মানুষ মানুষ বলে সবে মানুষ বড় মানুষ তবে
মনের মানুষ আছে খামুস হৃদয় মাঝে গোপনভাবে।
যন্ত্র বলতে— গানের সঙ্গে আমার নাল বাজে, বেহালা বাজে। ডুবকি খঞ্জনি বাজে। চিমটেও ব্যবহার করি। জীবনে প্রথমে ছিল দোতারা। যন্ত্রসংগীতে আমার একজন ওস্তাদ ছিলেন—তিনি আমাকে বেহালা বাজাতে শিখিয়েছিলেন। তার নাম মহম্মদ শাহ। শাসপুরের কাছে মীরবান গ্রামে বাড়ি।
আমার মন্তব্য
গোলাম শাহ প্রধানত গায়ক। সে বিষয়ে তাঁর অনুরাগ ও অনুশীলন প্রগাঢ়। লক্ষণীয় যে লালনগীতি তিনি বাংলাদেশ-সূত্রে শিখেছেন, কারণ আঞ্চলিকভাবে বীরভূমে ওই গানের বেশি চল নেই। এটাও দেখবার যে, গোলাম ফকির নিজে ফকিরিপন্থায় থাকলেও শুধু ফকিরি গান করেন না। অন্য গানও করেন— এন্টারটেনার। তাঁর প্রিয় গানটি বিশুদ্ধ ফকিরি গান নয়। ফকিরি গানের অনুষঙ্গে যেসব যন্ত্রবাদ্যের কথা তিনি বলেছেন তার মধ্যে নাল ও চিমটে ব্যবহার খুব টিপিকাল—ফকিরদের পক্ষে। তবে গোলাম শাহ ও তাঁর সন্তানদের গানের সঙ্গে বেহালাবাদন একটা ঘরানার মতো। গানের ব্যাপারে তিনি খুব সতর্ক ও সচেতন, যন্ত্র শিখেছেন ভালভাবে। তাঁর গানের গুরু ও ধর্মগুরু একজন, যন্ত্রবাদ্যের গুরু আরেকজন।
গোলাম শাহ-র কথা—৫
ফকির-বাউলরা মাথায় চুল রাখেন— এঁরা চুলটা কোনওমতে কাটতে চান না। আমি চুল কেটে ছোট করে দিই। তেল-টেলের বহুরকম অসুবিধা হয়—তাই কেটে দিই। কিন্তু কাটাটা নিয়ম নয়— রাখাটাই নিয়ম। চুল রাখাটা ধর্মের অঙ্গ বলা যায় না। কারণ ধর্ম জিনিসটা আলাদা। ধর্ম চুলে দাড়িতে টুপিতে নাই। লোকে জানে—ফকির বাউল এরা উদাসী, এদের চুল-দাড়ি এসব থাকে। ফকির-বাউলেরা অত লক্ষ করেন না, চুল-দাড়ি বাড়ছে বাড়ুক— থাকছে থাকুক।
পোশাকের ব্যাপারে ফকিররা কেউ পরেন ধুতি-পাঞ্জাবি, কেউ লুঙ্গি, কেউ আবার বিভিন্নরকম কামিজ জামা শার্ট পরেন। পোশাকে রংও থাকে। মাথায় কেউ পাড় বাঁধে, কেউ আবার টুপিও লাগায়। আমি ধুতি পাঞ্জাবি পরি। খাওয়া-দাওয়া কন্ট্রোল হল আলাদা জিনিস— সেটা সাধক-মানুষ করতে পারেন। আমরা সামান্য মানুষ— আমি করতে পারব না।
ফকির-বাউলদের যে বিন্দু-সাধনা আছে—সে সাধনা আমার নাই। সে সাধনা করতে হলে গুরুর কাছে জানতে হবে সেই কর্মটা জানলে পরে তবে করা যাবে।
আমার মন্তব্য
গোলাম শাহ উদারপন্থী বিবেচক মানুষ। ধর্ম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা আছে বলে গোঁড়ামি নেই। সর্বকেশ রক্ষা ব্যাপারটি প্রথাহিসাবে মানতে রাজি নন। ‘ধর্ম চুল দাড়িতে টুপিতে নাই’ চমৎকার উপলব্ধি। বাস্তববাদী মানুষ, তেল টেলের খরচ বেশি, তাই চুল কাটেন। জাঁকালো পোশাক না পরে স্রেফ ধুতি পাঞ্জাবি। খেতে ভালবাসেন। সাধক তো নন, অতএব তাতে নিয়ন্ত্রণের দায় নেই। বিন্দু-সাধনার দীক্ষা নেননি—সম্ভবত আগ্রহও নেই। মানুষটি অকপট।
গোলাম শাহ-র কথা—৬
ফকিরি সাধনার গুরুত্ব কথা হল—তারা আল্লাকে পাওয়ার জন্য সাধনা করে। একমাত্র আল্লা-ওলীর পথটাকে তারা ধরে রাখে। এই সাধনায় দমের কাজ আছে, দমের নামাজ আছে, দমের জিকির আছে। আমার সাধনায় দমের জিকির আছে। জিকিরটা সবসময় হবে না। আসনে বসে সেটা করতে হবে।
ফকিরি সাধনার মূল তত্ত্ব হল— ঈশ্বরপ্রাপ্তি আর মানুষকে ভালবাসা। এ ছাড়া আর কিছু সাধনা নাই। মানুষকে ভালবাসতে হবে আর ঈশ্বরের জপতপ, আল্লার জপতপ করতে হবে। এজন্য কিছু ক্রিয়াকরণ আছে। যেমন—এবম্, গাম, গিল— এগুলো চিনতে হবে গুরুর কাছে। তারপর মুশাহারা, মুরাকাবা— এসব গুরু দেখিয়ে দেবে। তখন আসন করে ওই মূল তত্ত্বটাকে কায়েম করতে হবে। এগুলো সব দমের কাজ— দম ছাড়া তো হবে না। আসনের মাধ্যমে দমের কাজ হবে, তার মাধ্যমে জিকির। আইনাল জিকির, হককেল জিকির, এলমি জিকির— এমন বিভিন্ন জিকিরের নাম আছে।
আমাদের ফকিরি মতে মানুষ যেরূপ সেইরূপে ঈশ্বরকে দেখতে পাওয়া যায়। মানুষের রূপে। ঈশ্বরকে কেউ বলছে নিরাকার, আবার কেউ বলছে আকার। ফকিররা বলছে— আকার। আকার না থাকলে তো জীব সৃষ্টি হত না। গাছের সঙ্গে গাছই গেছে, মানুষের সঙ্গে মানুষ গেছে, পানির সঙ্গে পানি। এই ঈশ্বর, যাকে আল্লা বলছি— তিনি সমস্ত বিশ্বের মধ্যে মিশে আছেন।
ফকিররা মানুষের ভজন-সাধনটা বেশি করে— কেননা মানুষ হল মূল্যবান জিনিস। মানুষের কাছে সব কিছু আছে। কেউ যদি ঈশ্বরকে পায় তো মানুষই পাবে। তাই নিজেকে চিনলে আল্লাকে চেনা যাবে— নিজেকে না-চিনলে মক্কা মদিনা কাশী বৃন্দাবন গয়া করলে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না।…তাই মানুষের সন্ধান হলে পরে আল্লার সন্ধান পাওয়া যায়— আর নিত্য নিজের মধ্যে আল্লাকে পাওয়া যায়। এর জন্য মুর্শিদ ধরতে হবে—মুর্শিদ ছাড়া হবে না।
আমার মন্তব্য
গোলাম শাহ ফকিরিতত্ত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন এবং তিনি আচরণবাদী। সেই আচরণ আয়ত্ত করেছেন মুর্শিদ ধরে। তার ক্রিয়াকরণকে বলেছেন দমের জিকির— অর্থাৎ শ্বাসনিয়ন্ত্রণের এক বিশেষ পদ্ধতির সাহায্যে ঈশ্বরের ধ্যান। সে সম্পর্কে তাঁর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দুটি জ্ঞানই আছে। তিনি ভাববাদী নন— সাকার আল্লার রূপ বিষয়ে সচেতন ও বিশ্বাসী। ‘আকার না থাকলে জীবসৃষ্টি হত না’ এমন মন্তব্য সচরাচর শোনা যায় না। তবে আল্লাকে পেতে হবে মানুষের রূপে এটা ফকিরদের সার কথা। তীর্থ করলে আল্লা মেলে না, তাঁকে পেতে হবে মানুষের মধ্যে এ ধরনের কথা প্রচুর শোনা যায়— গোলাম তা আরও একবার আউড়েছেন মাত্র। সাধক হিসাবে তাঁর ভাবনার তেমন কোনও মৌলিকতা চোখে পড়ে না।
গোলাম শাহ-র কথা—৭
মানুষ কোনটা? হাত-পা-চোখ-নাক কান থাকলেই কি মানুষ? আমরা কি মানুষ? না। মানুষ আলাদা। মানুষের কর্মক্ষেত্রে মানুষকে চেনা যায়। ইসলাম শাস্ত্রে বলে— বিবেক-বুদ্ধি-বিচার, এই তিনটে যে অন্তরে রাখতে পারে সে মানুষ।
