মারফতি বিচার কর বসিয়ে শরীয়তের কোলে—
ষাইট হাজার গোপনের কথা নিষেধ করেছে রসুলে।
ফকিরের এই বাচনিক ভাষ্য তথা কথকতার তোড়ে পাঠকরা ভেসে যাবেন, তাই মাঝখানে থেকে আমাদের দুয়েকটা কথা বলতে হবে। নইলে সব গুলিয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম বিশ্বাসে বলা হচ্ছে আল্লার রসুল মহম্মদের সঙ্গে মেহরাজে (শুন্যের এক কল্পিত উচ্চস্তর) আল্লার কিছু গূঢ় কথা হয়েছিল। সেই গূঢ় কথার মধ্যে তিরিশ হাজার কথা প্রকাশ্য। বাকি ষাট হাজার কথা রসুল গোপন রেখেছিলেন। সেটাই নাকি ফকিররা পেয়ে গেছেন সিনায় সিনায়। এখানে আবার কূটকচালি কথা আছে একটা। লালন কূট প্রশ্ন তুলেছেন:
মেয়ারাজের কথা শুধাব কারে
আদমতন আর নিরূপ খোদা
নিরাকারে মিলে কী করে?
এখানে আদমতন মানে মানবদেহধারী মহম্মদ রসুল। তাঁর সঙ্গে নিরূপ নিরাকার খোদার দেখা বা মিলন কী করে হতে পারে? লালন অব্যক্ত ইঙ্গিতে বলতে চান আল্লা নিরাকার নন, তাঁকে দেখা যায়। এ তো ভয়ংকর ইসলামবিরোধী উচ্চারণ। কিন্তু লালনকে প্রতিহত করা কঠিন। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় হল:
খোদা প্রাপ্তি মূল সাধনা
রসুল বিনা কেউ জানে না।
জাহের বাতিন উপাসনা
রসুল দ্বারায় প্রকাশিলে।
লালন একেবারে মূল তত্ত্বটা বলে দিলেন এই চার পঙ্ক্তিতে। অর্থাৎ, কিবা মোল্লা মৌলবি, কিবা ফকির দরবেশ, খোদাপ্রাপ্তি হল সকলেরই মূল লক্ষ্য। সাধনা মারফত সেই প্রাপ্তির পথ রসুলই জানেন শুধু। সেই পথ দু’রকমের— জাহের আর বাতুন। রসুলের দ্বারাই সেই দুই পথ বাতলেছেন খোদ আল্লা।
কথাটা মেনে নিলে গোলমাল মিটে যায়। ফকিরদের এটা মানতে আপত্তি নেই, কারণ কথাটা তাদেরই, কিন্তু নৈষ্ঠিক মুসলমান এমন কথা মানবে কেন? তাঁদের মনের যে ক’টি অটল বিশ্বাস বা ‘আকীদা’ আছে তার মধ্যে একটাকে বলে ‘ঈমানে মোফাছ্ছল’। তাতে বলা হয়: আমি আল্লাকে, তাঁর ফেরেস্তাগণকে, তাঁর প্রেরিত যাবতীয় কিতাব, তাঁর প্রেরিত সমস্ত পয়গম্বরকে মান্য করি।
এই আকিদা বা বিশ্বাসের খেলাপ করা চলে না কোনও ইমানদার মুসলিমের পক্ষে। তার নিজেরই তো বিশ্বাস যে আল্লার প্রেরিত কিতাব (অর্থাৎ কোরান) পবিত্র ও প্রশ্নাতীত ও মান্য। তবে সে কেতাবের বাইরে গোপন নির্দেশ মানবে কেন? দশ পারা বাতুনী নির্দেশের যাট হাজার কথা তার পক্ষে বর্জনীয় শুধু নয়, অবিশ্বাস্য ও ধিক্কারযোগ্য। কিন্তু ফকিরদের জোর ওই জায়গাতেই। তাদের গানে বলা হচ্ছে:
নবীহজে মে’রাজে যেদিন যায়
সেদিন খোদার সাথে আশকেতে কত কথা হয়।
সেদিন নব্বই হাজার কালাম হল
খোদা তিনরকমের হুকুম দিন—
দলিলে প্রমাণ হল মিথ্যা কথা নয়।
কতেক ছিনায় কতক ছপিনায়
আবার কতেক গায়েব রয়।
এই পর্যন্ত পড়লে বোঝা যায় মেহরাজে নবির সঙ্গে খোদার কথাবার্তায় ফকিরদের সংশয় নেই। তবে তাদের ধারণা যে, খোদা সেদিন যে নব্বই হাজার কালাম দিয়েছিলেন তার তিনরকম বিলিব্যবস্থা হয়েছিল। যথা ‘সিনা’ বা হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চারিত, ‘সফিনা’ বা গ্রন্থে নির্দেশিত এবং ‘গায়েবি’ বা অদৃশ্য উধাও। এবারে শোনা যাক হিসেব নিকেশ। সেটা হল:
পহেলা কালাম তিরিশ হাজার তুমি জারি করবে
উম্মতের পর—
করে খবরদারি হুঁশিয়ারি যেন বেতরিক না হয়।
আর তিরিশ হাজার বলি তবে তুমি ব্যক্তিবিশেষে জানাবে
ছিনার ভেদ না জানিলে মিথ্যা সাধন হয়।
আর তিরিশ হাজার বাকি রইল খোদা ফুরকানে তা রেখে দিল
ভেদাভেদ কেউ না পেল এহি দুনিয়ায়—
বাহার কইছে নাচার পীর পয়গম্বর তারাও ভেদ না পায়।
এই পদ বাহার ফকিরের রচনা— যাঁর ভাবনায় একটা নতুন কথা জানা গেল যে খোদার প্রথম তিরিশ হাজার কালাম প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট। পরবর্তী তিরিশ হাজার ব্যক্তিবিশেষের মাধ্যমে বিকশিত হবে তবে হৃদয়ের গূঢ় গুপ্ত রহস্য না জানলে তার ব্যঞ্জনা ব্যর্থ হয়ে যাবে। শেষ তিরিশ হাজার বাণী খোদা স্বতন্ত্র করে রেখে দিয়েছেন বলে এই পৃথিবীর কেউ তার রহস্য ভেদ করতে পারেনি, এমনকী পির পয়গম্বররাও নয়।
এ ধরনের কথাবার্তা বা ধ্যানধারণা ফকিরদের সঙ্গে মিশলে নিয়তই জানা যায় এবং এ ব্যাপারে ফকিরে ফকিরে কিছু মতভেদও দেখেছি। তার কারণ যে যেমন মুর্শেদের কাছে দীক্ষিত সে তেমন ভাবনা ধারণা নিয়ে থাকে। তবে এটা দেখেছি যে, কোনও কোনও, উপলক্ষে যখন ফকিররা সমবেত হন কোথাও, তখন নানা বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা তর্কবিতর্ক হয়। সেই প্রসঙ্গে লাগসই গান গেয়ে থাকেন তাঁরা। কোরানের নানা আয়াত তাঁরা আওড়ান ও ব্যাখ্যা করেন কিন্তু সেই ভাষ্য শরিয়তি ভাষ্যের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তবে সব মিলিয়ে এটা বোঝা যায় যে ম্লান পোশাক আর অতি সাধারণ জাঁকজমকহীন জীবনযাপনের অন্তরালে ফকিরদের অন্তর্জীবন এতটাই উদ্দীপ্ত ও শান্ত যে বাইরের বাসনাময় আহ্বান তাঁদের টানে না।
তার মানে তাঁরা একটা অন্তরের সত্য পেয়ে গেছেন, একটা স্থির প্রত্যয়, যার জন্য তাঁদের মধ্যে অটল বিশ্বাসের বনিয়াদ গড়ে উঠেছে। বীরভূমের ফকিরডাঙা থেকে দায়েম শা-র যে ক’টি ফকিরি গান আমি সংগ্রহ করেছিলাম এখানে তার থেকে একটা উদ্ধৃত করছি ফকিরদের সেই দ্বিধাহীন বিশ্বাসের বনিয়াদটা স্পষ্ট করে বোঝাতে। এ ধরনের গানে বাউল গান রচনার দক্ষতা, অন্ত্যমিলের বয়ন ও ধ্বনিসাম্য ততটা নেই, কিন্তু বলার কথাটা স্বচ্ছ। যেমন:
