প্রথমে দিনেন্দ্র চৌধুরী একটা গানের মুখ শোনালেন:
মানুষ তারে চিনলা নে
নবরঙ্গ দেহের মাঝে বিরাজ করে কে…
প্রশ্ন: এটা কোন্ অঞ্চলের গান?
উত্তর: এটা পূর্ববঙ্গের সিলেট অঞ্চলের বৈষ্ণব-বাউল। সুর কিন্তু ভাটিয়ালি। সিলেট মানে বিরাট অঞ্চল। এদিককার রাঢ়ীয় আর নবদ্বীপী দু-রকম বৈষ্ণব ভাবাশ্রয়ী গান আছে— ওদিকে নবদ্বীপভাবাশ্রয়ী বাউল গেছে। ভাটিয়ালি সুরেই বাউল গাওয়া হয়।
প্রশ্ন: এদের সঙ্গে হাসন রজার গানের পার্থক্য কী?
উত্তর: হাসন রজা তো বৈরাগ্যমূলক গান গাইতেন। সুর নিজস্ব, কিন্তু ভাটিয়ালি সুর-শৈলীর বাইরে নয়—
যেমন—
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে / শুয়া বন্দী রইলা রে
কান্দে হাসন রাজার / মন ময়নায় রে।
ওঁর নাম ছিল হাসন রজা চৌধুরী। ওখানে স্থানীয়ভাবে সবাই হাসান রাজা বলে।
সম্ভ্রান্তবংশীয় মুসলমান জমিদার। রজার সঙ্গে রাজার যোগসূত্র নেই কিন্তু।
প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় বাংলার বাউল গানের কোনও নির্দিষ্ট সুর আছে?
উত্তর: না। তত্ত্বমূলক গানের কোনও নির্দিষ্ট সুর নেই। পুজোপার্বণের কিছু গান আছে যেগুলো পালটায় না। বছরের নির্দিষ্ট দিনে গাওয়া হয়— নিয়মিত চর্চা হয় না বলে মডিফিকেশন হয় না, চেঞ্জ হয় না। কিন্তু বাউল গানের সুরে ও ধাঁচে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেমন আজকাল লালন ফকিরের গান সুর দিয়ে আমরা গাইছি— মিসলিঙ্কড হয়ে গেছে তো। এতে কোনও অপরাধ আছে বলে মনে করি না। যদি যোগ্য লোক তাঁদের অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন— কুষ্টিয়া, রাজশাহী অঞ্চল বা মধ্যবঙ্গের ওই অঞ্চলের সুর সম্পর্কে যদি তাঁর দখল থাকে, তিনি যদি লালনের গানে সুর করেন— মেনে নেওয়া যাবে। এবং সেটা যদি কমিউনিকেট করে, সকলের মনের সঙ্গে তার বক্তব্যটা অর্থবহ হয়ে ওঠে— তা হলে করা যেতে পারে। আমরা যেমন কবীরের গান, মীরাবাঈয়ের গান সুর দিয়ে গাই—নইলে তো হারিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: পূর্ববঙ্গে ‘বাউলা’ গান বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পূর্ববঙ্গে অন্য সব তত্ত্বের সঙ্গে দেহতত্ত্বও থাকে। বাউলা মানে ছন্নছাড়া লোকেরাই এ গান গায় না। ত্রিনাথের আসরে সংসারী লোকেরাই গাইছে। বাউলা মানে বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্যমূলক গানের আসরকেই বাউলা বলা হয়ে থাকে। বাউল থেকে বাউলা নয়। বাউল বলে স্বতন্ত্র কোনও গান আছে কিনা জানা নেই।
প্রশ্ন: বেশ তো, একটা নমুনা দিন:
উত্তর: শুনুন, ত্রিনাথের গান—
ও গাঞ্জার চিরল চিরল পাত
গাঞ্জা খাইয়া মগ্ন হইয়া নাচে ভোলানাথ—
নাচে ভোলানাথ গো নাচে ভোলানাথ।
আনন্দ গগনে নাচে মগনে
ত্ৰিন্নাথ ত্ৰিন্নাথ বইলা মারো একটান
ও সিদ্ধি মারো একটান।
তিন কলকি সাজাইয়ে
শবিনা লাগাইয়া
টিক্কায় আগুন দিয়া মারো একটান।
প্রশ্ন: বাঃ। এ গানের সঙ্গে গম্ভীরা গানের তো বেশ মিল রয়েছে।
উত্তর: হ্যাঁ। শিব সম্পর্কে গান। কিন্তু ত্রিনাথ মানে ত্রিভুবনেশ্বর। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের রূপকল্প নয়।
প্রশ্ন: বাউলা সুরে দেহতত্ত্বের গান আছে?
