ও তুমি দেল-হুজুর না চিনলে পরে
তোমার নামাজ হবে কী করে?
দেল-হুজুরে পড়ো নামাজ আপনার মোকাম চিনে।
ওরে ভুলে যাবি ইশ্কের জ্বালা
উঠবে নূর তাজেল্লা
খ্যাপা সামনে দেখবি আল্লাতালা
ঠিক রাখো দুনয়নে।
একেবারে অবিন্যস্ত রচনা। আঙ্গিক শিথিলতা আর মিলের চমৎকৃতিহীনতা রীতিমতো শোচনীয় কিন্তু এর মধ্যে জ্বলজ্বল করছে দায়েম শা-র বিশ্বাসের গভীর উচ্চারণ। ‘দেল-হুজুর’ শব্দটাই অভিনব, যার অর্থ আত্মস্থ সত্তার নির্দেশ। সেই নির্দেশে আপনার ‘মোকাম’ অর্থাৎ অবস্থান জেনে নিয়ে তবে নামাজ পড়তে হবে অবিরত। তাতেই সামনে বিভাসিত হবে শুভ্রজ্যোতি ‘নুর’ এবং প্রত্যক্ষ দেখা দেবেন আল্লাতালা। গানের পরবর্তী এক অন্তরা অংশে দায়েম বলেছেন আরও গুহ্য কথা। যেমন:
বে-আকারে সিজ্দা দিলে
খ্যাপা সেই সিজ্দা কি হয় দলিলে?
আকার ধরে দাওরে সিজ্দা
বসে থাকো এক ধ্যানে।
এখানে দ্বিধাহীন সাকার উপাসনার কথা রয়েছে। আল্লার সাকার রূপকেই ‘সিজ্দা’ বা প্রণতি দিতে হবে। বেআকারে সিজ্দা কায়েম হয় না। কিন্তু তার আগে, সবচেয়ে আগে, নিজের মোকাম ধরতে হবে। লালন তাঁর গানে বলেছিলেন: ‘নিজ মোকাম ধরো বহু দুরে নাই’— নিজের মধ্যেই আছে আত্মোপলব্ধির পথ। শুধু বর্হিবৃত্তি ত্যাগ করলেই সেই পথের দিশা মেলে। নিরাকার সাধনায় যে আল্লা পাওয়া যায় না সেকথা দায়েমের আগে লালন বলে গেছেন, তবে অনেক কবিত্বে উপমায় ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ করে। তাঁর গানের ব্যক্ততা:
নৌকা ঠিক নয় বিনা পারায়
নিরাকারে মন কি দাঁড়ায়?
লালন মিছে ঘুরে বেড়ায়
অধর ধরতে চায় বর্জখ বিনে।
অসামান্য উচ্চারণ ও ভাবের বিন্যাস অথচ যুক্তির সমবায়ে। বলার কথা হল, নৌকা যদি ঘাটে বাঁধা থাকে তবে তার সার্থকতা কোথায়? পারাপারই তো তার কাজ, তার ধর্ম। সেই পারাপারে চাই মাঝি বা কাণ্ডারি। বেঁধে রাখা নৌকার মতো উদ্দেশ্যহীন হল নিরাকার সাধনা, তার সঙ্গে মনের যোগ থাকে না। অতএব দেহনৌকা বাইতে হবে সাকার মুর্শেদকে মাঝি করে। অধরাকে ধরার এই হল বাস্তব পদ্ধতি।
মুর্শেদকে ধরে কায়া সাধনাই ফকিরি-পস্থার সার কথা, আর সবই এ-মতে বহির্বৃত্তি বলে পরিত্যাজ্য। নসরুদ্দিন ফকিরের রচনায় বলা হচ্ছে:
মালা জপে পাঁচবেলা
কে কোথায় পেয়েছে আল্লা?
মক্কা ও মদিনা গেলে
কই তাহার ঠিকানা মিলে?
