ফকিরদের মধ্যে গান রচনার ঝোঁক কম। তাদের নিজেদের জীবনযাত্রার নানা সমস্যা, দারিদ্র্য ও ভিক্ষাজীবিতার চাপে গান লেখার মতো শান্ত আত্মস্থ অবকাশ কম থাকে। মুর্শিদাবাদ জেলা এদিক থেকে বেশ ব্যতিক্রমী। সেখানে আলেপ সর্দার, বাহার কিংবা নৈমুদ্দিনের মতো সজীব মনের রচয়িতাদের গানে যেমন ভাব তেমনই ভাষার বাঁধুনি। নদিয়ার আজহার খাঁ ফকিরের লেখা প্রচুর গান আছে। বীরভূমে বেশ কিছু ফকিরি গান পাওয়া গেছে যা সাম্প্রতিক কালের রচনা। কবু শাহ নামে এক গায়ক ফকিরের কণ্ঠ থেকে তেমন কিছু গান সরাসরি যন্ত্রে তুলে নিয়েছেন রাজ্য সংগীত একাডেমির গবেষক কঙ্কন ভট্টাচার্য। তাঁর সংগ্রহ থেকে কয়েকটি গান এখানে উদ্ধৃত করবার বিশেষ প্রয়োজন। তা থেকে বীরভূমের হালের ফকিরি গান সম্পর্কে খানিকটা ধারণা হবে। প্রথমে যে গানটি উদাহরণীয় তার বাণী:
পীর সালাম করি তব চরণে
আমি অবোধ শিশু রেখো যতনে।
একে একে করি সালাম যত পীর আস্থানে ॥
তারপরে করি সালাম আমি একিন মনে—
পাথরচাপুড়ির দাতা বাবা সেলাম তেনার চরণে
আজমীরের খাজা বাবা সেলাম তেনার চরণে
লাভপুরের ফুল্লরা মা সেলাম তেনার চরণে
বরঘাটের শামীদবাবা সেলাম তেনার চরণে
দুবরাজপুরের মামা-ভাগ্নে সেলাম তেনার চরণে
তারাপীঠের তারা মা সেলাম তেনার চরণে।
এঁকে খাটি ফকিরি গান বলা যাবে না—কিন্তু পথে ঘাটে গ্রামে হাটে ফকিররা এমন গান গায়। গানের মধ্যে ধর্মীয় উদারতা এবং হিন্দু মুসলমান ভেদরেখা মুছে বন্দনীয়দের প্রতি বন্দনা ধাবিত হয়েছে। ভুগোল বা নিজস্ব পরিবেষ্টনীর বেড়া ডিঙিয়ে এ-গান এক নিশ্বাসে উচ্চারণ করে স্থানীয় পাথরচাপুড়ির দাতাবাবা আর আজমীর শরীফের খাজা মইনুদ্দিন চিস্তিয়ার মহত্ত্ব। বীরভূমের চারটি স্মরণীয় ও অর্চনীয় স্থান গানে জায়গা করে নিয়েছে— লাভপুরের ফুল্লরা, বরঘাটের শামীদফকিরের থান, দুবরাজপুরের মামা-ভাগ্নে পাহাড় এবং তারাপীঠের তারা মা-র মন্দির। এ ধরনের গান যে-ফকির প্রকাশ্যে গেয়ে বেড়ায় তার জনাদর দেখার মতো। সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ, হাটের মানুষ দোকানদার ও গৃহস্থ এমন গান শুনতে ভালবাসে, ডেকে ডেকে শুনতে চায়।
এর পাশে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা গান পাওয়া যাচ্ছে যার গীতিকারের নাম নেই কিন্তু গানের মধ্যে শরিয়তি সাধনার প্রসঙ্গ এসেছে। ইসলামে ‘নেকি’ (পবিত্র) আর ‘বদি’ (নোংরা) বলে দুটি কথা আছে। বদিকে বর্জন করার পরামর্শ দিয়ে বলা হচ্ছে:
ধুয়ে ফেল্গা মনের বদি
আল্লার সনে ভাই মিশবি যদি।
আল্লার সঙ্গে মিশে যাবার ইচ্ছা ঠিক শরিয়ত সংগত বাসনা হতে পারে না—ভাবনার মধ্যে মারেফতের ছাপ খুব স্পষ্ট। এরপরে বলা হচ্ছে:
পাঁচ কলমা নামাজের গুঁড়ো
রোজা রাখো নামাজ পড়ো
দিলেতে সবুর করো
একল তিরিশ ভাই মানো যদি।
এখানে তিরিশের উল্লেখ আসছে শরিয়তের তিরিশ পারা কোরানের জাহির অংশ। ফকিরদের বিশ্বাস আছে বাকি দশপারা বাতুনের প্রতি। গানের শেষটুকু বেশ মজার:
যেমন বান্দা বেহেস্তে যাবে
মেওয়া ফল ঝুঁকে পড়বে—
‘খাও খাও’ বলে বান্দার মুখে এসে লাগবে
খাওয়ার ইচ্ছা ভাই থাকে যদি।
ফকিরদের স্বর্গকামনা নেই, মানবদেহেই বেহেস্ত তাদের। কিন্তু নেকবান্দারা যখন স্বর্গে যাবে তখন স্বর্গীয় প্রাপ্তিফল বা মোক্ষ তাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। কিন্তু তখন কি সেই প্রাপ্তিফলের প্রতি আসক্তি থাকবে? এ হল ফকিরের সন্দিহান প্রশ্ন। একেবারে খাটি ফকিরিগান এবারে:
কেউ ছিল না বে-নমুনা
কুদরতে হয় তাহার আসন
বিষ্ণুরূপে ভাসিলেন আমার সাঁই নিরঞ্জন।
উঠিল একটা প্রেমধারা
তার উপরে বিম্বু খাড়া
আমি শুনতে পাইলাম আগাগোড়া।
ভাসিতে ভাসিতে বিম্বু তুফানের উপরে
ভাসিতে ভাসিতে লাগিল কুহুতরে
আল্লা নবী একাসনে যুক্তি করে মনে মনে
করিল রে জাহের বাতুন।
জাহের-বাতুনের উৎস কল্পনায় ভাবালুতাটুকু কী চমৎকার। এরপরের অংশ আরও মর্মগ্রাহী:
আগেকার বিম্বু বলিতেছিল লাইলাহা ইল্লাললাহ
পেছকার বিম্বু বলিতেছিল মহম্মদ রসুলুল্লাহ
দীনের নবীকে রাখো স্মরণ।
এইরকম ফকিরিগান কিংবা এর চেয়ে একটু উচ্চ ভাবের গান যাতে ভেদ (রহস্য)-য়ের কথা থাকে, তা বুঝতে গেলে ফকিরদের সঙ্গ করতে হয়। বাউল গানে খানিকটা সুবোধ্যতা থাকলেও ফকিরিগান বিচার বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।
তাই ফকিরদের কথা ফকিরদের কাছ থেকে শোনাই ভাল। তাঁদের সঙ্গে মৌলানা মৌলবিদের কী নিয়ে এত ধুন্ধুমার সেটা জানতে চাইলে তাঁরা যা বলবেন, সকলে প্রায় একই কথা বলবেন, তা এইরকম। বাচনিক ভঙ্গিতে বললে দাঁড়ায় এইরকম যে,
দেখুন, ফকিরি মত ইসলামের আগে থেকে ছিল। ধরুন, আল্লা যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করলেন সেই ইস্তক ফকিরি চলছে। তবে একটা হিসেবের ব্যাপার আছে। মোল্লা মৌলবিরা বলছেন, সাধারণ কোরানের হল তিরিশটা পারা, আর ফকিররা বলছেন চল্লিশটা। দশ পারার তফাৎ হচ্ছে। এই দশ পারা তো লিখিত নেই, সেটা রয়ে গেছে ফকিরদের কাছে বাতুন বা গোপন হয়ে। মুসলমানরা ঐ জাহির হওয়া তিরিশ পারা নিয়ে বাহ্য আচার আচরণে রয়েছেন। আমরা সেটা বর্জন করে গোপন দশপারা নিয়ে কাজ কারবার করি মুর্শিদের বায়েত হয়ে। এতেই ওঁদের যত রাগ।
আবার দেখুন মূল কোরানে আছে নব্বই পারা। তার তিরিশ পারা আলেমদের, দশ পারা হল ফকিরদের, হল গিয়ে চল্লিশ পারা। বাকি পঞ্চাশ পারার মধ্যে বিশ আছে আরশে, বিশ আছে কুরশে, আর কবরস্থানে আছে দশ। এই হল সাকুল্যে নব্বই পারা। এখন কথা হল নব্বই পারা কোরানের মধ্যে নব্বই হাজার কথা আছে। তার তিরিশ হাজার জাহির আর ষাট হাজার হল গিয়ে বাতুন। এবারে শুনুন গান কি বলছে। বলছে:
