দরবেশের আত্মদর্শনের গান
কালাচাঁদ দরবেশ
বাংলার বাউল সুরসাগরে যেজন ডুবেছে
তিনিই সাগর সেঁচে মাণিক তুলে
বাউল রত্ন হইয়েছে।
এমন রত্নই কোহিনুর মণি
তত্ত্ব সম্রাট পরশমণি
সুর ব্রহ্মা স্বরূপিনী তার কণ্ঠে সদা হয়েছে।
ধন্য বাউল লোকশিক্ষক
সমাজের হয় প্রতিরক্ষক
মুখপাত্র খাঁটি পরীক্ষক
সাধক বাউল হয়েছে।
দরবেশ রাধাচন্দ্র নিলেন কষে
কালাচাঁদকে ভালবেসে
তত্ত্ববস্তু দিলেন শেষে প্যারিসে প্রমাণ রয়েছে।
বাউল দরবেশীর স্বর্গভূমি
বাংলাই বাউলের রাজধানী
বিশ্ববাসী হইল ধনী
তারা বাউলের পরশ পেয়েছে।
আধুনিক বাউল গান
শঙ্কর চক্রবর্তী
বাউল গান নষ্ট করল বৈতাল বাউলে—
ডিস্কো আর পল্লীগীতি করছে বাউলের ক্ষতি
পূর্ব মহাজনের পদ ভুলে।
পুঁচকে কিছু ছেলেছোকরা।
পিতামাতার কুলাঙ্গার—
বাউলের ভাবভঙ্গি নিয়ে
খমকেতে দেয় টংকার।
জানে না বাউলের ভাষা ভিটাবাড়ির জংলা চাষা।
তাই তো বাউলের দশা মাথা মুড়ে ঘোল ঢালে।
পোষাক চাঙ্গা করে রাঙ্গা হাতে নিয়ে একতারা
প্যান্ট ছেড়ে কাপড় পরে বাউল মঞ্চে হয় খাড়া—
খমকে বাজায়ে খ্যামটা
বিধবার সঙ্গে প্রেমটা
অন্ধকারে মাতালে।
মুকুন্দদাস লালনের গান
সিরাজ সাঁই পাঞ্জুর আখ্যান
বল্লভের সেই মধুর তান
গিয়েছে বাউল আজ ভুলে।
খগেন সাধু কয় ফুকারি সমাজে বাউল খুব দরকারি
রঘু আয় তাড়াতাড়ি শঙ্করকে সঙ্গে করে—
আমরা তিন মিলে গানের বাউলে
কলঙ্ক ফেলি তুলে।
বাউলের প্রতীচ্য দর্শন
হরিপদ গোঁসাই
এসে দেখি আমি এই প্যারিস শহরে
দেখছি রঙ্গবিরঙ্গে অনেক মানুষ
সকলকে নেয় আপন করে।
দেখি তাদের এমনই ব্যবহার
নাহি তাদের কেহ আপন পর—
হিংসা নিন্দা নাই অন্তরে
চুম্বন খায় সবাই সবাইকে ধরে।
পুরুষ নারীর নাই কোনো বাধা
এদের অন্তরগুলি বড়ই সাদা
এরা প্রেমে মত্ত সকল সময়
কী ঘরে কী বাহিরে।
তাদের লীলা খেলা বলব কী
যেমন বস্তুহারা ব্রজবালা হয় উলঙ্গী
উত্তম প্রেমে মত্ত তারা
রয়েছে নেশার ঘোরে।
হরিপদ কয় সত্যকথা
তোমরা মা জননী স্বর্গের দেবতা
তোমরা ইন্দ্রপুরী ত্যাজ্য করে
এসেছ এই প্যারিস শহরে।
অন্ধ প্রতিবন্ধী বাউলের রচনা
রথীন হালদার
আমি বিহগের গান শুনেছি বিজনে
নীলাকাশ চোখে দেখিনি—
আমি কুসুম গন্ধ পেয়েছি কাননে
গোলাপের শোভা দেখিনি।
আমার দু’চোখে আঁধার কখনও
আলোর ঠিকানা পাবে না—
অন্তর যদি কাঁদে প্রিয়া বলে
জানি তুমি কাছে রবে না
হৃদয়ের মাঝে পরম যতনে
মোর ছবি কেহ আঁকেনি।
শুনেছি শুধুই রামধনু নয়
সাতটি রঙেতে রাঙানো
তোমার দু’চোখে সাগরের নীল
কুন্তলে মেঘ ছড়ানো—
গানের ভুবনে আহত বলাকা
মেলেনিকো পাখা সুদূরে।
বিরহ ব্যথার অশ্রু মালিকা
পারিনিকো দিতে প্রিয়ারে
বেদনার সুরে মোর স্বরলিপি
হায় আজও কেউ লেখেনি।
২.৪ বাংলা ফকিরি গানের স্বর্ণসঞ্চয়
বাংলা ফকিরি গানের স্বর্ণসঞ্চয়
দায়েম শাহ-র গান
১
ফিরবি কবে রে মন মরি এ রণ
ঘর বড় ঘড়িরে ভাই দেখিলাম ঘোর দরশন।
সেই খানেতে বিরাজ করে সাঁই নিরঞ্জন
মরি এ রণ—
ছাঁচ চালের পানি রে ভাই ঘরের মড়কচাতে মরে
ভেবে দেখ ও পাগল মন আপন আপন ধড়ে
ফিরবি কবে রে মন—
হাল জোয়াল মাঠে গেল বলদ রইল গাভির পেটে
কিরষেনের ও খোঁজ নাই তো, লাইলি গেল মাঠে
ফিরবি কবে রে মন—
দায়েম শা ফকিরে বলে আমার লেগে গেল ধাঁধা
করকটাতে শিকার করে বাজ রইলো বাঁধা
ফিরবি কবে রে মন—
২
মনের মায়ার তগি ফেলেছে, প্রাণের মায়ায় তগি ফেলেছে
ভবে বিষয় কাঁটার টোপ গেঁথেছে।
এই সে ভব সিন্ধু মাঝে চোদ্দ পোয়া দ’পড়েছে
চোদ্দ পোয়া পুষ্করিণীতে ঘাট করে সে বসে আছে
মনের মায়ায়—
এক দু তিন চার হাত ডোরেতে চারদিকে চার বঁড়শি আছে
কোথাকার এ খেলোয়াড় এসে ফিচাক মেরে দাঁড়া ফেলেছে
মনের মায়ায়—
জীবনে যার আখেরে গর্মি সেই কাঁটাতে ঠোকরেছে
আমোদে না গিলতে পেরে গলায় কাঁটা লাগান বসে আছে
মনের মায়ায়—
দায়েম শা ফকির বলে ভাই কাটা ভাঙার পথ রয়েছে
নবীর কলমা পড়ে মারো ঝাপটা ভাঙবে কাঁটা ভয় কি আছে
মনের মায়ায়—
৩
রুহু নফস্ কালেব ভেদ জেনে তুই কররে সাধনা
রুহু নফস্ কালেব না চিনিলে বন্দেগী তোর হবে না।
রুহু নফস্ কালেব কারে বলে ওরে বুঝে লে তুই গুরুর ঘরে
আবার গুরুকরণ না করিলে এই ভেদ তুই পাবি না
রুহু নফস্ কালেব—
ওরে পঞ্চ রুহু পঞ্চ আত্মা কর তাহার সাধনা
আবার তার সাধনা করিলে ভবেতে পার পাবি না
রুহু নফস্ কালেব—
ইলমে ফুকা যারে বলে ওরে চিনে লে তুই গুরু ধরে
আবার ইলমে তাহিম তোর না থাকিলে চলবে না
রুহু নফস্ কালেব—
ওরে বুঝে নে তুই নাতেকে খুলে যেদিন যাবি গুরুর ঘরে
আবার ইলমে লাদুনী না চিনিলে বন্দেগী তোর হবে না
রুহু নফস্ কালেব—
দায়েম শা ফকিরে বলে ভেদ থাকে কি পদ্মবনে
ওরে গুরুকরণ না করিলে সেই ভেদ তুই পাবি না।
৪
ওরে খ্যাপা সহজে কি ধন মেলে কামেল মত্ত না হলে
কামরূপেতে কামেল হাওয়া চাই জিন্দা মরতে হয়
নবীর তরিক ধরতে গেলে।
আয়ুব নবীর ছিল চার বিবি তিন বিবি তালাক নিলে
একা রহিমা বিবি নবীর করণ মরণ শিকার না যায় ছেড়ে
ওরে খ্যাপা—
আয়ুব নবীর আঠারো বছর তাজা দেহ পোকায় খেলে
তবু নবী পড়তেন নামাজ রহিমা বিবির চুল ধরে
ওরে খ্যাপা—
আয়ুব নবীর আঠারো বেটা এমনি আল্লা দিল গজব
মরে গেল সবক’টা
দায়েম শা ফকিরে বলে তবু নবী হাত তুলে
আল্লার কাছে মুলাকাত করে।
