ঈশ্বরলাভ আর স্বর্গপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা গায়ে গায়ে লেগে থাকে। যুক্তিবাদী লালন শাহ মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছেন এ প্রসঙ্গে। বলছেন:
মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে কেন বলে?
মলে হয় ঈশ্বরপ্রাপ্ত সাধু অসাধু সকলে
তবে কেন এত জপতপ এত করে জলেস্থলে?
সকলেরই তো লক্ষ্য ঈশ্বরপ্রাপ্তি, সাধু অসাধু সকলেই তো পাবে ঈশ্বর, হলে আর কেন এত জপতপ এত কৃচ্ছ্রসাধন? তারপরের জিজ্ঞাসা:
যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয়
মলে তা যদি তাতেই মিশায়—
তবে ঈশ্বর-অংশ ঈশ্বরে যায়
স্বর্গ-নরক কার মেলে?
একেবারে তাত্ত্বিক প্রতিপ্রশ্ন। পঞ্চভূত থেকে আমাদের সৃষ্টি আবার পঞ্চভূতেই বিলয়, তা হলে কোন সে উদ্বৃত্ত অংশ যা স্বর্গে বা নরকে যাবে? এ জাতীয় তত্ত্ব ও দ্বান্দ্বিকতার বিন্যাস থেকে বোঝা যায় নিম্নবর্গজাত বাউলফকিররা খুব হেলাফেলার, অবজ্ঞার বা ঘৃণার বিষয় নয়, অনুধাবনের বিষয়।
এদেশে বাউল একটি তত্ত্ব হিসাবে গৃহীত হয়েছে, ধর্মহিসাবে নয়। এরা একই সঙ্গে বৈদিক কর্ম কাণ্ড এবং ব্রাহ্মণ্য আচার আচরণের বিরোধী। এদের ভাবনা ধারণা গঠনে বৈষ্ণবীয় রাগানুগা সাধনা ও পরকিয়া মৈথুনকেন্দ্রিক কায়াবাদ আছে। বেশ কিছুটা প্রতিবাদী ইসলামি স্পর্শ এবং অনেকটা সুফিবাদের সংক্রাম আছে। বৌদ্ধ শূন্যবাদ ও নাথপন্থের কিছু কিছু সংরাগও লক্ষণীয়। এককথায় বাউল ভাবনায় এক উদার ও সমন্বয়বাদী মানবচেতনা কাজ করেছে, যার নেতৃত্বে শাস্ত্র বা মন্ত্র নেই— আছে গান আর গুরুর নির্দেশ। গানগুলি দ্যোতনাময় ও গূঢ়, তাকে ভেদ করতে হয় সাধনায়। এক কথায় বাউলরা হল ভোগমোক্ষবাদী, সমাজছুট কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্ন নয়। সামাজিক দায়দায়িত্ব তারা নিতে চায় না কিন্তু সমাজের শোষিত নিম্নবর্গের শ্রমজীবী অংশ থেকে যেহেতু তাদের আবির্ভাব তাই অত্যাজ্যভাবে তাদের গানে রয়ে যায় নানা সামাজিক স্মৃতি ও সংস্কার, রূপক ও প্রতীক। তাদের গানের ভাবে-বর্ণনায়-সুরে মাটির স্পর্শ খুব প্রকট। কেউ কেউ মনে করেন বাউল সাধনায় পর্যুষিত হয়ে আছে বাংলার ধর্ম, বাঙালির ধর্ম ও তার চিরার্জিত মানসজীবন। ‘দেশীভাবে ও বিদেশীপ্রভাবে এর উদ্ভব,’ এমন কথা বলেছেন কেউ— সেক্ষেত্রে বিদেশি বলতে ইসলাম ও সুফিপ্রভাবের কথাই ব্যঞ্জিত। ‘সমাজের উপরতলার লোকের ধর্ম হলে এই মতবাদ যে কেবল বাঙালির জীবন ও ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত করতো তা নয়, দুনিয়ার মানুষের কাছে উদার মানসিকতার জন্য বাঙালিকে শ্রদ্ধেয়ও করে তুলতো’— আহমদ শরীফের মতো প্রাজ্ঞজনের এ হেন মন্তব্যে ভাবাবেগ যতটা স্ববিরোধও ততটা। কায়াবাদী যৌনযৌগিক কোনও গোপ্য সাধনরীতি কি উপরতলার লোকের চর্চার বিষয় হতে পারে? এ কি কোনওভাবে বহুজনের আচরণীয়?
