দরবেশ আদম ছফি এই তক হদ।
তিনশত একসাত করিয়া যে আলি
প্রকাশ করিয়া দিল সাঁই মত বলি।
এই পদ্যাংশ থেকে আউল, বাউল, দরবেশ, সাঁই— চারটি ধারার খবর মেলে। যাঁরা এক সময় অখণ্ড বাংলায় বাউল-বিরোধী আন্দোলন করেছিলেন সেই শরিয়তবাদী আলেম মুসলমানরা আউল-বাউল-সাঁই-দরবেশ সকলকেই কচুকাটা করেছেন। কারণ বিশ শতকের সূচনায় উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে বহু লোক এসব মরমি ও কায়াবাদী সাধনার পথে চলে যাচ্ছিলেন। বাধ্য হয়ে রংপুর জেলার বাঙালিপুরের মৌলবী রেয়াজউদ্দিন আহমদ ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ অর্থাৎ ‘বাউল মত ধ্বংস বা রদকারী ফৎওয়া’ জারি করে হুঁশিয়ারি দেন:
বাউল বা ন্যাড়াদের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে বঙ্গের অধিকাংশ লোকেই অবগত আছেন; তাহাদের দ্বারা মোছলমান সমাজের যে ভীষণ ক্ষতি হইতেছে, তাহা কাহারও অবিদিত নাই। দীর্ঘকাল হইতে বাউল ন্যাড়াগণ মোছলমানের চক্ষে ধূলি দিয়া তাহাদের ঘৃণিত আচার ব্যবহার গুপ্তভাবে করিয়া মোছলমান সমাজের মেরুদণ্ডকে ক্ষয় করিয়া আসিতেছে। ইহারা ভিতরে অমোছলমান, বাহিরে মোছলমানী নামে নাম, মোছলমান মহল্যায় বাস, মোছলমান কন্যাগণের সহিত বিবাহসাদী ও মোছলমানের সকল প্রকার সামাজিকতায় ভুক্ত। এই অপরিচিত অপ্রকাশ্যভাবে ইহাদের মোছলমানের সহিত মেলামেশার ফলে দলে দলে অশিক্ষিত মোছলমান ইহাদের ধোকাবাজী বুঝিতে না পারিয়া সনাতন এছলাম ধর্মকে ও পবিত্র কোরাণকে ত্যাগ করতঃ কাফের মোরতেদ হইয়া যাইতেছে।… এখনও কি তুমি বাউল ফকিরদিগকে মোছলমান বলিয়া জানিবে? এই কি তোমার এছলামী ঈমান ও মোছলমানী প্রাণের টান? তোমার বেখবরী ও হেশ্কারী হেতু তোমার অধীনস্থ কোন মোছলমান যদ্যপি বাউল মত গ্রহণ করিয়া পবিত্র এছলাম হইতে খারিজ হয় সেজন্য কি তুমি খোদা ও রছুলের নিকট দায়ী নহ?
এখানে বাউলদের গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে ‘ফকির’ শব্দ। শরিয়ত-সন্দিহান মুসলমানরা যখন মারফতি পথ বেছে নেয় তখন তাদের ফকির বলে। একসময় তাদের বাউলদের সঙ্গে এক উচ্চারণে শনাক্ত করা হয়েছে। খুব একটা বিতর্কের ঝুঁকি না নিয়ে আমরা বরং বলি যে বীরভূমের বাউল বা রাঢ়ের বাউলদের সঙ্গে উত্তর ও মধ্যবঙ্গের ফকিরদের অনেক ফারাক। দুজনের সামাজিক ভূমিকা কি আজ এক রকমের? পায়ে হেঁটে খোলাচোখে দেখেছি রাঢ়খণ্ডে বাউলরা জনজীবনের স্বাভাবিক ও অচ্ছেদ্য অংশ। তারা ভিক্ষা পায়, বৈষ্ণব সমাবেশে সাদর আহ্বান পায়; গান গাইতে প্রতীচ্যে যায়, তাদের প্রভূত মান্যতা। তুলনায় নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বাউল ফকিররা অনেক নিম্নবর্গে, সামাজিক হীনতা নিয়ে দারিদ্র্যে দুঃখে বেঁচে আছে। কিন্তু কণ্ঠে তাদের গানের জোয়ার। সিউড়ির কাছে সাম্বৎসরিক পাথরচাপুড়ির মেলায় ফকিরদের মর্মন্তুদ দারিদ্র্য ও গীতিমুখরতা একই সঙ্গে দেখা যায়।
আমি বোঝাতে চাইছি, বাংলার বাউল বলতে কোনও স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ধারণা করে নেওয়া জটিল কাজ। তাদের স্বরূপ স্বভাব ও ক্রিয়াকরণ যেন নানা কাপড়ের টুকরোয় বানানো দরবেশি পোশাকের মতো বিচিত্র ও বর্ণিল। নানা ধারা মিলে মিশে বাউল ধরন গড়ে উঠেছে। আজ তাকে প্রত্যক্ষ সংজ্ঞার সীমায় বাঁধা ঠিক হবে না। মধ্যপন্থী ও বিবেচক পণ্ডিতরা তাই সিদ্ধান্ত করেছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলায় নানা রকম লোকায়ত ও শাস্ত্রবিরোধী ধ্যানধারণা বাউল মতের পরিবর্ধন ও প্রসাধনে সাহায্য করেছে। বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথপন্থ, তন্ত্র ও সুফিবাদ মিলে মিশে এক অদৃশ্য দ্রবণে জন্মেছে বাউল ফকিরদের রূপময় জগৎ। আত্মার চেয়ে দেহ, জাতিবর্ণ দ্রোহ, মন্দির মসজিদের চেয়ে গুরুর নির্দেশ, শাস্ত্রের চেয়ে আত্ম-অনুজ্ঞা— এই দেশে তো নতুন নয়। হয়তো সেই লোকায়তিক পরম্পরার এক সমৃদ্ধ উদ্ভাস বাংলার বাউল। সাধারণভাবে ক্রিয়াকরণ, গানের অন্তর্জগৎ বা আচরণ থেকে বাউলদের সকলে চিনে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁরা আত্মসাবধানী, সন্ধ্যাভাষী, ইঙ্গিতগ্রাহী। আপন মর্মকে তাঁরা ধর্মের ক্রিয়াপরতায় বোঝাতে চান না। তবে তাঁদের বহির্বাস খুব ইঙ্গিতধর্মী ও সুনির্দিষ্ট। কর্তাভজা-সাহেবধনী-বলরামীদের কোনও নির্দিষ্ট পোশাক নেই। বৈষ্ণব সহজিয়ারা সাধারণত সাদা পোশাক পরেন। কিন্তু বাউলদের একটা নির্দিষ্ট বহিরাবয়ব আছে। বেশ কিছুকাল আগেকার একটা বর্ণনা থেকে বাউলদের বিবরণ উদ্ধৃত করছি—
কেশ বিন্যাস দেখিলেই বিলক্ষণ চিনা যায়। পরিধানে গেরুয়াবসন, হস্তে লৌহবালা, বগলে দীর্ঘ চিমটা, গলে পাথুরিয়া মালা, আর একটা হুঁকাতে লম্বা নল লাগানো, তাহাতে এক কলিকা গাঁজা সাজিয়া, জয় বোবুম বোবুম গুরু সত্য বলিয়া চক্ষু দুইটি মুদ্রিত করিয়া, সেই গাঁজায় দোম দিতে থাকে।
অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ বইতে একশো বছর আগেকার বাউলদের বর্ণনা দিয়ে গেছেন এই রকম—
এই সম্প্রদায়ীরা তিলক ও মালা ধারণ করে এবং ওই মালার মধ্যে স্ফটীক, প্রবাল, পদ্মবীজ, রুদ্রাক্ষ প্রভৃতি অন্যান্য ও বিনিবেশিত করিয়া রাখে। ডোর কৌপিন ও বহির্বাস ধারণ করে এবং গায়ে খেলকা পিরাণ অথবা আলখাল্লা দিয়া ঝুলি, লাঠি ও কিস্তি সঙ্গে লইয়া ভিক্ষা করিতে যায়।… ক্ষৌরি হয় না, শ্মশ্রু ও ওষ্ঠলোম প্রভৃতি সমুদয় কেশ রাখিয়া দেয় এবং মস্তকের কেশ উন্নত করিয়া একটি ধম্মিল বাঁধিয়া রাখে।
