কিন্তু সাংগীতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলার বাউল ও ফকিরদের সাধনাকে এখনও সঠিকভাবে দেখানো হয়নি। যাকে বলে গানের ভিতর দিয়ে দেখা বাউলভুবন তা এখনও আমাদের কাছে অনালোকিত। সবে বছর দশেক এ কাজ শুরু হয়েছে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান সংগ্রহ, সেই গান স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও স্বরলিপি করে রাখা, বাউল ফকিরি গানে সুর ও স্বরপ্রয়োগের স্বাতন্ত্র নিয়ে বিশ্লেষণ, একই গান কীভাবে একেক অঞ্চলে সুরে ও গায়নে ভিন্ন ধরন পেয়ে যায় তা লক্ষ করা— এ জাতীয় কর্মোদ্যোগের সূচনা ঘটেছে মাত্র। বাউল গানের সুরকাঠামোয় ঝুমুর, ভাওয়াইয়া, ভাঙা কীর্তন ও ভাটিয়ালির প্রভাব শনাক্ত করা হচ্ছে কিন্তু পাকাপাকি সাংগীতিক বিশ্লেষণের সমন্বিত ও অনুপুঙ্খ আয়োজন গড়ে ওঠেনি, প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যম, অর্থাভাব ও ক্ষেত্ৰকর্মীদের সমন্বয়ের অভাবে। এ ব্যাপারে একক প্রয়াসীরূপে উল্লেখযোগ্য প্রবীণ খালেদ চৌধুরী এবং তরুণতর কঙ্কন ভট্টাচার্যের নাম। যথাক্রমে কলকাতার ‘ফোক মিউজিক অ্যান্ড ফোকলোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ ও ‘পশ্চিমবঙ্গ সংগীত একাডেমি’-তে এই দুইজনের গানের সংগ্রহ সংরক্ষিত।
পশ্চিমবঙ্গের বাউল-ফকিরদের সমীক্ষা প্রয়াসে আমার লক্ষ্য তাই অনেকটাই ছিল গানে দিকে। টেপে নিবদ্ধ বেশ কিছু গান (নানা জেলার) যা আমি ও আমার সহকারীরা সংগ্রহ করেছি তা সংরক্ষিত আছে ‘লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র’-র সংগ্রহালয়ে। ভবিষ্যতে সেগুলি ব্যবহার করলে গত দেড় দশকের বাংলার বাউল ফকিরদের গানে সুর ও গায়নের প্রকৃতি তথা বৈচিত্র্য ধরা পড়বে। তবে সেগুলি সবক্ষেত্রে গায়নের দিক থেকে বা স্বরক্ষেপের গভীরতায় নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ অধিকাংশ গায়ক গায়িকা গানের দীক্ষায় তত উন্নত নন—পারফরমেন্স লেভেল খুব উঁচু নয়— সংগীত গ্রহণেও যান্ত্রিক ত্রুটি আছে। সমসাময়িক চটুল সুরের নকলনবিশি এবং বিকৃতির নমুনাও সহজলভ্য। তবু ভাল গানও অনেক পাওয়া গেছে এবং তার সংখ্যাই বেশি।
কিন্তু আমাদের লক্ষ্য কিছুটা বিশেষায়ণের অভিমুখী, তাই বাউল গানের এবং ফকিরিগানের ব্যাপক প্রচলিত কয়েকটি ছাঁচ বা ছককে আলাদাভাবে শনাক্ত করে এখানে স্বরলিপিবদ্ধ করে উপস্থাপিত হল। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে প্রচলিত এবং বহু গায়কের অনুসৃত বাউল-ফকিরি গানের অন্তত দশরকম রীতি বা স্ট্যান্ডার্ড স্ট্রাকচার অনুধাবন করলে আমাদের লোকায়ত শিল্পীদের আত্মপ্রকাশের স্বাভাবিক উৎসনির্ভরতা স্পষ্ট হবে।
‘বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে’ ও ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান দুটি জনপ্রিয় সুরবিন্যাসের কৌশল ধারণ করে রেখেছে। গান দুটির স্বরলিপি করেছেন লোক সংগীতের তত্ত্বজ্ঞ ও ভাণ্ডারি খালেদ চৌধুরী।
‘যদি ডাকার মতো পারিতাম ডাকতে’ একটি প্রসিদ্ধ বাউলাঙ্গের গান, যার ধরনকে ‘ফিকিরচাঁদী ঢং’ বলা হয়। এটির স্বরলিপি সংগীতাচার্য রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা এবং দিনেন্দ্র চৌধুরীর সৌজুন্যে প্রাপ্ত। ‘মন চল যাই ভ্রমণে’, ‘চল্ গুরু চল দুজন যাই পারে’ ও ‘আমার ঐ নিতাইচাঁদের দরবারে’ গান তিনটির স্বরলিপি লোকসংগীতশিল্পী ও শিক্ষক দিনেন্দ্র চৌধুরী প্রণীত।
স্বরলিপি অধ্যায়ে ফকিরি গানের চারটি নমুনা থাকছে। ‘লা ইলা ইল্লালার নকশা’, ‘ঐ মনের মানুষ আছে খামোস’, বন্ধুর বাড়ি তে রে মন’ ও ‘ঘরের মানুষ আছে ঘরে’ এই চার ধাঁচের ফকিরিগান ও তার সুর সরাসরি সংগ্রহ করেছেন বিশিষ্ট গবেষক কঙ্কন ভট্টাচার্য, বীরভূমের ফকিরদের গায়ন থেকে। স্বরলিপিও তাঁর করা।
স্বরলিপি প্রসঙ্গে বিশেষ সহায়তা করেছেন রণজিৎ সিংহ ও আমার স্নেহভাজন ছাত্র দীপংকর দাস। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। খালেদ চৌধুরী, দিনেন্দ্র চৌধুরী ও কঙ্কন ভট্টাচার্য আমার বিশেষ অনুরোধে স্বরলিপি প্রণয়ন করে লোকসংগীতের প্রতি তাঁদের বহুদিনের দায়বদ্ধতা প্রমাণ করেছেন।
স্বরলিপি
বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে
ও পার হবি কী করে
ও পার যাবি কী করে।
ও সেথায় কামকুম্ভীর রয়েছে সদায়
বাপরে বাপ সদায় হাঁ করে।
আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে যে করে গমন
ও তার হয় না রে মরণ
যে যায় তাড়াতাড়ি হুড়াহুড়ি
ও তার প্রাণ হারাবার তরে।
শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ অদ্বৈতের ঘাট
ও তার কীবা পরিপাট
দেখলে সেই ঘাটের ছবি অবাক হবি,
যাবি দুই বাপ বেটাতে মরে।
মদন-মাদন-শোষণ-স্তম্ভন ও মোন এই পঞ্চসার
ও সারের মহিমা অপরা,
যদি সেই যুদ্ধে যাবি তীর ছুটাবি
তবে চাবি লাগা ঘরে।
সেথা গন্ধকালী বসে আছে।
(ওই দ্যাখ, দ্যাখ) বলি খাবার তরে।
বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে

বাকি কলিগুলি দ্বিতীয় কলির অনুরূপ
সব লোকে কয়, লালন কী জাত এই সংসারে।
লালন কয়, জাতির কী রূপ, দেখলাম না এই নজরে॥
কেউ মালা কেউ তসবীহ্ গলে
তাই তো রে জাত ভিন্ন বলে
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় পড়ে॥
ছুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কী হয় বিধান
বামন চিনি পৈতেয় প্রমাণ
বামনী চিনি কী প্রকারে ॥
জগৎ বেড়ে জাতির কথা
লোকে গল্প করে যথাতথা
লালন বলে, জাতির ফাৎনা
ডুবিয়েছি সাধ-বাজারে ॥
সব লোকে কয় লালন কী জাত
বাকি পঙ্ক্তিগুলি তৃতীয় পঙ্ক্তির অনুরূপ
যদি ডাকার মতো পারিতাম ডাকতে
তবে কি মা অমন করে লুকিয়ে থাকতে পারতে।
আমি নাম জানি নে ডাক জানি নে জানি নে মা কোন কথা বলতে;
আমি ডেকে দেখা পাই না তাইতে
আমার জনম গেল কাঁদতে।
দুখ পেলে মা তোমায় ডাকি
আবার সুখ পেলে চুপ করে থাকি ডাকতে
তুমি মনে ব’সে মন দেখ মা।
আমায় দেখা দাও না তাইতে!
ডাকার মত ডাকা শিখাও
না হয় দয়া ক’রে দেখা দাও আমাকে
আমি তোমার খাইমা তোমার পরি
কেবল ভুলে যাই নাম করতে।