আহমদ শরীফ অবশ্য বাউলতত্ত্ব বিষয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন বহুদিন আগে, ১৯৬৩ সালে। তারপরে মন্তব্যটি হয়তো তিনি পুনর্বিবেচনা করে থাকবেন। তবে অপেক্ষাকৃত পরে, ১৯৮৮ সালে, তিনি ‘ফুলবাসউদ্দীন ও নসরুদ্দীনের পদাবলী’ সংকলনের মুখবন্ধে যে মতামত দিয়েছেন তা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। বলেছেন,
‘Materialism spiritualism’-এর দ্বন্দ্বে যখন দুনিয়ার মানুষের মন অস্থির ও অসুস্থ, যখন নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বিপর্যস্ত, যখন পৃথিবীর কল্যাণকামী চিত্ত অবক্ষয়ের নিরূপ যন্ত্রণায় কাতর, মানসদ্বন্দ্বে বিক্ষত মানুষ যখন স্বস্তির নিদান লাভের আগ্রহে উন্মুখ ও উৎকণ্ঠ, বিমূঢ় শিল্পীরা ও মনীষীরা যখন দিশাহারা, তখন এই অধ্যাত্মবাদনির্ভর নিশ্চিত মনের অবিচল প্রসন্ন-প্রশান্তি আমাদের ভাবিয়ে তুলবেই। বাউল গান আমাদের ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের জড় রয়েছে গভীরে, গতি হচ্ছে অনন্তে আর সম্ভাবনা আছে বিপুল। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে এ মরমীতত্ত্ব ও অধ্যাত্মবাদ আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর ইহজাগতিক সুস্থ ও স্বস্থ জীবনবিরোধী ও উপযোগবিহীন।
এ একেবারে আধুনিক মনের বিশ্লেষণ, তবে নিরপেক্ষভাবে এমন প্রশ্ন কি উঠবে না যে, যা সুস্থ ও স্বস্থ ইহজাগতিক জীবনবিরোধী ও উপযোগবিহীন, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন কোথায়? সেই প্রশ্ন, অনিবার্যভাবে, তবু ওঠে। কারণ আমাদের সাম্প্রতিক মধ্যবিত্তমন বাউল গান শ্রবণ ও চর্চায় খুব উৎসাহী। সত্যিকথা বলতে কি এই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রোতা ও ভোক্তাদের খুশি করবার জন্যই বাউল তার সাজসজ্জাকে জাঁকালো করেছে, গানের পরিবেশনে এনেছে পারফরমারের মঞ্চদাপানো গিমিক ও ভাবভঙ্গি, যন্ত্রানুষঙ্গে ঘটিয়েছে অতিরেক। যে যুবকটি বর্ধমান বা নদিয়ার গ্রামে চাষবাস করে কিংবা ঘরামির বৃত্তিধারী, সে সন্ধ্যাবেলায় বাউলের আসরে যেন বিদূষক— বিনোদন করাই তখন তার ধর্ম। হালফিল বাউলের এই দ্বিচারিতা সমাজের একটা ব্যাধির মতো বেড়ে চলেছে। তাদের অনেকের জীবনে কোনও মগ্নতা বা প্রশান্তি নেই— বিমূঢ়তার আততি তার চোখে মুখে ছাপ ফেলে।
এই আততির কারণ দু’রকম। প্রথমত, বাউল এতদিন অভ্যস্ত ছিল গ্রামীণ জনপদ ও সেই জনমণ্ডলীকে গান শোনাতে, তাতে কোনও বিরোধ ছিল না কারণ সে-গান তো সেই জীবনেরই ফসল। গানের বক্তব্য, প্রতীক, বর্ণনা এমনকী সুরের একঘেয়েমি তাদের মেনে-নেওয়া। এখন নগরায়ণের তুমুল কলরোলের মধ্যে বাউলকে হতে হচ্ছে নাগরিক গায়ক, বুঝতে হচ্ছে নাগরিক মানুষের সদা পরিবর্তনশীল হালকা পলকা রুচিবোধ। এটাই দ্বিতীয় সমস্যা। যেহেতু গ্রামীণ রুচি ও প্রত্যাশার কাঠামো অনেকটা অনড় তাই সেখানে বাউল গায়ক স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল কিন্তু নগরের মঞ্চে সে আড়ষ্ট বেপথু। কী যে সে গাইবে, কতটা রংবাজি তাতে দরকার তার নির্ধারক এক অশিক্ষিত শ্রোতার দল— যারা কোনও গূঢ় গভীর ভাবের গান শুনতে আসেনি, দেখতে এসেছে একটা গানের ধরন, যা গড়নে ‘ফোকো-মডার্ন’। তাদের কারুর কারুর আত্মাভিমান এইরকম যে এই গানের সমাদর বা পরিপোষণ মানে একরকম শিকড়ের সন্ধান ও ঐতিহ্যের পরিচর্যা। বাংলাদেশের গবেষক আহমদ মিনহাজ ভেবেছেন, সমকালের রাজনীতির ঘূর্ণি, মূল্যব্যবস্থার ব্যাপক ওঠানামা, আকাশ-সংস্কৃতির প্রসার-প্রতিষ্ঠা, নীতি-আদর্শের ক্রমস্খলন, সাম্যের পতন, ভক্তির প্রাবল্য ও নাস্তিকের ঔদ্ধত্য, তারও চেয়ে ভয়াবহ ব্যাধি, মধ্যবিত্তের অপরচুনিস্ট হওয়ার Self centered হওয়ার অসুস্থ মানসিকতা থেকে একদল বিবেকী ও সংবেদি মানুষ নিষ্ক্রান্ত হতে চাইছেন। কোনও বাঁধা ছকে তাঁদের আর আঁটছে না, তাঁরা কিছুটা ভাবুক বা স্বপ্নবাদী হতে চান, ইতিহাসকে দেখতে চান জীবনের দর্পণে। মিনহাজের ভাষায়:
