আসমানে সূর্যদেব আছে
তার জ্যোতি লাগে কাছে
হায়রে তেমনি ভাবে আল্লা
মানুষে সর্বদা।
যাকে ভাবছি সুদূরের সামগ্রী, অধরা ও অপ্রাপণীয়— তার তাপ যেমন দেহলগ্ন হয়ে যায়, ঠিক তেমনই করে আল্লা সুদূর তবু মানুষের সঙ্গে উষ্ণ সাহচর্যে অস্তিত্ববান। তাকিয়ে দেখলে চোখে কি পড়ে না এই সত্য যে,
মিশে রয় গাছে বীজে
হায়রে ফুলে মিশে বাস রয়েছে
ফলে মিশে সুধা।
যুক্তির ক্রম ক্রমশ অনুভবের গভীরে যাচ্ছে— দৃশ্য থেকে ভাবে। আমরা বুঝে নিই গাছে যেমন বীজ থাকে গোপন হয়ে, কিংবা বীজেরই অভীপ্সা গাছ, তেমনই অচ্ছেদ্য ফুল আর তার সৌগন্ধ, ফলের অন্তঃশায়ী মাধুর্যের স্বাদ। এর পরের কথাটা অনুক্ত কিন্তু প্রকাশ্য— অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে খোদা, সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টা। তাঁকে কেন তবে খুঁজব মন্দিরে-মসজিদে, শাস্ত্রে, শাস্ত্রী-মোল্লায়, কাশী-মক্কায় কিংবা রোজা-উপবাসে? ফকিরিয়ানার শেষ কথা হল গোপনীয়তা। জাহির নয় বাতুন। তাকে তালাশ করতে হবে অতলতার গোপনে। কারণ—
গোপন রয়েছে খোদা তাকে চিনিনি।
কাম গোপন প্রেম গোপন লীলা নিত্য সবই গোপন
আরসে আল্লা গোপন নীরের নিশানী।
জলেতে মীন গোপন ঝিনুকে মুক্তা গোপন
ফুলেতে গন্ধ গোপন আপে রব্বানী।
আদমে আহাদ গোপন মীমেতে নূর গোপন
কোরানে কলমা গোপন আপে গোপনী।
নামাজে মারুফত গোপন ষাট হাজার কলমা গোপন…
গভীর চলাকে গোপন রেখে ফকিরবা রয়ে গেছেন যুগে যুগে তাঁদের অচলপ্রতিষ্ঠ বিশ্বাসে।
১.৯ পুরুলিয়ার ‘সাধু’ গান
পুরুলিয়ায় বাউল গান অনুসন্ধান করতে গেলে আমার আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হয়। সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে গান বিষয়ে যাঁরা অভিজ্ঞ বা উৎসাহী তাঁরা আমাকে নিরুৎসাহ করেন এই বলে যে, ‘এ-অঞ্চলে বাউল নাই, সবই ঝুমুর।’ পুরুলিয়া শহরে প্রখ্যাত ঝুমুর গায়ক কুচিল মুখোপাধ্যায় আধুনিক কালের মানুষ। একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরাজি পড়ান। তাঁকে বাউল গান বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে সরাসরি জানিয়ে দেন, পুরুলিয়ার বাউল গানের কোনও ধারার কথা তাঁর জানা নেই। বড়জোর দু’-চারজন বাউল গায়ক থাকলেও থাকতে পারেন কিন্তু তাঁদের গানে কোনও মৌলিকতা বা স্থানিক বিশেষত্ব নেই।
এর পরবর্তী খোঁজখবরে শলাবৎ মাহাতোর কথা জানা গেল। তিনি পুরুলিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত লোকায়ত ঝুমুরশিল্পী, প্রবীণ ও প্রতিভাসম্পন্ন গায়ক। ঝুমুর গায়নের জন্য তিনি রাজ্য সরকারের ‘লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র’-র পক্ষ থেকে লালন পুরস্কার পেয়েছেন। জানা গেল প্রধানত ঝুমুর গায়ক হলেও এখন বাউল গানও করেন। রাজ্য সংগীত একাডেমি প্রকাশিত ঝুমুর গানের সংকলনে বিস্ময়করভাবে কিছু মুদ্রিত বাউল গান পাওয়া গেছে। পুরুলিয়ার প্রবীণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী নকুল মাহাতো আমাকে জানান, পুরুলিয়ায় অনেক বাউল আছেন। তাদের পাওয়া যাবে ভেতরদিকের গ্রামে।
হয়তো কেন, নিশ্চয়ই বাউলরা আছেন, কিন্তু তাঁদের নাম-যশ বা পরিচিতি নেই। তাত্ত্বিক গুরুত্ব, গুরুপাট, আখড়া বা আশ্রম, শিষ্যমণ্ডলী তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। থাকলে এতদিনে বাংলার বাউল গানের আসরে তাঁদের প্রতিনিধিত্বের চেহারা দেখা যেত।
এরপর খোঁজখবরের টানে পুরুলিয়া বেশ ক’বার যেতে যেতে পুরুলিয়া শহরের সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক লেখক অজিত মিত্রের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন অধ্যাপক বন্ধু শ্যামাপ্রসাদ বসু। অজিত মিত্র আমাকে প্রথম পুরুলিয়ার ‘সাধু’ গানের খবর দেন এবং তাঁর সিদ্ধান্ত যে, পুরুলিয়ায় বাউল গানের শুন্যস্থান সাধুগানেই পূর্ণ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁকে আমি অনুরোধ করি, সাধুগান সম্পর্কে তাঁর মতামত ও একটি প্রতিবেদন আমাকে লিখে পাঠাতে। ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই তিনি ‘পুরুলিয়ার সাধুগান’ শিরোনামে যে লেখাটি আমাকে ডাকযোগে পাঠান, এখানে তার থেকে মূল কথাগুলি তাঁর ভাষাতেই উদ্ধৃত হচ্ছে। এই লেখা পড়লে একটা কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাউল গানের প্রভাব বহুমাত্রিক আর বহুদূর বিস্তৃত। অঞ্চল ভেদে এর ভাব, বাণী ও আঙ্গিকের ভিন্নতর চেহারা পাওয়া যেতে পারে। তার জন্য আর একটু নিবিড় অনুসন্ধান এবং ভূমিপুত্রদের সহযোগিতার দরকার। অজিত মিত্রের রচনার সারাৎসার এইরকম।
পশ্চিম সীমান্ত রাঢ়ের অন্তর্গত পুরুলিয়া জেলায় বাউল সংগীতের প্রচলন খুবই কম। যা ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাও প্রতিবেশী জেলা থেকে আমদানি করা। কিন্তু একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই, ঐতিহ্যময়ী লোকসংস্কৃতির পীঠস্থান পুরুলিয়া জেলায় প্রচলিত ‘সাধু গান’ এবং ‘নির্গুণ ঝুমুর’ সংগীতের সঙ্গে বাউল গানের নিকট আত্মীয়তা সহজেই ধরা পড়ে। বাউল সংগীতের ক্ষেত্র বহু বিস্তৃত। সহজ সাধনের কথা তার উপজীব্য বিষয়। প্রধান উদ্দেশ্য সহজিয়া মত প্রচার। পুরুলিয়া জেলায় প্রচলিত সাধুগানের উদ্দেশ্যও অনুরূপ। নিঃসংকোচে বলতে পারি এই দুই ভিন্ন সম্প্রদায় একই ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। উভয়ের মধ্যে গঠন প্রণালী ও বর্ণনায় সামঞ্জস্য দেখা গেলেও বাউল গানের সুর এবং নৃত্যে সাধুগন এবং নির্গুণ ঝুমুরের সঙ্গে একটা সুস্পষ্ট ভেদরেখা লক্ষ করা যায়। উভয় গানের গঠন-শৈলী বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাউল গানে প্রথমেই ধুয়া থাকে। আবার বহুক্ষেত্রে বাউল সংগীতের দ্বিতীয় চরণে ধুয়া এবং গানের শেষাংশে তার পুনরুক্তি ঘটে। কখনও দুই চরণ বা তদতিরিক্ত চরণের পরে এমন একটি চরণ রচিত হয় যার শেষাক্ষরের সঙ্গে ধুয়ার শেষাক্ষরের মিল থাকে এবং সেই চরণটি গাওয়ার পরই ধুয়া গাওয়ার রীতি সুবিদিত। সাধুগান এবং নির্গুণ ঝুমুরের অধিকাংশই একই প্রণালীতে রচিত হওয়ার ফলে বাউল গানের সঙ্গে একটা অলিখিত সাযুজ্য লক্ষ করার বিষয়। রচনা কৌশলে উভয়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর। উভয়ের মধ্যে হেঁয়ালি বা সান্ধ্যভাষার প্রয়োগ লক্ষণীয়।
