না, এমন দায়িত্ব বোধের অভাবের পরিচয় আমরা দিইনি। আমরা গত এক দশকে প্রচুর বাউল ও ফকিরি গান গোলাজাত করেছি। তার বিষয়গত বিন্যাস, শ্রেণিকরণ, তার অন্তঃস্থ ইতিহাসের দ্যোতনা, তার প্রতিবাদ ও সমন্বয় বার্তা আমরা পেয়েছি। তৈরি হয়েছে উপেক্ষিত এই ব্রাত্য সমাজের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্তীয় সতর্ক সমাজের সংলাপের ক্ষেত্র। আবার অতিকৃতিও চলছে নাকি? ক্ষুধার্ত বাউল গায়কদের নিয়ে বিদেশ-বিপণনের ব্যাবসাও আজ আর প্রচ্ছন্ন নেই।
সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় একটু রসান দিয়ে মন্তব্য করেছেন: ‘the Baul, of course, having been granted cultural benediction in the twentieth by its elevation to the status of an export item in the Festival of India circuit.’
এই রপ্তানি-যোগ্যতার কারণ বাউলদের বহুবর্ণিল পোশাক, গুপিযন্ত্র, মাথার ধম্মিল্ল ও নাচের চমৎকার ভঙ্গি। একেবারে নিখুঁত শো-পিস। অনুষ্ঠান জমাতে অদ্বিতীয়, গঞ্জিকাপ্রিয় এই খ্যাপা বাউলরা বিদেশের মুক্ত সমাজে ও যৌনস্বাধীন যুবমানসে সাড়া তুলেছে। বাউল গানের তারসপ্তকের স্বর-গ্রাম অনেককে টানে। মুক্ত নির্বাধ জীবনযাপন, নারীসঙ্গিনী গ্রহণ-বর্জনের স্বতশ্চল স্বাধীনতা, ইতিউতি সর্বত্র ঘোরাফেরা, সংস্কারহীন খাদ্যাভ্যাস বাউলদের সর্বজনগ্রহণীয় করে তুলেছে। তবে পট পাল্টাচ্ছে। বাউল বিশেষজ্ঞ অমিত গুপ্ত লক্ষ করেছেন:
মূলত তত্ত্বভিত্তিক হলেও বাউল গানের… সুর ছন্দ, অর্থ ও ব্যঞ্জনায় শুধু রস বিস্তারই নেই অন্য আবেদনও আছে। বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমজীবী সবার কাছেই বাউল গান গ্রহণীয়। বাউল গানের ক্ষেত্র ও পরিসর সমাজের পটভূমিতে তাই এত বিস্তৃত।
ভূমিহীন এই সম্প্রদায়ের মূলজীবিকা ছিল মাধুকরী। সারাদিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে যা উপার্জন করত তা দিয়েই তাদের গ্রাসাচ্ছাদন হত। এদের ঘর বাড়িও ছিলো না। আখড়া বা সাময়িক আস্তানা গড়ে এখানে-ওখানে বসবাস করত। আজকের চিত্রটা ভিন্ন।… জীবিকা হিসাবে বাউল বেছে নিয়েছে গানকে। প্রভাব ফেলেছে। রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা। বিদেশের হাতছানিও বাউলকে প্রভাবান্বিত করেছে।… কৃষিজীবীদের পৃষ্ঠপোষকতার স্থান আজ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের হাতে, বাউলদের ক্ষেত্রে। বাউলদের সাধন-জীবনের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যায়ন হয়েছে বাউল গান ক্ষ্যাপা জীবনের নির্যাস, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প পণ্য-ক্রেতাদের কাছে।
এখনকার বাউল তথা বাউলজীবন বিষয়ে আধুনিক যুবক-যুবতীদের অনেকে বেশ উৎসাহী। বীরভূমের নানা বাউল সমাবেশে, বিশেষত কেঁদুলির মেলায়, নবীন বয়সের ছেলেমেয়েদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। তার সবটাই লোকদেখানি বা অগভীর নয়। বাউলগানের ভেতরকার একটা অনতিব্যক্ত উচ্চারণের ধরন এখনকার কবিদের খুব টানে। বাউলদের অবাধ জীবনযাপনের মুক্তছন্দ, তাদের ছকভাঙার দুঃসাহস, সমাজবন্ধনের প্রতিবাদী স্বাধীন ঘোরাফেরা অনেককে আকর্ষণ করেছে। যেমন সাতকেঁদুরির তরুণ কবি লিয়াকত আলি। এক সময় ছিলেন উদাম বিস্ফোরক রাজনীতিক ঢেউয়ের শীর্ষে। জেল থেকে ফিরে সংস্কার-মুক্ত প্রতিবাদী মনটাকে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শে তেমনভাবে আর রাখতে পারছিলেন না লিয়াকত। সেই সময় বীরভূমের নানা বাউলদের ঠেকে ঘুরে পেয়ে যান চমৎকার এক মানসিক আশ্রয় ও মানবিক আস্থার উৎস। লিয়াকত নিজে বাউল নন, কিন্তু সেই স্রোতোধারার স্বচ্ছ জলে স্নান করে শুদ্ধ। বাউলদের সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণে তাই একটা অন্য বিবেচনা ধরা পড়েছে। লিয়াকত লিখেছেন:
নারী পুরুষের সম্পর্ক একটাই সেটা যৌনসম্পর্ক। এটাই প্রাকৃতিক সম্পর্ক। যা প্রাকৃতিক তাই ধর্ম, তাই সত্য, এর ভালমন্দ ন্যায় অন্যায় হয় না। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর নারীপুরুষের সম্পর্ক একরকম। একমাত্র মানুষই নারী ও পুরুষের এক ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ক স্বীকার করে নিয়েছে। যেহেতু ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়— মানুষের বানানো— সেহেতু এর ভুলভ্রান্তি সম্ভব।… বাউলরা এই সত্যটা জানে। আর জানে বলেই তারাই হচ্ছে গুটিকয় সেই মানুষ যারা প্রায় নারী পুরুষের তথাকথিত ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ককে অস্বীকার করে বেঁচে আছে। একটা সাধনসঙ্গী নিয়ে কোন বাউল গোটা জীবন কাটায়। আবার অনেকেই দেখা যায় জীবনের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন সাধনসঙ্গীর সঙ্গে। কখন যে কার সঙ্গে থাকবে কি পুরুষ কি নারী কেউই জানে না। নতুন কাউকে ভাল লাগলে পুরানোকে ছেড়ে যাওয়াই রীতি। কখনও বা নতুনকে ছেড়ে পুরানোর কাছে ফিরে যাওয়া। যে যখন যার সঙ্গে থাকে, সে-ই তার সুখ দুঃখ ও সাধনার সাথী। যখন থাকে না ভুলে যায় পরস্পরের কথা। স্থায়ী ভাবে ঘর সংসার বলে এদের কিছু নেই। আছে মাথা গোঁজার অস্থায়ী আশ্রয়। যৌথভাবে থাকার সময়ও কেউ কারও উপর তেমন নির্ভরশীল হয়, না, উভয়েই ভিক্ষা করে, উভয়েই খায়। আর এ ভাবে যতদিন বেঁচে থাকে, আকাঙ্ক্ষিত মানুষের সঙ্গসুখ নিয়ে বাঁচে।
এখানে বলে নেওয়া ভাল যে বাউলের কাছে সঙ্গসুখ কথাটা মূল্যবান! তাদের সম্পর্কে মরমি মানুষদের বাউলরা বলে রসিক সুজন। যদিও বাউলদের একান্ত গুহ্য একটা দেহসাধনার ব্যাপার আছে তবু সেটাকে প্রচ্ছন্ন রেখে তারা সকলের সঙ্গে মিশতে পারে। কেননা ঈশ্বরপ্রেম বা জীবে দয়ার বদলে বাউলের মানুষের সম্পর্কে রুচি বেশি। লিয়াকত আলি ঠিকই লক্ষ করেছেন যে দেহসাধনার ব্যাপারেও—
