আমাদের অনুভূতিতে আজ তাই দোলা লেগেছে, ইতিহাস তার পরিচিত ভঙ্গি বদলে নতুন আদলে ধরা দিতে চাচ্ছে; নিছক অধ্যাত্মবাদ, বস্তুবাদ-এর কোনওটিই নয়, দুইয়ের প্রাসঙ্গিক ও যুগোপযোগী মিলনের আকাঙ্ক্ষাই আজ বড়ো হয়ে উঠেছে। বাউল গান শুধু গান নয়, বাউল গানের ইতিহাসের পাতায় মুখর সাধকদের অন্তর্গূঢ় বাণী হিসাবে শুধু নয়, ইতিহাসের নতুন পথনির্দেশনারূপে আমাদের অনেকের চেতনায় প্রতিভাত হচ্ছে। আমরা গ্রহণ করতে চাচ্ছি এর মানবিকতা এর আধ্যাত্মিকতা এবং এর বস্তুবাদিতাও। মানে করলে দাঁড়ায়, আমরা পুনরায় শিকড়াভিমুখী, পুনরায় আশ্রয়প্রত্যাশী; আমাদের অভিগমন ঐ সব লুপ্তপ্রায় চিহ্ন ও অভিজ্ঞতার কাছে, সেখানে আমাদের অনুপ্রেরণা বাউলের গান, আর অবলম্বন লালন, হাসন, শাহনূর, শীতলাং, ভবানন্দ, ভবা পাগল, পাগলা কানাই, রাধারমণ, আরকুম শাহ, দুর্বিন শাহ, মহিন শাহ, শেখ ভানু, আব্দুল করিম, এমনি শত শত নাম, নামহীন জানা-অজানা মানুষের পরিমণ্ডলে চর্চিত জীবনদর্শন, এক ঋদ্ধ ইহ-আধ্যাত্মিকতা।
নব্য বাঙালির এমন শিকড়সন্ধান ও আশ্রয়প্রত্যাশার অধুনাতন প্রয়াস হয়তো সত্য ও আন্তরিক কিন্তু সেই শুশ্রূষা কি শুধু প্রাক্তনদের লেখা গানেই মিটে যাবে? নতুন গীতিকারদের লেখা গান খুঁজব না আমরা? খুঁজে যদি পাই তবে সেই গান কি অনিকেত আমাদের দিশা দেবে? কী করে দেবে— যখন এখনকার বাউল গীতিকাররাও আরেক অর্থে বিভ্রান্ত ও বিব্রত? যখন চটকদারি কথাবার্তা, বানানো প্রহেলিকা তাঁদেরও আচ্ছন্ন করছে— ‘সত্য বলো সুপথে চলো’ এমন লালনবাণী যখন উপেক্ষিত অবহেলিত, তখন?
আহমদ মিনহাজ অবশ্য বোঝেন অধুনাতনের বাউল-সমস্যা। গত কয়েক দশক এবং বিশেষ করে গত দশ বছর পশ্চিমবঙ্গের বাউল-ফকির অধ্যুষিত গ্রামদেশে ঘুরে আমি যা বুঝেছি, বাংলাদেশে বাস করে মিনহাজ তার থেকে অনুভবের খুব একটা দূরত্বে নেই। তাই তিনি লেখেন:
এ যুগ বাউল হবার উপযোগী নয়। জীবনধারণের সমস্যা এত কঠিন হয়ে গেছে, বাউলরাই আজকাল বাউল হতে চান না। গ্রামগুলোতে অভাব দিন দিন বাড়ছে, নগুরে বাবুয়ানা ঢুকে পড়ছে, কে আর গভীর মন নিয়ে বাউলের গান শুনবে, বাউলকে গ্রাসাচ্ছাদনের সুরাহাটুকু করে দেবে। এখনো যারা বাউল আছেন তারা আগের মতো গুহ্য শাস্ত্রের চর্চা করেন না, জীবনের রূঢ় বাস্তবকে প্রকাশ করেন গানে; বলেন মানুষের অভাবের কথা, দারিদ্র্যের কথা, লোক সংস্কৃতির সমৃদ্ধ চিহ্নগুলো হারিয়ে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ পায় তাদের গানে।
এরকম অনেক গান আমি সংগ্রহ করেছি আবার নানা সংকলনেও বাউলদের লেখা এমন কিছু কিছু গান রয়েছে যাতে ধরা আছে বিগতদিনের জন্য চাপা কান্না— হারিয়ে-যাওয়া সম্মিলিত গ্রমিক যাপনের স্মৃতির জন্য দীর্ঘশ্বাস। এমন গানগুলির মধ্যে সবচেয়ে যেটি মর্মস্পর্শী বলে মনে হয়েছে আমার, এখানে উদ্ধৃত করছি—
