বাউল গান রচনার ধারা এখনও সজীব। পশ্চিমবঙ্গে নানা পল্লিতে নামা-অনামা ব্যক্তি বাউল গান লিখে চলেছেন, তাঁদের শিষ্যরা সেসব গান গাইছেনও নানা আসরে। সনাতনদাসের মতো শিল্পী নিজের লেখা গান নিজেই গাইছেন। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে যে, কিছু কিছু শিক্ষিত ব্যক্তি, মূলত বাউল গানের ভাবে রসে স্নাত হয়ে, গান লিখছেন, জুগিয়ে দিচ্ছেন চেনা বাউলের হাতে, গাইবার জন্য। সেগুলিও ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবাংলার নানা প্রান্তে ঘুরতে ঘুরতে শত শত গান সংগ্রহ করেছি। তার থেকে বেছে, বিচার করে, ২০টি গান এখানে সংকলিত হল। এ গানগুলির অধিকাংশ আনকোরা— কিছু ঐতিহ্যবাহী। গানগুলি নির্বাচনে বিষয়গত বৈচিত্র্য ও প্রকাশগত অভিনবত্বের উপর ঝোঁক পড়েছে। কত আশ্চর্য বিষয় নিয়ে যে এঁরা ভাবছেন, এখানে তার একটা ‘থিমেটিক ভেরিয়েশন’ যাকে ইংরিজিতে বলে, তা পাওয়া যাবে। প্রবীণতম জীবিত বাউল থেকে নবীনতম বাউলের রচনাসম্ভার এখানে বিন্যস্ত হল। বাউল জীবন, বাউল তত্ত্ব, শব্দ গান, উক্তি-প্রত্যুক্তিমুলক রচনা, বাস্তব জীবন সমস্যা, সমাজ পরিবর্তনের সংলাপ, প্রতীচ্যদর্শনের অভিঘাত, বাউল গানের বিকৃতি—এমনতর নানা বিচিত্র ভাবনার তরঙ্গ এসে লেগেছে এসব গানের অন্তস্তলে। পাঠকদের সামনে আধুনিক বাউলের বিচিত্র আত্ম-প্রতিকৃতি হাজির করাই এই সংকলনের লক্ষ্য।
এর বাইরে আরও যে শত শত বাউল গান সংগৃহীত হয়েছে তা ধরা আছে টেপ-এ এবং লিখিত আকারে। ভবিষ্যতে কখনও সেগুলি সংকলিত হতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী বাউল গান
অনন্ত দাস
ওগো সুখের ধান ভানা
ধনী এমন ব্যবসা ছেড়ো না—
কর কৃষ্ণ প্রেমের ভানা-কুটা কষ্ট তোমার থাকবে না।
তোমার দেহ-ঢেঁকশালে অনুরাগের ঢেঁকি বসালে
ভজন-সাধন পাড়ুই দুটো দুদিকে দিলে
আবার নিষ্ঠা-আঁসকল লাগালে
চেঁকি চলবে ও যে টলবে না—
ওগো সুখের ধান ভানা।
রাগ ও বৈধী দুজন ভানুনী তাদের নাম কৃষ্ণমোহিনী
তাদের একজন সদ্গোপের মেয়ে একজন তেলেনি
তারা ধান ভানে ভাল জানে ভাল
তাদের গায়ে সোনার গহনা।
ঘরে বৃদ্ধা শ্রদ্ধা সেকেলে গিন্নি
শুদ্ধমতি শুতি কুলো-চালুনি
এবার কামকামনা ঝেড়ে ঝুড়ে
তুষ-কুঁড়ো চেলে নাও না।
রাগ-বিবেকের মুষল আঘাতে
বাসনা-তুষ যাবে ছেড়ে পাড় দিতে দিতে—
চাল উঠবে ঘেঁটে বিকার কেটে
ঠিক যেন মিছরিদানা।
শ্রীগুরু-মহাজনের ধান তাতে হবে রে সাবধান
ষোলআনা বজায় রেখে করবে সমাধান
তুমি লাভালাভে কাল কাটাবে
আসল যেন ভেঙ্গ না।
গোঁসাই বলে অনন্ত তুই ধান ভান্তে জানিস না
ও তোর ঘটবে যন্ত্রণা—
পাপ-ঢেঁকি তোর মাথা নাড়ে গর্তে পড়ে না।
দেখিস যেন বেহুঁশারে হাতে ঢেঁকি ফেলিস না।
পুরনো বাউল তত্ত্বপান
রাধেশ্যাম দাস
দেখলাম এক রমণী প্রেম পাগলিনী আছে জগতে
সে হয়ে উন্মত্ত লয়ে প্রেমতত্ত্ব ফিরছে পথে পথে।
স্বামীর সহ হয়নি শুভমিলন
কেমন করে কী প্রকারে জানবে প্রেম কেমন—
হয় সেই যুবতী গর্ভবতী বিনা পতি সঙ্গমেতে।
ধন্য রমণী কেমনে জানি প্রসব করে তিন সন্তান
দুইটি গৃহবাসী একটি উদাসী করতে পিতার সন্ধান—
সেই রমণী হয়ে জননী মজে পুত্রের প্রেমেতে।
ত্রিজগতের কর্তা যিনি আদি বিধাতা
তিনজনকে তিন কর্ম দিয়ে করলেন তিন কর্তা—
কেউ সৃষ্টিকর্তা কেউ পালনপিতা
কেউ প্রলয়কর্তা শেষেতে।
অজ নামে সন্তান যিনি তিনি সৃষ্টি করে
ক্ষীরোদ সাঁই নামে সন্তান পালন করে সবারে—
অপর সন্তান করেন সমাধান মহাকাল নামেতে।
দাস রাধাশ্যাম বাতুলের মতো কহে সৃষ্টিতত্ত্ব
জীবের অসম্ভব কিন্তু শাস্ত্রসঙ্গত—
আমার যত কিছু প্রকাশিত গুরুর চরণ কৃপাতে।
জগৎ প্রসবিনী যে জননী সেই মহামায়া
হয়েছে প্রেম-পাগলিনী স্বামীর সঙ্গ না পাইয়া।
পরমপুরুষ আদি যিনি তাঁর যে তিন শক্তি
তিন শক্তির মধ্যে প্রধান যে সেই মায়াশক্তি—
তিনি আদ্যাশক্তি ভগবতী।
নামটি অভয়া।
ইচ্ছাময় সেই পরমপুরুষ স্বয়ং ভগবান
তাঁর ইচ্ছাতে প্রসবে মা তাঁর তিনটি সন্তান—
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের বিধান
তিনকে দিলেন বিচারিয়া।
ঐ মহাশক্তি রমণীর প্রতি হয় দৈববাণী
তিনের মধ্যে চিনে লহ কে হয় তব স্বামী—
শ্রীজগৎপতি পিতা ও আমি
তুমি দেখ মা ভাবিয়া।
ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব তিনকে ডেকে বলেন মা সতী
তিনজনের মধ্যে একজন হও মম পতি—
শিব বলেন মা শক্তি একশো আটবার যদি
ত্যাগ কর মা কায়া।
গোঁসাই গুরুষ্টাদ মহাশক্তিমান সর্বতত্ত্ব অবগত
কৃপা করি জানিয়েছেন তায় মায়েরই তত্ত্ব—
রাধাশ্যাম কয় চাই না অর্থ
মা চাই তব পদছায়া।
অজ্ঞাত রচয়িতার মরমি পদ
ওরে মন জানব তুমি কেমন গড়নদার
কেমন স্বর্ণকার—
ওরে গড়ে দে তুই উপাসনার সোনার অলংকার।
নিষ্ঠা-নিক্তিতে ধরে
সোনা জমা নে ওজন করে
দেনাপাওনা যোলোআনা সূক্ষ্মের উপরে—
ছেড়ে খুঁটিনাটি ময়লা মাটি গলিয়ে খাঁটি কর এবার।
আগে জ্বালো বিবেক-হুতাশন
ষড়রিপু-কয়লা তাতে কর রে ক্ষেপণ—
তাতে সাধুসঙ্গ-সুবাতাস দে
আঁচ হবে তোর চমৎকার।
আমি নিষেধ করে দিতেছি দোহাই
যেন অসৎসঙ্গ-তামাদস্তা খাদ দিও না ভাই—
গলিয়ে আঁচে ভাবের ছাঁচে ঢেলে তারে করবি তার।
সোনা কি অমনি গলে শুধু অনলে
তাতে দে অনুরাগ-সোহাগার ভাগ যতনে ফেলে—
গড়ে দে আমার চমৎকার কৃষ্ণভক্তি-রত্নহার।
ব্রজের ভাব সুনির্মল
তাতে কেটে দে ডায়মল—
গোপী-ভাবের ঝালা দিলে করবে রে ঝলমল।
দিয়ে শুদ্ধরতি গাঁথলে মোতি
হবে অতি সুবাহার।