উত্তর: দেহতত্ত্বের গান সব সুরেই আছে। বাউলা সুরে কোনও গানে নয়, বাউল সুরে আছে। দেহতত্ত্ব, মনঃশিক্ষা ও বাউলের সুরে বিশেষ প্রভেদ নেই। আঞ্চলিক সুরেই গাওয়া হয়ে থাকে সব গান।
প্রশ্ন: সে রকম একটা নমুনা যদি দেন—
উত্তর:ঘুমে রইলে কপালপোড়া
কামনদীতে ডুবল রে ভারা—
ও তুই দিন থাকিতে খুঁজলে পাবি
অন্ধকারে যাবি মারা।
গানটির পর্যায় হল ‘আখেরি চেতন’, সুরে তা ভাটিয়ালি।
প্রশ্ন: গানের যে বেসিক নোট— চার সুর ছয় সুর বলে, তার সম্পর্কে আপনার কী মত?
উত্তর: খুব প্রাচীন গানে স্বর কম লাগত। এখনকার গানে অনেক স্বর লেগে যাচ্ছে। লোকসংগীতের মধ্যেও বেসিক নোটই লাগে। একদম সোজাসুজি তো গায় না। সুতরাং কিছু কাজকর্ম এসেই যায়। সুরের বিষয়ে গ্রাম্য গায়কদের সচেতন প্রয়াস থাকে না। প্রচলিত ছকে ও নিজস্বতায় কিছুটা বিবর্তিত হয় মাত্র। যেহেতু ব্যাকরণ নেই।
প্রশ্ন: এ রকম সুরের গান একটা শোনান।
উত্তর: দেখুন, চারটি স্বর লেগেছে। এ হল সূর্যব্রত অনুষ্ঠানের ‘নৌকাবিলাস’ পর্যায়ের গান—
পার কইরা দেওরে মাঝি মথুরাতে যাই
মথুরাতে গিয়ে যদি কানাইর দেখা পাই।
মধ্য গাঙ্গে নিয়া কৃষ্ণ নাওয়ে দিল লাছা
চমকিল রাধার পরান ভাঙল নাওয়ের পাছা।
প্রশ্ন: একটু সরগম করে গান—
উত্তর: র, ম, প, ধ, — এই চারটি স্বরে তিন চরণে নিবদ্ধ গান এটা—
| ধ — ধ | ধ ম — |প –প | ম র —|
| পা র্ ক | রি য়া ০ | দে ও রে | মা ঝি o |
| র র ম | ম প — | ম — — | — — — |
| ম থু ০ | রা তে ০ | যা ০ ০ | ০ ০ ই |
| র ম — | র ম — | প ধ — | প ম — |
| ম থু ০ | রা তে ০ | গি য়া ০ | য দি ০ |
| ধ ধ —| ধ ধ — | প ধ — | প ম — |
| কা নাই র্ | দে খা ০ | পা ০ ০ | ০ ০ ই|
প্রশ্ন: এ গানের সুরের বেসিস কী?
উত্তর: এটা রাঢ়ীয় অঙ্গের। ঝুমুর, টুসু, ভাদুর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাউলের মিল নেই, মূলত ভৈরবী ঠাটে নিবদ্ধ।
প্রশ্ন: পূর্ণদাস বাউল তো এই সুরেই গান করেন তাই না?
উত্তর: হ্যাঁ, এরই একটু রকমফের আর কী। পূর্ণদাস বাউলের কণ্ঠে রাঢ়বঙ্গের বাউল মনোহারিত্বে অতুলনীয়। তাঁর প্রয়াসেই বাউল গান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত।
প্রশ্ন: ফকিরি গান তো অনেক শুনেছেন, তার সঙ্গে বাউল গানের পার্থক্য পেয়েছেন?