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান ঘাঁটু গান গাইতাম।
বর্ষা যখন হইত গাজীর গান আইত
রঙ্গে ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম।
বাউলা গান ঘাঁটু গান আনন্দেরই তুফান
গাইয়া সারিগান নাও দৌড়াইতাম—
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।
হিন্দু বাড়িন্ত যাত্রাগান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম।
মনে ভাবনা সেদিন কি পাব না
ছিল বাসনা সুখি হইতাম…
বাংলাদেশের বাউল গীতিকার আবদুল করিম এমন একখানি সমাজসম্পৃক্ত গান লিখলেন কেন? সমাজের পটপরিবর্তন, লোক সংস্কৃতির থাকা-না থাকা, হিন্দু-মুসলমান সাম্য— এসব নিয়ে বাউলের ভাবনা কেন? ভাবনা এইজন্য যে তার নিজের পথ নির্ধারিত ও স্পষ্ট কিন্তু সেই পথের চারপাশের যে-সমাজ, যে-মানব পরিবেশ তা নিয়েও তার ভাবনা— সেখান থেকেই তার উদ্ভব। তার জন্মের তো কোনও অ-লৌকিক উৎস নেই। স্বদেশ আর স্বসমাজের ভাষাই তার ভাষা— সেই ভাষায় লেখা গান তার স্বভাষীরই সমাদরের বিষয়। সমাজ তাকে তেমন মান দেয়নি, তার জীবনযাপনের ক্লিষ্টতায় দরদ দেখায়নি, সমাজের মূলস্রোতে বাউলের স্থান নেই, সে গ্রামের একটেরে পড়ে থাকে, প্রান্তিক বর্গের মানুষ, তবু সেই সমাজই তার শিক্ষক, সমাজই তার উপমা-প্রতীক-রূপক রচনার চাক্ষুষ উৎস৷ যাদুবিন্দু গোঁসাইয়ের একটা বাউল গানে একজন একক মানুষের দুঃখভারনত জীবনের ছবি আছে—
যে ভাবেতে রাখেন গোঁসাই
সেইভাবেই থাকি
আমি অধিক আর বলব কি!
কখনও দুগ্ধ ছানা মাখন ক্ষীর নবনী
কখনও জোটে না ফেন আমানি
কখনও আ-লবণে কচুর শাক ভখি—
‘Life is either a feast or a fast’ দর্শনে বিশ্বাসী এই একক মানুষটি সত্যিই কি একক না সমষ্টির ব্যথাবেদনার শরিক? গীতিকারের কি কোনও অভিযোগ আছে ব্যক্তি বা সমাজের বিরুদ্ধে? ‘গোঁসাই’ কে? উত্তরের খোঁজে গানের পরবর্তী অংশ পড়তে পারি—
তুমি খাও তুমি খিলাও
তুমি দাও তুমি বিলাও
তৈয়ারি ঘর পেলে তুমি পালাও
তোমার ভাবভঙ্গি বোঝা ঠকঠকি।
গুরু দুখ দিতেও তুমি সখ দিতেও তুমি
কুনাম গুনাম সুনাম বদনাম সবই তোমারই
ও কুলআলম্ তোমারই ও কুদরতবিহারী।
তুমি কৃষ্ণ তুমি কালী তুমি দিলবারি॥
কহিছে বিন্দুযাদু তুমি চোর তুমি সাধু
তুমি এই মুসলমান এই হিঁদু…
সাব্লিমেশনই এ গানের সারকথা। গুরুই সেই পথে তাকে টেনেছে। সে একলা পথিক কিন্তু একক নয়— তার সঙ্গী জ্বলন্ত বিশ্বাস ও স্থির প্রত্যয়। সমাজ থেকে ছিন্ন হয়ে সে সমাজকে দেখায় সমন্বয়ের স্বপ্ন।
