কিন্তু ফকিরদের কথা আমরা এখনও বিস্তারে জানতে চাইনি। তাঁরা তো স্বভাবকুণ্ঠ এবং সংখ্যালঘু। দীন ভিখারির মতো দরিদ্র জীবনযাপনের ব্রত নিয়েছেন স্বেচ্ছায়। কিন্তু তাঁদের নীরবতাও অনেকটা বাঙ্ময়। এখানে দু’জন ফকিরের আত্মবিবৃতি প্রকাশ করা হচ্ছে তাঁদের মুখের জবানিতে। সেই সঙ্গে থাকছে আমার মন্তব্য বা টিপ্পনী।
গোলাম শাহ-র কথা—১
আমার নাম গোলাম শাহ। পিতার নাম জানেব শাহ। মাতা রফিয়া। যেখানে থাকি সেই পাড়াটার নাম ঘুড়িষা-ইসাপুর। ফকিরপাড়াও বলে। ইসাপুর-ফকিরপাড়া। বাংলা ১৩৫০ সনে ভাদ্রমাসে আমার জন্ম। এখানে প্রায় কুড়ি বছর বাস করছি। আগে লাভপুর থানার শাসপুরে থাকতাম। আমার ওটা জন্মস্থান। চারপুরুষ ওখানে আমাদের বাস। বিয়ে হবার পর থেকে আমি এখানে বাস করছি। এখানে আমার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়ি বলেই ঘুড়িষায় বাস করছি— এ ছাড়া অন্য কোনও কারণ নাই। আমাদের শাহ বংশ— বংশ পরম্পরায় ফকির। আমি বংশগত ফকির নিজের ইচ্ছাতেই ফকিরি পথে এসেছি। ফকির মহম্মদ শাহকে (কেষ্টপুর, বর্ধমান) গুরু ধরে উনার কাছ থেকে কিছু তত্ত্ব জ্ঞান নিয়েছি। তখন আমার বয়স চোদ্দো-পনেরো বছর। তখন থেকে আমি গানবাজনা করছি। বাচ্চা বয়সে বারো বছর বাংলাদেশে কেটেছে। বাংলাদেশে খয়রা গ্রামে আমার মামার বাড়ি। যখন থেকে ফকির হলাম—তখন থেকেই ফকিরিটাই আমরা সাধনা। এ ছাড়া আমি আর কিছু করি না। গান-বাজনা করি—প্রতিমাসে আমার কুড়ি থেকে পঁচিশটা প্রোগ্রাম হয়। প্রায় জেলাতেই প্রোগ্রাম করি।
আমার মন্তব্য
গোলাম শাহ ফকির এখন বছর সাতান্নর একজন মানুষ। শরীর স্বাস্থ্য মজবুত, নইলে বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে মাসে কুড়ি পঁচিশটা অনুষ্ঠান করা সম্ভব হত না। জন্মসূত্রে ফকির তিনি এবং বাঙালি। চারপুরুষের হিসেব ধরলে শ’ দেড়েক বছরের উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হয়। বর্ধমানে গিয়ে ফকিরি মতে দীক্ষা নিয়েছেন, কিছু তত্ত্বজ্ঞানও অর্জন করেছেন কমবয়সে কিন্তু সাধক ফকির নন— প্রধানত গায়ক। সেটাই জীবিকা। চোদ্দো-পনেরো বছর থেকে স্বেচ্ছায় এ পথে রয়েছেন। ঠিক অনিকেত মানুষ নন। বাস্তুবাড়ি-মামার বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি ঘিরে বেশ তৃপ্ত মানুষ।
গোলাম শাহ-র কথা—২
আমার তিন ছেলে, চার মেয়ে। দুই ছেলে গান করে, অন্যরা ঘরেই থাকে। ছেলে তিনটি বড়। বাকিরা ছোট। আমার স্ত্রীও বায়েদ। মহম্মদ শাহের ছেলে সাদব শাহের কাছে বায়েদ হয়েছেন। আমার ছেলেরাও সাদব শাহের কাছে বায়েদ হয়েছে। আমার স্ত্রী আমার সাধনসঙ্গিনী।
আমাদের বিয়েতে ফকিরের ঘর থেকে মেয়ে আনতে হবে, মেয়েও দিতে হবে ফকিরের ঘরে। এখন অবশ্য অন্য ঘরেও বিয়ে হচ্ছে। কিন্তু হওয়াটা ঠিক নয়। আমাদের মধ্যে এখনও এমন হয়নি।
আমার বিয়ে দুটি। দুই স্ত্রীই এখানে থাকেন। পরিবার-পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ— এগুলো আমাদের নাই। আমরা মেনেও চলি না। ওই পরিবার পরিকল্পনা— এটা গুরুর কাছে আছে। ওই জিনিস যদি গুরুর কাছে জানা যায়— তা হলে আপনা-আপনি বন্ধ করে দেওয়া যায়। গুরুর কাছে চাইলে তিনি এটা কর্মের মাধ্যমে দেবেন।
আমার মন্তব্য
ফকিরদের পরিবার বেশির ভাগ অতিপ্রজ, এটাই দেখেছি। তাঁদের সীমাহীন দারিদ্র-দুর্গতির সেটাই কারণ। কিন্তু সেজন্যে তাঁদের খুব একটা গ্লানি বা দুঃখ দেখিনি। গোলাম শাহ-র স্ত্রীও ফকিরিতন্ত্রে মন্ত্র দীক্ষা ও ক্রিয়াকরণের অংশী। দুই সন্তানেরও ফকিরি দীক্ষা হয়েছে। কায়াসাধনে গোলাম ফকির দাম্পত্য বৃত্তের মধ্যে সুখী। হয়তো বীরভূমে ফকিরদের সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের বিয়ে শাদি তাঁর দেখার অভিজ্ঞতা নেই। অন্য জেলাতেও এমন বিয়ে ভালই চালু আছে। তবে নদে-মুর্শিদাবাদের অনেক ফকির বেশ ভাল গৃহস্থ, জমিজিরেত আছে। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণে এখন সচেতনতা আমি লক্ষ করেছি। গোলাম শাহর গুরুনির্ভরতা খুব বেশি। অন্যত্র এতটা দেখিনি।
গোলাম শাহ-র কথা—৩
আমি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছি। তারপর আর পড়াশোনা করিনি— গান-বাজনাতে গেলাম। …ছেলেমেয়েরা পড়ে—তারা ইস্কুলে যাচ্ছে। এই বর্তমান পড়াশোনা, এই সমাজব্যবস্থা— এ তো মানতেই হবে। এই পড়াশোনা ভাল—খারাপ বলা যায় না। এই শিক্ষা বহিরঙ্গ, যেটা পির-মুর্শিদের শিক্ষা—সেটা অন্তরঙ্গ।
সম্পত্তি আমার কিছুই ছিল না— এখনও কিছুই নাই। ভিটে নাই, জমিজমাও নাই। আমার গানটাই হল আসল। গান থেকেই আমার আয়।
সরকারি সাহায্য আমি কিছু পাইনি। তবে যখন সরকারি প্রোগ্রাম করি তখন আমাকে টাকাপয়সা দেয়। সরকারের কাছ থেকে বছরে তিন-চারটে ডাক পাই। তখন টাকা-পয়সা ভালই পাই। এ বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কোনও ক্ষোভ নাই।
আমার মন্তব্য
বাউল ফকিরদের লেখাপড়ার দিকটি সারা বাংলাতেই বেশ দুর্বল। তবে লক্ষ করেছি সকলেই প্রায় সাক্ষর। গোলাম শাহ লেখাপড়াকে বহিরঙ্গ ভেবে মুর্শিদের শিক্ষাধারাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেটি তাঁর পক্ষে সংগত। জমিজমা নেই তার জন্যে খেদও নেই। যথার্থ ফকিরি দৃষ্টিকোণ এটা। সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পান অর্থ পান, তাতেই তুষ্ট। ফকিররা স্বভাবত স্বল্পে তুষ্ট।
গোলাম শাহ-র কথা—৪
আমার জীবিকা বলতে গান। আমি মাধুকরী করি না। আমার জীবনের প্রথম শেখা গান লালন শাহ ফকিরের গান। লালন শাহ ফকিরের গান শিখি একজন বাংলাদেশের লোকের কাছে। তার নাম হারেম শাহ। তারপর মহম্মদ শাহের কাছে দীক্ষা নিই— মহম্মদ শাহের কাছে কিছু গান শিখি। তারপর আমি বিভিন্ন গান শিখেছি। বিভিন্ন গান গাই। মানুষ-তত্ত্বের গান গাইতে আমার ভাল লাগে। আমার সবচেয়ে প্রিয় গান, যেটা বারবার গাইতে ইচ্ছে করে, সেটা হল—
