙ্গে থাকে বাউলদের অচ্ছেদ্যসঙ্গী একতারা ও ডুগি, খমক, সারিন্দা বা দোতারা। কেউ কেউ গলায় কণ্ঠি পরেন, কেউ করেন তিলকসেবা। সেই সঙ্গে থাকে নারীসঙ্গী এবং কণ্ঠে ভাবের গান, যার বাণীতে-কূট রহস্যের অতল ব্যঞ্জনা। বাংলা গানের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ধারাবাহিকতায় বাউলরা এক ধরনের গান সংযোজন করে চলেছেন, যা এই সম্প্রদায় লুপ্ত হয়ে গেলেও থেকে যাবে। কিন্তু বাউলদের পরিচয় একটু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা জরুরি। প্রথমে তাঁদের বহির্বাস প্রসঙ্গে লক্ষ করা যেতে পারে।
বাউল ফকিরদের জীবনের সঙ্গে বহুদিন সংসর্গকারী সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৮৭ সালে আমাকে এক ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন যাতে তাঁর কতকগুলি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক বলে প্রকাশ করছি। সিরাজ লিখেছিলেন: ‘যে বাউলমেলায় তেরাত্তির কাটিয়েছিলাম তাদের অনেকের পরনে গায়ে হলদেটে লাল, কারুর বা স্রেফ গৈরিক, কারুর তালিমারা (সংখ্যাও নাকি ওদের রহস্যময় সংখ্যাবাচক), কারুর সাদা এবং কারুর কালো পোশাক ছিল। পূর্ণদাস প্রমুখ শৌখিন শহুরে বাউলের যে পোশাক তা একান্তভাবে সুফি পোশাক, বৈরাগ্যের প্রতীক গৈরিক, এই Cliche-টি নিছক কবিকল্পনা, সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ-সূত্রে এর প্রাদুর্ভাব। হিন্দু সাধুর পরনে সেলাই-করা পোশাকের আগমন এ যুগে বলেই মনে হয়। কারণ হিন্দুশাস্ত্রে সেলাই করা পোশাক নিষিদ্ধ ছিল। লক্ষ করবেন দর্জি শব্দের কোনও বিকল্প শব্দ ভারতীয় প্রাচীন ভাষায় নেই। সীবনকার অর্বাচীন কৃত্রিম শব্দ।’
বাউলদের ব্যাপারে দ্বিতীয় যে-চিন্তাভাবনা বহু মানুষের মনে তাঁদের সম্পর্কে কৌতূহল অথবা ঘৃণা টেনে এনেছে সেটা ‘চারিচন্দ্রভেদ’ অর্থাৎ মল মূত্র রজ বীর্য পান। বাউল তো শুধু নয়, আমাদের কায়াবাদী সাধকদের অনেকে ‘দুইচাঁদ’ (মলমূত্র) বা চার চাঁদের চর্চা করেন। এ তো বহু শত বছরের ধারা। এককালে বাউলদের ‘মুতখেকো’ বলা হয়েছে। তাঁদের এই বিচিত্র সাধনাকে ‘কদর্য’ ‘বীভৎস’ ‘জঘন্য’ এইসব নিদাত্মক বিশেষণে ঘৃণা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে শেষ কথা বলা কঠিন। সভ্যরুচি ও উন্নত জীবনবোধ দিয়ে সব কিছুর মীমাংসা করা যায় কি? বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘বাউলদের যৌনজীবন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ’ বলে একটা রচনা থেকে এখানে উদ্ধার করছি। বলা হচ্ছে:
একটি সত্য এই যে মানুষের শরীরে দুটি চেতক এন্টিজেন আছে যা শরীরের প্রতিরোধ পদ্ধতির (Immunological system) অন্তর্ভুক্ত নয়। এই দুটি হল চোখের জলের জলীয় পদার্থ বা অশ্রু এবং বীর্য। আমাদের চোখের জলীয় অংশ বা শুক্রের অংশ কোনক্রমে রক্তে মিললে বিশেষ এন্টিবডি উৎপন্ন করতে পারে। সম্ভবত ঐ বীর্যপানরত পুরুষ নিজের বীর্যদ্বারাই শরীরে এন্টিবডি উৎপন্ন করবে এবং তাতে শুক্রাণুর উৎপাদন অবশ্যই অল্প হবে। তাই দেখা যায়, বাউলদের সন্তান সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। তবে স্মরণযোগ্য, নারী কখনও এই বীর্যপান করে না।