হাজীগণকে শুধাইলে
সেথা হয় মানুষের মেলা।
যেয়ে দেখি জুম্মাখানা
তথায় গিয়ে খোঁজ পেলাম না
মানুষে খায় মানুষের খানা
আল্লা খায় না একতোলা।
মালা জপের উপাসনা আর হজের নিরর্থকতা গানটির উপজীব্য। তাতে আল্লাকে পাওয়া যায় না। মাফেরত হাজীদের কাছে জানা যায়, হজ মানে মানুষের মেলা, মানুষের জন্য মানুষের তৈরি খানাপিনার আয়োজন। তার একদানাও আল্লার ভোগে লাগে না। লালন অবশ্য মানব সমাগমের গভীরার্থ অন্যভাবে ভেবেছিলেন। তাঁর বচন: ‘কাশী কিংবা মক্কায় যাওরে মন/দেখতে পাবে মানুষের বদন’। অর্থাৎ অলৌকিক ভাবসাধনা নয়, তীর্থব্রতের চেয়েও অনেক বড় মানবতন্ত্র— মানুষতত্ব।
কিন্তু নসরুদ্দিনের যে-ফকিরি গান আমরা পড়ছিলাম, তার পরবর্তী অংশের কথা হল:
খোদার তৈয়ারি ঘরে।
খুঁজলে পরে মিলতে পারে—
ঘর বানায়ে তার ভিতরে।
বসে আছে সেই মৌলা।
ফকিরদের কথা, মানুষের তৈরি মক্কার কাবা-ঘরে তাঁকে পাওয়া যায় না। তাঁর তৈরি যে মানবদেহ তার গভীর অভ্যন্তরে নিজের ঘরটি বানিয়ে তাতে বসে আছেন স্রষ্টা। এখানে স্রষ্টা অর্থে সৃষ্টিবিন্দু— বীর্য। হজরত আলী নামে এক অজানা ফকিরের গানে চকিত এক পঙ্ক্তি পেয়েছিলাম: ‘দেহতে মক্কা গোপন সব জানাজানি’। হঠাৎ শুনে স্ববিরোধী মনে হয় কিন্তু ঠিকই তো এই সত্য যে, দেহ-মক্কা এক অর্থে গোপন, আরেক বিচারে জানা। ফকিরদের রহস্যময় কল্পনা স্রষ্টা আল্লা আর সৃষ্ট আদমের দেহ নিয়ে কত রঙ্গ, কত বস্তুবিবরণ বানায়। যেমন মজিদ নামে ফকিরের গানে পাই:
আদমের কালেবের মাঝে
পার্ক এলাহির বারামখানা।
দেহের পিঞ্জরের মাঝে
কী আজব কারখানা।
মানুষের দেহের মধ্যে পবিত্র আল্লার নিবাস। সেই দেহকে জানলে চিনলে, সেই দেহকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারলে আরও কত অগোচর রহস্য জানা যায়। জানা যায় এমনতর বিচিত্র সংবাদ যে,
নাভীর মধ্যে মক্কা শরীফ
কইরাছে ঠিকানা—
নাভীর উপর বয়তুল মুকাদ্দাম
কালিজাতে থানা—
দেলের ভিতর রাখিয়াছে
সোনার মদিনা।
তবে তো দেহ-তীর্থ ভ্রমণ সর্বতীর্থসার। এ ধরনের কথা ও কল্পনা গড়পড়তা ভাবনায় পাওয়া সম্ভব নয়। ইসলামি ধর্ম বিশ্বাস আর আকিদার অন্য পিঠে এই কল্পজগৎ। যেমন মধুর কল্পনায় চিত্তগ্রাহী তেমনই রহস্যসুন্দর। বাহার ফকিরের ছোট একটি মারফতি গানে জগতের অন্তর্গোপন কত সংবাদ পর্যষিত হয়ে আছে, যখন পড়ি,
যেভাবে সাঁই-এ মিশে রয় খোদা
ছিনায় ছিনায় ঘুরে বেড়ায় ছপিনায় জুদা!
গোড়াতেই বলে দেওয়া হল, ফকিরদের মৌল প্রতীতি যে, সত্য পেতে হবে হৃদয় দিয়ে, সফিনা বা শাস্ত্রগ্রন্থের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক বিরোধী ও ব্যবধান রচনাকারী। একমাত্র হৃদয় সংযোগে বোঝা যায় সাঁইয়ের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে নিহিত হয়ে আছেন খোদা। যেমন দুধের মধ্যে ননী, ননীর মধ্যে ঘৃত। পরপর সাংসারিক বাস্তবের হাতে হাতে করা অভিজ্ঞতা উঠে আসছে—ভাবনার কোনও ধূসরতা নেই। বাহার এই ইঙ্গিতটুকু দিয়েই ক্ষান্ত হন না। মরমি শ্রোতাদের তুলনার ছটায় ভরিয়ে দিয়ে বলে যান:
