উত্তর: ফকিরি তো আলাদা সাধনা। আলাদা সাধনা বলে আনুষ্ঠানিক স্তরে কিছু পার্থক্য আছেই। ওটা মুসলমানদের। ফকিরি গান অবশ্য দু’রকমের আছে। মূলত সুফিবাদসম্পন্ন ফকিরি, কারণ ইসলামের মরমিতত্ত্ব তো প্রকাশ করেছেন সুফিরাই। আর সব মারিফতিই হল মুর্শিদা, কিন্তু সব মুর্শিদাই মারিফতি নয়। কারণ মুর্শিদকে স্মরণে রেখে যে গান হচ্ছে তাই মুর্শিদা। আবার মারিফত হল একজনের মাধ্যমে বা নির্দেশে যেতে হয়। যেহেতু সাধনাটিতে গোপনতা আছে। তাই তত্ত্বাদি আয়ত্ত করতে মুর্শিদই হল অবলম্বন।
প্রশ্ন: আচ্ছা, এ সব গানে সুরের পার্থক্য কেমন?
উত্তর: তত্ত্বমূলক গানে কোনও সুরের পার্থক্য নেই— যে-কোনও সুরেই গাওয়া যায়। পূর্ববাংলায় দশ রকম সুরে গাওয়া হয়। যেহেতু একটা শৈলী আছে তার বাইরে ওরা যেতে পারে না। যেমন এপার বাংলা ওপার বাংলা দু’দেশেই চলে— ‘আমি কোথায় পাব তারে’… সেই সুরে…শুনুন—
চিননি মন তারে তুমি চিননি মন তারে
যেজন তোমার দিল্পিঞ্জরে দিবানিশি বিরাজ করে।
যখন আল্লা পরওয়ারে সৃষ্টি করলেন আদমরে
আব আতস বাতাস দিয়ে খাক্-এ মিলন করে।
হুকুম করলেন তবে রুহু যাও কল্পপুরে
তখন আন্ধারিয়া ঘর দেখিয়া কাঁদছে রুহু কাতর স্বরে।
প্রশ্ন: আশ্চর্য তো! এ সুর কোথায় পেয়েছেন?
উত্তর: আমাদের সিলেটে।
প্রশ্ন: এখনও প্রচলিত?
উত্তর: এখনও প্রচলিত। আসলে এমন কিছু সুর আছে যা দুই বাংলাতেই চলে। যেমন প্রভাতী পর্যায়ের গান পূর্ব বাংলায় ভাটিয়ালি শৈলী থেকে অন্য দিকে চলে গেছে। ধরা যাক, ‘বৃন্দাবনবিলাসিনী রাই আমাদের’— এটা এ বাংলার। হয়তো নবদ্বীপ বা কৃষ্ণনগর থেকে বা বটতলা প্রকাশনীর কারণে ওই বাংলায় যেতে পেরেছে। কিছু লোক শুনে গিয়ে বৈষ্ণব ভাবকে প্রচার করেছে। লোকের মুখে বা গায়কের মুখে প্রচারের মোটিভের ফলেও গিয়ে থাকতে পারে। গানের তো হাত-পা নেই। তবু বিচরণশীল— oral transmission-ই রাস্তা। যেমন ধরুন শুকসারি দ্বন্দ্বের গান—
শুকসারি বলে উঠলো কিশোরী
যামিনী অবসান।
কোকিলায় ঘন ঘন কুহুরবে মধুকরে
মধু করে পান।
রতি রস রঙ্গে রসরাজ সঙ্গে
নিশি পোহাইল প্রেম তরঙ্গে
এই তো সমাধান—
ঘরে গুরুকুল জাগিল সকল
মাধব কর পয়ান।
ব্যাপারটা ভাবতে গেলে মনে হয়, পূর্ববাংলায় প্রভাতী গান একটু বাঁক নিয়েছে। এই concept রবীন্দ্রনাথে এসেছে ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না / বেলা হল মরি লাজে’— বৈষ্ণবপদের প্রতিফলনে উন্নত সংস্কৃতির স্বাক্ষর বলা যায়।
প্রশ্ন: বেশ। এবারে জানতে চাই মুর্শিদা গানটা কেমন?
উত্তর: মুর্শিদকে উদ্দেশ্য করে গান। অনেক রকম গান আছে এ জাতীয়। চট্টগ্রামে মাইজভাণ্ডারী বলে একটা জায়গা আছে। সুফি সাধকরা চট্টগ্রামের পথেই তো এসেছেন। এঁরা খুবই উন্নত মানের সাধক। তাই পারসিক সুরের সঙ্গে স্থানীয় সুরের মিশ্রণ ঘটা বিচিত্র নয়। যেমন,
মাইজভাণ্ডারের ভাবের রসিক
বেশ সুখে আছে—
সোনার ময়ূর মুর্শিদ বাবা
তাল ফেলে নাচে॥
ভাব ধরাইল কোন্ ভাবিনী
না জানি কেমন কামিনী
নাম ধরিলে মাণিক জ্বলে
হৃদি মন্দিরের নীচে॥
প্রশ্ন: ‘আমায় ডুবাইলি রে ভাসাইলি রে’ গানটার সঙ্গে ক্ষীণ মিল আছে নাকি, সুরে?
উত্তর: না না। দ্রুত ছন্দ বলে তালের মিল আছে— চতুর্মাত্রিক: কাহার্বা। তাল: মধ্য লয়।
যেমন—
আটকুঠুরি নয় দরজা কোন্খানে নাই তালা
ঘর খানি হয় তিনতালা—
ঘরের নয় দরজায় নয় জন দ্বারী সদাই তারা ঘুরিফিরি।
ছয় ডাকাতে জানলে পরে
তখন করবে চুরি।
ঘরের মণিকোঠায় দিয়া চাবি
ও তুই মনের সুখে নিদ্রা যাবি—
সেই ডাকাতের ভয় রবে না
সুখে থাকবি মন কালা।
প্রশ্ন: এই গানটা কি ঢাকা থেকে পাওয়া?
উত্তর: হ্যাঁ— আবদুল লতিফের রচনা। তিনি বিখ্যাত লোককবিরূপে পরিচিত।
প্রশ্ন: বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল গানে বিভিন্ন সুর হয়েছে—এর কারণ কী?
উত্তর: ভৌগোলিক পার্থক্যের জন্যে। পরম্পরা একটা তৈরি হয়ে যায়— তারপর একটু-আধটু মডিফিকেশন হয়, তবে মূল সুর একই থাকে।
প্রশ্ন: ফিকিরচাঁদের গানের ধাঁচা কেমন?
উত্তর: হ্যাঁ, খুব বেসিক সুর— বাউল গানে ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করেছেন উনি। যেমন ধরুন ফিকিরচাঁদি গান:
বসায়ে রসের মেলা সখের খেলা
দিন দুইচার খেললে ভালো
মেলাতে দেখে চোখে ম্যালা লোকে
কেবা কী উপদেশ পেলো॥
গানটি ঝাঁতি তালে নিবদ্ধ। পূর্ববাংলায় বলে ‘ছব্কি’। আট মাত্রা অথচ একটা করে মাত্রা ছেড়ে অফবিটে গাওয়ার জন্যে ত্রিমাত্রিক বলে ভুল হতে পারে। ঝাঁতি কীর্তনে ব্যবহৃত তাল। এঁরা এটিকে ছয় মাত্রাযুক্ত ত্রিমাত্রিক বলেন। বোল: ।-ধিতা কি। ধিৎ তা কি।*
______________
* দিনেন্দ্র চৌধুরী ২০০৮ সালে প্রয়াত হয়েছেন।
২.৭ পশ্চিমবঙ্গের বাউল, ফকির ও গায়কদের আর্থ-সামাজিক পরিচয়-সারণি
পশ্চিমবঙ্গের বাউল, ফকির ও গায়কদের আর্থ-সামাজিক পরিচয়-সারণি

২.৭ ফকিরদের সঙ্গে দ্বিরালাপ
বাউলদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা এতদিনে আমরা ইতস্তত কিছু কিছু লেখায় জানতে পারছি। বাউলরা তাঁদের জীবনের বলয় থেকে এখন অনেকটা বেরিয়ে আসছেন। রহস্যের ঘেরাটোপ কিংবা গুরুর নিষেধ ছিন্ন করার প্রবণতা তাঁদের এসেছে এই জন্য যে, প্রচারমাধ্যম তাঁদের আমজনতার মুখোমুখি করে দিচ্ছে। দেশে, বিশেষত বিদেশে তাঁদের গান গাইতে হচ্ছে, মেলা মচ্ছবে সাংবাদিক ও সংগীতানুরাগী ব্যক্তিরা তাঁদের বহুরকম প্রশ্ন করছেন। পত্র-পত্রিকায় তাঁদের ইন্টারভিউ এখন দুর্লভ নয়। তাঁদের নিজেদের গুহ্য সাধন কথা বাইরে বলা নিষিদ্ধ কিন্তু ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি অভিজ্ঞতা, গানের স্বীকৃতি, উপেক্ষা বা সমাদর, দারিদ্র্য ও অত্যাচারের বিবরণ দেওয়ার কোনও নিষেধ নেই। তাদের সম্পর্কে বেশ কিছু উলটোপালটা মন্তব্য নিন্দা কিংবা ভুল তথ্য তাঁদের বিচলিত করে। তাই কেউ কেউ আজকাল তাঁদের বক্তব্য জানাতে এগিয়ে আসছেন। সনাতন দাস বাউল তো দু’খানা চটি বই লিখে বসেছেন। পূর্ণদাসও বেশ মুখর ব্যক্তিত্ব। বহু ধরনের সমাবেশ হয় আজকাল, সেমিনার ধরনের, তাতে বাউলদের মঞ্চে ডাকা হয় নিজেদের সুখদুঃখ, হতাশা, বেদনা কিংবা অভাব অভিযোগ চাহিদার কথা জানাতে। তাঁরা সেসব ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন।