অবশ্য এতসব বিচিত্র দৃষ্টিকোণ একদিনে অর্জিত হয়নি। প্রথমদিকে গৌণধর্মীদের আমরা ঘৃণা ও বিরুদ্ধতা ছাড়া কিছুই দিইনি— পরে দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা দ্রব ও অনুকম্পায়ী হয়েছে। পরিবর্তনের কারণ বোঝা কঠিন নয়। সবচেয়ে বড় কারণ এটাই যে, আঠারো ও উনিশ শতাব্দীর টানাপোড়েনের কালে বাঙালি হিন্দুসমাজে ধর্মচিন্তার যে আলোড়ন ঘটেছিল তার অনেকটা নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের সীমায় অবরুদ্ধ ছিল। ঔপনিবেশিক ভাঙা গড়ায় ধনী অভিজাত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও গৃহস্থ ভদ্রলোক— এই ত্রিস্তর সমাজকাঠামোয় ধর্মধারণা নানা মাত্রা ও রূপ নিয়েছিল। শিক্ষার আলোয় পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞান এদেশের মননে নতুন চেতনার বিকিরণ করে, ফলে ধর্মকে দেখা হতে থাকে নানা চোখে। একদিকে রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, অক্ষয়কুমার, কেশবচন্দ্র— অন্যদিকে রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিজয়কৃষ্ণ ধর্মের জ্ঞান কর্ম ও ভক্তিমার্গের বহু দিক উন্মোচন করেন। কারুর শস্ত্র ছিল জ্ঞান ও যুক্তি, কারুর শরণাগতি ও ভাবোদ্বেল প্রশান্তি। এ ছাড়া সাকার-নিরাকারের প্রশ্ন ছিল। ঐতিহ্যবোধ, শাস্ত্রজ্ঞান, গুরুর গুরুত্ব, শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব, একেশ্বরবাদ, আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস ও পরলোকতত্ত্ব— এতসব বিচিত্র ও বিরোধী সংঘাতে সংশয়ে দুলছিল তখনকার নাগরিক মধ্যবিত্ত বাঙালির সমাজকাঠামো। আমাদের পাঠক্রম ও উচ্চতর শিক্ষাপদ্ধতি বাঙালির এই মানস-সংঘর্ষের ইতিহাসকে বড় করে দেখিয়ে আসছে বলে সমাজের অন্য দিকটা অজানা রয়ে গেছে। তাই আমরা জানতে চাইনি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পরে নবাবি শাসনের ব্যর্থতার দায় কেমন করে বাংলার গ্রামসমাজকে জীর্ণ করেছিল। আর সেই জীর্ণতার ফাঁকে ফোকরে ঢুকে জেঁকে বসেছিল জাতিভেদ, বর্ণদ্বেষ, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও পুরোহিত বা মোল্লাতন্ত্র। ব্রাহ্মণ্য সমাজের একনায়কত্বজাত কঠোর বর্ণব্যবস্থা আর মুসলমান শরিয়তি নীতির কট্টর আচরণ থেকে পিঠ বাঁচাতে গড়ে উঠেছিল নানা ধরনের গৌণধর্ম, যার মূলে ছিল শোষিত হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত চৈতন্য ও সমন্বয়স্বপ্ন।
ইংরেজের বিদ্যালয়ে ইতিহাসের পাঠ নিয়ে আমাদের ইতিহাসবোধ গড়ে উঠেছিল বলে সেকালের বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও ধর্মনেতারা বুঝতে পারেননি বাংলার গৌণধর্মের অন্তর্লীন শক্তি আর মানবমুখিনতাকে। চোখে পড়েনি মধ্যযুগের কবীর নানক-দাদু-রজ্জবের সন্ত পরম্পরার ঐহিক বাণীর সঙ্গে বাউলদের চিন্তার সমকত্ব। রবীন্দ্রনাথের অনুভবেই প্রথম ধরা পড়ে গৌণধর্মীদের মহিমা ও সেই একলা-পথ-চলার গরিমা। তিনিই প্রথম বলেন,
বড়ই দুঃখের বিষয় যে আমরা দেশে থাকিয়াও দেশের বিষয় কিছুই জানি না।… বস্তুত আমাদের এইরূপ অজ্ঞতা স্বদেশের প্রতি আমাদের অনুরাগকে বড়ই সংকীর্ণ করিয়া ফেলে।
বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের তিনি চোখ ফেরাতে চেয়েছিলেন, ‘দেশের দিকে— চারিদিকে— দেশের মাটির দিকে।’ ‘সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মমত প্রচলিত, অজ্ঞাতে ও অলক্ষিতে যে সকল শক্তি সমাজের মধ্যে’ কাজ করছে তাকে জানতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলেন ‘সমাজের একান্ত আত্ম সংকোচনের অচৈতন্যের মধ্যেও… আত্ম প্রসারণের উদ্বোধন চেষ্টা’ রয়েছে নিম্নবর্গাশ্রিত আমাদের গৌণধর্ম সংগঠনের অভ্যন্তরে। সেটাই তার ভারতীয়ত্বের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
এখন ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। বাউল নয় শুধু, সব রকমের নিম্নবর্গের নবচেতনার কথা এখন শিক্ষিত বাঙালি জানতে উৎসুক। সাব-অলটার্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসতত্ত্বের যে-নবব্যাখ্যান আর বয়ান তৈরি হচ্ছে আজকাল তার রসদ পাওয়া যাচ্ছে গৌণধর্মীদের আচার আচরণে, বিশ্বাসে ও গানে। উচ্চবর্ণের ও বর্গের ধর্মচেতনার প্রতিবাদ ও সহকারিতা, এই দ্ব্যণুক সম্পর্কের টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে স্পন্দমান এ রকমের ঊন-ধর্মবোধে। প্রতিবাদের দিকটি সম্পূর্ণ অবারিত ও গানে গানে অভিব্যক্ত। লালন ও দুদ্দু শাহ-র গান এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে উদাহরণীয়। সহকারিতার দিকটি একটু ধূসর, তাই সহসা চোখে পড়ে না। কিন্তু লক্ষ করলে অনুধাবন করা যায়, সাম্প্রদায়িক মূর্তিকে ভাঙতে গিয়ে তার বদলে তারা গুরুমূর্তিকে প্রতিষ্ঠা করে বসে, শাস্ত্রের অস্বীকৃতি পরিণতি পায় গুরুবচনের অলঙ্ঘনীয়তায়। সবরকম অধীনতার বন্ধনপাশ ছিন্ন করতে চায় যে-লোকধৰ্ম তা বন্দি হয়ে পড়ে গুহ্য রহস্যময়তায়। বাউলের আসক্তিহীনতা বারবার অপ্রমাণিত হয় তাদের নারীসঙ্গের অতিরেকে। একস্তরের বাউলের উদগ্র যশোপিপাসা আর প্রচারপ্রবণতা ধ্বস্ত করে দেয় তাদের পরম্পরাগত আত্মস্থ ধ্যানতন্ময়তাকে। কেউ কেউ গৃহস্থসুলভ ভোগবাদে স্পৃষ্ট হয়ে পড়ে। অথচ বাউলজীবন আর বাউলগান, নানা বিকৃতিসত্ত্বেও আজ ব্যাপক জনাদরে সচল। আশ্চর্য যে, বাউলের প্রতীক-প্রতিমা একতারা আজ বুদ্ধিজীবীদের গৃহসজ্জার উপাদান!
বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত মনীষী আহমদ শরীফ দেড়দশক আগে কিছুটা বিস্ময়মুগ্ধ চিত্তে চমকিত হয়ে লিখেছেন:
ইদানীং বাউল মত ও গান আমাদের চেতনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। কেবল তাই নয়, নানা কারণে এসব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টায় বিপুলসংখ্যক গান সংগৃহীত হয়েছে। সাড়ে তিনশ বছর ধরে দেশের জন-সমাজের এক অংশ এমনি নিষ্ঠার সঙ্গে যে জীবন-চর্চার এ বিপুল আয়োজনে এতদূর এগিয়ে গেছে, সে সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। লোকচক্ষুর অন্তরালে লোকান্তরে প্রসারিত জীবন বোধের পরিচয়বাহী এই কাকলিকুঞ্জে প্রবেশ করে, এই সুর-সমুদ্রে অবগাহন করে বিস্ময় মানি।… বিস্ময়মুগ্ধ চিত্তে ভাবছি,— এ নিয়ে আমরা কি করব।… দেশের প্রাকৃতজন যখন ফলপ্রসূ চাষে নিরত, তখন শিক্ষিতগণ নিষ্ফল উদ্যান রচনায় ব্যস্ত। বাউল মত যদি আদ্যিকালের ইতিকথা হত, তা হলে পরিহার-যোগ্য ঐতিহ্য মনে করতাম। কিন্তু আজকের মানুষের এক অংশের জীবন দর্শনের প্রতি এমনি উদাসীন থাকা দায়িত্ববোধের অভাবই জ্ঞাপন করবে।
