বাউল নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতি কি বুঝে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতন্ত্র এক পথিক। ‘অন্যে ভালো কি খারাপ ভাববে এই আশঙ্কাতে আমরা ঠিক যা করতে চাই কখনো করতে পারি না। এবং এই না পারতে না পারতে একসময় আমরা নিজে নিজের মতো না হয়ে অন্যের মতো হয়ে যাই। লাজ লজ্জা ভয়ের নিকুচি করে বাউল ছাড়া আর কে অন্যের মতো না হয়ে নিজের মতো হয়, হতে পারে? মানুষের কাছে এর চেয়ে মূল্যবান আর কিছু আছে!’ এখানেও বাউল সার্থক। এখানেও তাদের তুলনা নেই।
বাউলদের সম্পর্কে লিয়াকতের যে পক্ষপাত তা নিশ্চয়ই তাঁর একার নয়। আমাদের মধ্যে যারা একটু সমাজছুট, মুক্ত স্বভাবের বা স্বচ্ছ চোখে জীবনকে নীতির ঊর্ধ্বে দেখতে আগ্রহী, বাউল জীবন তাদের রোচক হতে বাধ্য। শুধু বাউল কেন বাংলা চৈতন্যপরবর্তী অনেকগুলি গৌণ ধর্মে এই জীবনধর্মিতা ও মানবমুখিনতা আছে। কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলরামী, লালনশাহী, সহজিয়া বৈষ্ণব— এ সব নানা ধারাপ্রবাহে বয়ে চলেছে মানবচেতনার বেগবান স্রোতস্বিনী। বেগবান কিন্তু বহুক্ষেত্রে অন্তঃশীল, গোপন ও গূঢ়। একদিক থেকে ভাবলে এই সব কায়াবাদীরা আসলে ডি-ক্লাসড, শ্রেণিবর্ণহীন। ইহজীবন ও দেহজীবনের দ্বন্দ্বে-ছন্দে তাদের অনুরাগী দোলাচল। একটা অস্ফুট রহস্যের হাতছানি, অন্বিষ্টের জন্য এক মমতাময় আততি তাদের ছন্নছাড়া মন্ত্রহীন ব্রাত্যজীবনের দিকে অমোঘ টানে টেনেছে। অস্পষ্ট পরলোক নয়— বর্তমান জীবনযাপন, অস্বচ্ছ ঈশ্বর নন— প্রত্যক্ষ নরনারী, পূণ্যব্রত উপবাস তীর্থ মন্দির নয়— দৃঢ় সম্মিলিত সুস্থযৌনতার স্বীকৃতি, তাদের লক্ষ্য।
কিন্তু বাউলদের নিয়ে গত এক শতক বাঙালির ভাবালুতার শেষ নেই। ১৮৯০ সালের লালন শাহ-র প্রয়াণের পর তাঁকে নিয়ে বাউলপক্ষীয় ও বাউলবিরোধী দুটি দলই সক্রিয় হয়ে ওঠে। কলকাতার উচ্চমহলে ও বাংলার শিক্ষিতসমাজে বিশেষত ঠাকুরবাড়ির প্রয়াসে এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত উদ্যমে ছাপার অক্ষরে লালনের গান ও তার মর্মরস প্রচারিত হয়। শুরু হয়ে যায় বাউল গান সংগ্রহ ও সংকলনের নানামুখী উদ্যম। গড়ে ওঠে কয়েকটি শখের বাউলের দল। ক্রমে ক্রমে নানা গৌণধর্ম ও সম্প্রদায় একই সঙ্গে ‘বাউল’ এই সাধারণ (Generic) ও বিশেষ (Specific) সংজ্ঞায় আবদ্ধ হয়ে যায়। বাউল সুর বলে একটা অলীক অনির্ণীত ধরন বাংলা গানে চেপে বসে। আজ সময় এসেছে তথ্য ও যুক্তি অবলম্বন করে ইতিহাসের পথে বাংলার বাউলদের স্বরূপসন্ধান। সে কাজ বেশ কঠিন।