বাউল মতের আন্তঃশরীরে যৌন যোগাচারের লক্ষণ যেমন স্পষ্ট তেমনই শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। উভয়ক্ষেত্রেই গুরুর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। এই দুই দিক বিবেচনা করলে বাউল মতে সহজিয়া বৈষ্ণব ও সুফিতত্ত্বের প্রভাব চোখে না পড়ে পারে না। গুরুর নির্দেশে যোগক্রিয়া ও মৈথুন বাউলবর্গের লোকধর্ম সম্প্রদায়কে বিশিষ্টতা দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সফল প্রয়োগের ফলে খাঁটি বাউলদের সন্তান জন্মায় না। অনেক বাউলধারা আছে যেখানে গুরুর শিষ্যরাই পরম্পরা বজায় রাখেন। সন্তান-পরম্পরার চেয়ে শিষ্য-পরম্পরা তাই বাউলদের কোনও কোনও স্রোতে প্রাধান্য পায়। বাউলরা বিশ্বাস করেন, দেহভাণ্ডে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিরূপ রয়েছে এবং আত্মা কোনও অলৌকিক বস্তু নয়, তার উপলব্ধি ও উপস্থিতি দেহেই লভ্য। সেইজন্যই বাউলগান প্রধানত দেহতত্ত্বের গান। নিজের দেহকে জানা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা, তার মধ্যে দিয়ে আনন্দস্বরূপের আস্বাদন— এসবই বাউলের লক্ষ্য। তারই নানা ইঙ্গিত ও দ্যোতনা রয়ে গেছে কয়েক শতকের বাংলা গানে। ভাবের দিক থেকে তাই বাউল গান নানা মাত্রায় বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছে। লালশশী, লালন, পাঞ্জু শাহ, হাউড়ে গোঁসাই, কুবির, যাদুবিন্দু, জালাল, দীন শরৎ, রশীদ, দুদ্দু, রাধারমণ, ফুলবাসউদ্দিন, দুর্বিন শাহ, পদ্মলোচন, শীতলাং শাহ, হাসন রজা থেকে আজ পর্যন্ত প্রবাহিত বাউলবর্গের গান আমাদের সগর্ব অর্জন। এঁদের সবাই হয়তো পরম অর্থে বাউল নন, কিন্তু বাউলদের কাছে শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণীয়। আরেকটা সত্য হল, বাঙালির সামাজিক ইতিহাসে বাউলদের আচরণ ও চারচন্দ্র নিয়ে তর্ক বা মতান্তর থাকলেও বাউল গান নিয়ে কোনও তর্ক ওঠেনি। নিম্নবর্গ থেকে উচ্চবর্গ পর্যন্ত বাউলগানের স্বতঃস্ফূর্ত চলাচল চলছে প্রায় শতবর্ষ ধরে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও বাউল গানের ভাবমুল্যে ও ছন্দে আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং দেশবাসীকে প্রথম সচেতন করেছিলেন বাউলগানের নিজস্বতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে তিনি যে সব অভিনব স্বদেশি গান লেখেন তার সুরকাঠামোয় বাউল গানের স্পন্দ ও উদ্দীপনা অত্যাশ্চর্য নৈপুণ্যে ব্যবহার করেন। পরে তাঁর গানে বাউল গানের অন্তর্জগতের গভীর বাণী ছাপ ফেলেছে। তাঁর কোনও কোনও রচনাকে তিনি এমনকী ‘রবীন্দ্রবাউলের রচনা’ বলে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর নাটকে বাউল চরিত্র সর্বদাই একক, তার নারীসঙ্গিনী নেই। অথচ বাউলের সাধনা সর্বদাই যুগলের রসরতি।
