বেশির ভাগ বাউলই নিজেকে বৈষ্ণব বলে পরিচয় দেন এ আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আসলে ‘রূপ’— ‘রাগ’ হয়ে বাউল পৌঁছায় ‘ভাবে’। বাউলের বিভিন্ন শুদ্ধ আচরণগুলিই তাকে ক্রমশ বৈষ্ণব করে তোলে।
বাউলের শুদ্ধ আচরণ? শুনেই মনে পড়ল ১৮৯৬ সালে পণ্ডিত যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘Hindu Castes and Sects’ বইতে মন্তব্য করেছিলেন:
The Bauls are low class men, and make it a point to appear as dirty as possible… Aristrocratic Brahminism can only punish them by keeping them excluded from the pale of humanity.
কিন্তু এ মন্তব্য তো উনিশ শতকের শেষ দশকের একজন নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণের। আধুনিক কালের ব্রাহ্মণ যুবা আদিত্য মুখোপাধ্যায় মনে করছেন অন্য কথা। তিনি বলছেন:
বিষয়টি গুলিয়ে যাবার মতোই। প্রায় প্রত্যেক সাধু-বাউলের কাছে শুনেছি, তাঁরা বৈষ্ণব বাউল। ‘বাউল বোষ্টম’ কথাটিও এতই প্রচলিত যে এদের ভিন্নত্ব ধরা পড়ে না। আবার বাউলের সাধন সঙ্গিনীকে সব সময়েই ‘বোষ্টমী’ বা ‘বৈষ্ণবী’-ই বলা হয়।
এ যেমন সত্যি তেমনি এটাও ঘটনা যে ‘আউল বাউল’ বলে একটা কথা চালু আছে, ‘বাউল-ফকির’ কথাটাও খুব সচল। লালন কী ছিলেন— বাউল না ফকির?
উনিশ শতকে বাউল আর ফকিরদের বহুক্ষেত্রে সমার্থক বলে মনে করেছেন অনেকে, অন্তত সেকালের পণ্ডিত ও গবেষকরা। তাঁরা কেউই অবশ্য এই দীনহীন সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রসন্ন ছিলেন না। তার কারণ তাঁদের উচ্চবর্ণের অহমিকা একদিকে, আরেকদিকে নিম্নবর্গের এই কায়াসাধকদের গোপন ও গুহ্য আচরণবাদ। কেবল বাউল বা ফকিরিতন্ত্র নয়, জাতবৈষ্ণব-কর্তাভজা-সহজিয়া স্রোত, এমন সমস্ত ধারা যা গৌণধর্মীদের আশ্রয় ও আশ্বাস দিয়েছিল তা তাঁদের মনঃপূত হয়নি। সনাতন ভাবনাচিন্তা বা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আচরিত ধর্মের বাইরে যারা যায় তাদের খ্যাতিবিত্ত জোটার তো কথা নয়। তাদের জোটে নিন্দা ও বিদ্রূপ। তারা হয়ে ওঠে উচ্চশ্রেণির পক্ষে সন্দেহজনক আর শত্রুবিশেষ। তাই তাদের দমন-পীড়ন-ধ্বংস সাধন হয়ে ওঠে আশু কর্তব্য। ব্যাপারটি একপক্ষীয়— কারণ শাস্ত্র-মন্দির-মন্ত্র-মসজিদ-পুরোহিত-মোল্লা সেইদিকে। তারা নগরবাসী, ও শিক্ষিত, মসীজীবী লেখকরাও তাদের পক্ষে। পত্রপত্রিকা, ধর্মপ্রতিষ্ঠান ও মুদ্রণযন্ত্র তাদের সহায়। অন্যপক্ষে গ্রামে-বাস করা বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত বাউল ফকিরদের অস্ত্র বলতে কণ্ঠের গান আর অন্তরের তীব্র বিশ্বাস। সেই জায়গাটায় অবশ্য তাদের খুব জোর। কোনও অনুমানাত্মক কিছুকে তারা মানে না। তাদের মতে শাস্ত্ৰ-পুরাণ-দেবমূর্তি-মন্ত্র-তীর্থ-উপবাস এসব আসলে ‘অনুমান’। সত্য হচ্ছে ‘বর্তমান’, এই নরনারীর দেহ ও দেহধর্ম, এই ইহজগৎ আর কামনাবাসনা, স্বপ্ন ও মুক্তিপিপাসা। এর পরতে পরতে রয়েছে রহস্য ও মরমিয়া বিশ্ব। খোদা বা ঈশ্বর আছেন মানব জীবনের শরিক হয়ে, তাই মানুষ ধরে সাধনা করতে হবে। তাদের গানে বলা হচ্ছে:
মানুষ হয়ে মানুষ জানো
মানুষ হয়ে মানুষ চেনো
মানুষ হয়ে মানুষ মানো
মানুষ রতনধন।
করো সেই মানুষের অন্বেষণ॥
এই মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয়ে যায় মনের মধ্যে, সে কেন অন্য তত্ত্ব মানবে? সে কেন গ্রস্ত হবে সাবেক স্বর্গ-নরক ধারণায়? তাই তার প্রতিপ্রশ্ন:
আল্লার বাড়ি যদি মাটির দুনিয়া হয়
তবে মানুষ মরে কোন্ বেহেস্তে যায়?
বেহেস্ত বা স্বর্গপ্রাপ্তি যদি কাঙ্ক্ষণীয় না হয় তবে এসব লৌকিক সাধকদের একমুখী লক্ষ্য মানুষের মুক্তি। সে মুক্তি মানে মোক্ষপদ প্রাপ্তি নয়— অজ্ঞানতা, কুসংস্কার থেকে মুক্তি। মাটির ঢিপি ও কাঠের মূর্তি পুজো, অপদেবতা বা উপদেবতায় বিশ্বাস, দরগাতলায় হত্যে দেওয়া বা কবচতাবিজ ধারণ সবেরই বিরুদ্ধাচরণ করা এদের ব্রত। বিচারশীল আর তর্কপ্রবণ বাউলফকিররা বহুলাংশেই গুরুবাদী, কারণ গুরুই কায়াসাধনার পথ ও পদ্ধতি বাতলে দেন। কিন্তু এমন যে অত্যাজ্য গুরু, তাঁকেও অভ্রান্ত না ভেবে বলা হয়েছে:
যাহা দেখিনি নিজ নয়নে
বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে।
এত যুক্তিতর্কবিচার সংকুল পন্থা গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের কাছে সমাদৃত হবার কথা নয়। কিন্তু মনের মানুষের সন্ধানে নিরত এমন গভীর নির্জন পথ নিঃসঙ্গ সাধকের প্রাণের প্রদীপে আলোকিত। সে নির্ভয় ও ধর্মনির্লিপ্ত— স্রোতের বিরুদ্ধে তার অবগাহন। প্রয়োজনে সে প্রতিবাদী, কিন্তু তার আয়ুধ লাঠি নয়, একতারা। তার বিশ্বাস, ‘এই মানুষে সেই মানুষ আছে।’
কিন্তু বিশ্বাসের এত বলিষ্ঠ অবিচল পথের পদাতিকদের সংখ্যাবৃদ্ধি তো সনাতনবাদীদের পক্ষে স্বস্তির হতে পারে না। তাই তাঁদের প্রশ্ন:
কী জন্য প্রবীণ মতে বিরত হইয়া।
অভিনব মতে রত কী সুখ দেখিয়া॥
স্বর্গের সোপান কি এ মতে গাঁথা আছে।
দড়বড়ি চলি যাবে শ্রীহরির কাছে॥
না জানি কী লাগি সবে ভ্রান্ত হায় মতি।
নবপথে পদার্পণ কেন এ দুর্মতি॥
দ্বন্দ্ব এটাই অর্থাৎ প্রবীণ মত আর নতুন মত। ‘পাষণ্ডীদলন’-এর লেখক রামলাল শর্মা তাঁর নিরীহ পয়ারে যে প্রশ্ন তুলেছেন তা তার একার নয়। অক্ষয়কুমার দত্ত, যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, রেয়াজউদ্দিন আহমদ, দাশরথি রায় এমনকী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসেরও এই এক প্রশ্ন। পুরনো পথ ছেড়ে অভিনব এই পথে কেন? কীসের জন্য? এ পথে কি স্বর্গ বা শ্রীহরির পাদপদ্মপ্রাপ্তি দ্রুততর হবে? মুশকিল যে স্বর্গ বা হরি কোনওটাই এদের অন্বিষ্ট নয়। এদের লক্ষ্য মানব, মানবসত্য।