কঠিন এইজন্য যে, বাউলদের সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল নানা অলীক ধারণা ও অনুমানাত্মক সংজ্ঞার জন্ম দিয়েছে। মধ্যযুগের একটি বাংলা কাব্যে ‘বাউল’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে দেখে অনেক পণ্ডিত অনুমান করে বসেছেন যে বাউল ধর্ম সুপ্রাচীন। কিন্তু বাউল কি কোনও ধর্ম? মূলে সেই কথাটারই এখনও মীমাংসা হয়ে ওঠেনি। বাউল কি একটা মৌলিক শব্দ না নিষ্পন্ন শব্দ? এ প্রশ্ন ওঠে এই কারণে যে অনেকে মনে করেন বাউল কথাটা ‘বাতুল’ থেকে এসেছে। বাতুল মানে পাগল। অন্য একদল মনে করছেন বাউল এসেছে ‘ব্যাকুল’ শব্দ থেকে, কেননা বাউলরা আত্মানুসন্ধানে ব্যাকুল। ক্ষিতিমোহন সেনের মতো বাউলবিশেষজ্ঞ মনে করছেন: তাঁহারা মুক্ত পুরুষ, তাই সমাজের কোনো বাঁধন মানেন নাই। তবে সমাজ তাঁহাদের ছাডিবে কেন? তখন তাঁহারা বলিয়াছেন, “আমরা পাগল আমাদের কথা ছাড়িয়া দাও। পাগলের তো কোনো দায়িত্ব নাই।” বাউলের অর্থ বায়ুগ্রস্ত, অর্থাৎ পাগল।’
এই কথাটার ধরতাই মেনে একজন লিখলেন বায়ু + ল = বাউল। আরেকজন বললেন, হিন্দি ‘বাউর’ বাংলায় হয়েছে বাউল। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে ‘ঈশ্বরপ্রেমে মাতাল, বাস্তবজ্ঞান বর্জিত, উদাসীন ভক্ত’, এই অর্থে নাকি বাউল শব্দ একাধিক স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে, বলেছেন অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। আরবি-পারশি ভাষায় পণ্ডিত হরেন্দ্রচন্দ্র পাল মনে করছেন ‘আউলওয়লী’ শব্দ থেকে আউল-বাউল শব্দের জন্ম। গীতিকার দুদ্দু শাহ গানে বলেছেন: ‘যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল।’ একজন বলেছেন আরবিতে ‘বা’ মানে আত্ম, ‘উল’ মানে সন্ধানী, অর্থাৎ বাউল মানে আত্মানুসন্ধানী।
এসব আধুনিক কালের পণ্ডিতি কচকচি ছেড়ে উনিশশতকীয় পণ্ডিতদের বইয়ের পাতা ওলটালে দেখা যাবে, তাঁরা বাউল শব্দের উৎপত্তির চেয়ে তাদের আচার-আচরণ সম্পর্কে নানা অদ্ভুত মন্তব্য বা ধারণা রেখে গেছেন। যেমন অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ বইতে বাউলদের সম্পর্কে এতদূর লিখেছেন যে, ‘শুনিতে পাই ইহারা নরবধ করে না; মানুষের মৃতদেহ পাইলে ভক্ষণ করিয়া থাকে।’ পণ্ডিত যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন, বাউল— ‘a mad man, A class of beggars who pretend to be mad on account of religious fervour, and try to uphold their pretention by their fantastic dress, dirty habits and queer philosophy of their songs.’ বসিরহাটের কাজি মৌলবী কেরামতউল্লা ও গোলাম কিবরিয়া ‘উচিত কথা’ বইতে আরেক নতুন তথ্য যোগ করে বলেছেন, বাউলদের মতে আসল ফকিরি-তত্ত্ব চারটি, যেমন—
আউলে ফকির আল্লাহ বাউলে মোহম্মদ
