শব্দ গান
খ্যাপাচাঁদ বাউল
পব বিনে জগতে কে আপন।
পরের জন্য যার প্রাণ কাঁদে
সেই তো জানে পরের মন।
যেমন লোহা-কাঠ সংগ্রহ করি
সমুদ্রেতে ভাসায় তরী
তার কে হয় কার আপন।
তরী একবার ভাসে একবার ডোবে
তবু না ছাড়ে প্রেমের বাঁধন।
যেমন মেয়েরা যায় পরের বাড়ি
পরকে লয় আপন করি
হয় মহামিলন—
তারা একবার হাসে একবার কাঁদে
না ছাড়ে প্রেমের বাঁধন।
খ্যাপা বলে পর আপনার করা
হতে হবে জীয়ন্তে মরা
হয়েছিল চণ্ডীদাস একজন—
তারা একমরণে দুজন ম’ল
এমনি তাদের প্রেমের মিলন।
বাউল তত্ত্বগান
রাধেশ্যাম দাস
তারে দেখতে যদি পাই
চিত্তের অন্ধকার সন্ধ মেটাই।
শুনেছি যা শুনব না তা
বর্তমানে দেখানো চাই।
না দেখে আপন নয়নে
ভজিব বল কেমনে
বর্তমান দেখায় যে জনে
তাহার চরণে বিকাই।
বাহিরে সে অন্ধকারে
চন্দ্র সূর্য হরণ করে
যে মনের আঁধার ঘুচাইতে পারে—
সেই দীক্ষাগুরু গোঁসাই।
ভুলব না আর সোনা বলে
শোনা কথা সবাই বলে
শোনা কথায় তরী খুলে
হাঁটু জলে পাইনে থাই।
বহু মন সাধনার ফলে
গুরুচাদের কৃপা বলে
রাধেশ্যাম কয় দেখতে পেলে
সোনাতে বাসনা নাই।
বাস্তবগন্ধী বাউল গান
অজ্ঞাত
হরি তোমায় ডাকবার আমার
সময় হল কই?
আমি ঐ ভাবনায় সদা রই।
ভোরের বেলা মনে করি করব তোমার স্তব
ক্ষুধার লাগি খোকা উঠে লাগায় কলরব—
আবার ঐ গোলমালে গিন্নি জেগে
তার চাঁদবদনে ফোটায় খই।
মনে করি গঙ্গাজলে করব তোমার স্তুতি
কলসি কাঁখে সারি সারি উদয় যুবতী—
আমি তাদের দেখে তোমায় ভুলে
অমনি আত্মহারা হই।
যখন আমি বসি ভোজনে
একক ক্ৰমে পঞ্চগ্রাস দিই গো বদনে
তখন পাওনাদারের সাড়া পেয়ে
শুক্তানিতে মাখাই দই।
যখন আমি মালা নিয়ে জপেতে বসি
তখন লম্বা হাতে বাজার ফর্দ উদয় প্রেয়সী
ঘরে চাল বাড়ন্ত লক্ষ্মীকান্ত
অমনি মালা ঝোলা সই।
উত্তরবঙ্গের তরজা বাউল গীতি
তরণী সেন মহান্ত
শিষ্যের প্রশ্ন
গুরু তুমি তত্ত্ববেত্তা শুধাই তোমারে
লীলা একি নিত্য দেখি বল গো আমারে।
আগে হল লীলাখেলা পাছে জন্ম তার
দেখে শুনে মাথা ঘোরে কাণ্ড চমৎকার।
আগুন (অঘ্রান) মাসে রাসলীলা হয় ফাগুন মাসে দোল
শ্রাবণ মাসে ঝুলন যাত্রা দেশে কলরোল।
তারপরে ভাদরে জন্মে কৃষ্ণ করে লীলা
তরণী কয় লীলাময়ের এ কীসের অছিলা।
গুরুর উত্তর
মত্ত হয়ে তত্ত্ব কর এ দেহের ভিতরে
লীলা ছেড়ে তত্ত্বে পাবে দেহ অভ্যন্তরে।
জীব মত্ত রয় রাসলীলাতে শেষে খণ্ডরতি
কর্ষণে আনন্দ সত্তা রাসে হয় আহুতি।
দোল অর্থ আবীরের খেলা শেষে ফাগুন মাস
রক্তে মাখা গর্ভের শিশু চার মাসে প্রকাশ।
শ্রাবণ মাসে ন’মাস শিশুর ঝুলনেতে ঝোলা।
মাতৃগর্ভ ঝুলে পড়ে শিশু মারে দোলা।
ভাদরে তাই দশমাস হলে হয় জন্মাষ্টমী
তরণী কয় কী বলব আর এই বুঝেছি আমি।
শিক্ষিত নাগরিকের বাউল রচনা
বঙ্কিমচন্দ্র দত্ত
শুধুই রূপসজ্জায় কি মানুষ করা যায়?
মানুষ আছে এই দেহ-ঘটে
নাইক পটে—
নাইরে মন্দির মসজিদ গির্জায়।
সেই মানুষের করণ নয় সাধারণ
সেই যে অগ্নি-পারার মিলন করণ
এ ভবে তা’ জানেরে কয়জন
যে জন জানে তাহার ধর গে চরণ
নইলে তারে পাবি নারে সুনিশ্চয়।
তুই মাথায় বাঁধলি লাল পাগুড়ি
স্কন্ধে ঝুলাস লাল উত্তরী
বাঁধলি কোমরপটি ঊর্ধ্বঝুঁটি
হাতে গোপীচন্দ্র শোভা পায়।
মন রে সময় থাকতে ছাড় এই খেলা
সাধুসঙ্গ করিস্ না হেলা
এবার বহিরঙ্গ দূরে ফেলা
অন্তরঙ্গ ভাবের কর আশ্রয়।
গোঁসাই বলে ওরে বঙ্কা
তোর থাকবে না রে কোনো শঙ্কা
তুই পারে যাবি মেরে ডঙ্কা
একবার ধর না গিয়ে সাধুর পায়।
প্রবীণ বাউলের রচনা
সনাতনদাস বাউল
খ্যাপারে ঢাকা শহর যাবি কী করে
ও তুই ঢাকা খুলে দেখলে পরে যাবে রে মাথা ঘুরে।
এবারঢাকার কথা শোন তরে বলি
ঢাকার ভিতর আছে ঢাকা তিপ্পান্ন গলি—
আছে ঢাকার ভিতর গন্ধকালী বলি খাবার তরে।
ঢাকায় চারদিকে আছে দেখ ঝুরকুণ্ডারি বন
অপ্রকটে আছে সেথা মদনমোহন—
সেথাডাকিনীটা দিবানিশি আছে বসে হাঁ করে।
খ্যাপা বলেসনাতন রে
সেথা বেহুশারে গেলে পরে
বাপ-বেটায় মরে—
আবার ঠাকুর গেল মরে
বাগাতে সে না পেরে।
শিক্ষিতজনের জনপ্রিয় বাউল রচনা
আশানন্দন চট্টরাজ
আমি মরছি খুঁজে সেই দোকানের
সহজ ঠিকানা—
যেথা আল্লা-হরি-রাম-কালী-গড্
এক থালাতে খায় খানা।
যেথা ভক্তি-যোগের আগুন জ্বেলে
গোরা রামকৃষ্ণ কড়াই ঠেলে
আর মহম্মদ জিন যিশু ছাঁকে
প্রেম-রসে মিহিদানা।
আমি মরছি খুঁজে সেই ঠিকানা।
যেথা জ্ঞান-ছানাতে কর্ম-চিনি
বুদ্ধ নানক মাখে
আমি দয়ার সাথে ক্ষমার সাথে
ধর্মবড়া থাকে।
যা পয়সা দিলে যায় না পাওয়া
আর বিন কড়িতে যায় গো খাওয়া—
যেথা আসল মালিক চেনার হদিস
জপ ধ্যানেতে যায় জানা—
আমি করছি খুঁজে সেই দোকানের
সহজ ঠিকানা।
প্রবীণ বাউলের আধুনিক রচনা
হরিপদ গোঁসাই
যাস নারে তুই হুরার পুকুর পার।
সেই পুকুরের জলের পারে
মাছরাঙায় মানুষ মারে
দেখলে জীবের জ্ঞান থাকে না আর।
পুকুর সারে তিনকানি
বস্যাতে লাল পানি
ডুলি দিলে বহে একটি দ্বার—
সেই পুকুরে পাগলা ভোলা
সিনান করে তিনবেলা
ব্রহ্মা বিষ্ণু না পাইল আর।
পুকুরের পারে অমাবস্যায়
চন্দ্র ওঠে কোন্ ভরসায়
পূর্ণিমার দিন থাকে অন্ধকার—
সেই চন্দ্র দর্শন করিলে
কোটি জন্মের ফল ফলে
ভবের পরে আসবে না সে আর।
ভেবে হরিপদ বলে
চন্দ্রগ্রহণের কালে
মুক্তিস্নানে যেয়ে পুকুর পার—
দুই জনে এক আত্মা হয়ে
স্নান করলে সেই পুকুরে
জন্ম মৃত্যু না হইবে আর।
