মুর্শিদাবাদের এক ফকির আমাকে তাঁদের গোপন সাধনা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের ধর্ম স্যার, চোরের ধর্ম। কেন জানেন? সমাজের মধ্যে গ্রামের মধ্যেই চোর বাস করে, সকলের সঙ্গে মেলামেশা করে, কিন্তু লক্ষ্য থাকে চুরিদারির দিকে।’
—চুরিদারি কি?
—এই যেমন দোকানদারি, ব্যাবসাদারি, তেমনই কবিওয়ালাদের গাঁয়ে বলে, ‘লোকটা কবিদারি করে বেড়ায়।’ চুরির জীবিকা যার তার হল চুরিদারি। এই যেমন আমরা ফকিরি করি গোপনে, বাইরে সামাজিক ওঠাবসা, এমনকী মাঝে মাঝে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ি মসজিদে। কেউ কেউ সন্দেহ করে, যেমন চোরকে করে। এই দেখুন আমার চেহারা। কিছু বুঝছেন?
সত্যিই কোনও বাহ্যচিহ্ন নেই। দিব্যি সোনালি ফ্রেমের চশমা, ফিটফাট টেরিকটনের পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি, হাতে ঘড়ি। গানের আসরে নাকি গায়ক, আবার দক্ষ তবলিয়া। জমিজিরেত আছে। এইট পাশ। অন্তর্গোপন একটা হাসি হেসে বললেন, ‘আমাদের হল বাতেনি কাজ, মানে গোপ্ত—ব্যক্ত নয়। লালনের গানে আছে “শরিয়তের দলিল হইল মারফত বাতনে রইল”। তার মানে শরিয়ত দেখতে পাবেন, আমাদেরটা দেখতে পাবেন না। নাঃ, এ ব্যাপারে লালনের গানটা আপনাকে শুনিয়েই দিই, শোনেন।’
‘হোক, হোক—ফকির সাহেবের গান হোক’ সবাই মুখিয়ে উঠল। জায়গাটা হল জিয়াগঞ্জের ফুলতলার একটা চায়ের দোকান। দু’জনেই বসে আছি বহরমপুরের বাস ধরব বলে। কথায় কথায় আলাপ তার থেকে গোপ্ত ফকির নিজেই নিজেকে জাহির করতে চাইলেন গানের মধ্যে দিয়ে। এটাই হয়। ফকিররা তো ভীষণ গানপাগল। গানই যেন তাদের মরমের বাণী, যুক্তির শান দেওয়া, দ্যোতনাময়। বললাম, ‘সবাই আপনাকে ফকির সাহেব বলল যে? সেকথাটা তা হলে বাতনে নেই, জাহির হয়ে গেছে?’
‘বিলক্ষণ’, ভদ্রবেশধারী ফকির হেসে বললেন, ‘এসব দিকে অনেক ফকিরি গানের আসরে আমার গান শুনেছে তো ওরা। চেনে, বুঝলেন?’
—শুনেছি মুর্শিদাবাদে ফকিরদের মারে, একতারা কেড়ে নেয়, চুল কেটে দেয়?
—হ্যাঁ, দেয়। তবে অঞ্চলবিশেষে। সময় সময় ঘটে উত্তেজনা। মারপিট করে বই কী। তবে এদিকে ওসব নেই। এদিককার মুসলমানরা শান্তিপ্রিয়। তা ছাড়া আসলে গান-পাগল। গানের আসরে আবার শরিয়তি মারফতি কীসের? নাকি বলো হে তোমরা?
‘ন্যায্য কথা। গান হল গান—ধর্ম হল ধর্ম—আলাদা ব্যাপার।’ জনতার একজন বলে, ‘নিন, ওসব ভ্যানতারা রাখুন। ফকির মানুষ, ধরা পড়ে গেছেন যখন, গান একটা দুটো গাইতে হবে বই কী।’
—আর বাস এসে গেলে?
—সে পরের বাসে যাবেন। কেন বাড়িতে বিবি কি দানাপানি নিয়ে বসে আছেন? অপেক্ষা করে হেদিয়ে পড়ছেন নাকি গো ফকির সাহেব?
‘না। এবারে হেরে গেলাম। গিন্নি বিবি তুলে কথা? তা হলে শোনো বাবাসকল।’ বাবাসকল লালনের গানের তাৎপর্য কতটা বুঝলেন তা জানি না। আমাদের কথার পুরনো ধরতাই নিয়ে গোপ্ত ফকির একটা মুড়ির ক্যানেস্তারা টিনে তাল রেখে গাইলেন সেই মোক্ষম গানখানা, যার অন্তরা হল:
চোরে যেমন চুরি করে
ধরে ফেললে দোষে পড়ে
মারুফতি সেই প্রকারে
চোরা মালের তেজারতি।
সেইজন্যেতে কর গোপন
অনুমানে বুঝলাম এখন
লালন বলে এসব যেমন
মেয়েলোকের উপপতি।
সোনালি ফ্রেমের আড়ালে আমার দিকে ঝিলকিয়ে উঠল গায়কের দুষ্ট চোখের চাহনি। তারপরে গান চলতেই থাকল, বাস এল, গায়ককে শ্রোতারা ছাড়ল না, কিন্তু আমি বাসের জানলার ধারের নিরালা সিটে বসে, যেতে যেতে, গানটার প্রকাশ ক্ষমতার গভীরতা ভাবতে লাগলাম। গানের মধ্যে দিয়ে লালন মারফতি তত্ত্বের সারকথাটাই যেন বলে দিয়েছেন।
সত্যিই তো চোরের ধর্ম। আর চোরাই সামগ্রী যেমন গোপনে রেখে দিতে হয় লুকিয়ে, তেমনই দেহের কন্দরে লুকানো থাকে মারফতি সাধনা, তার চাবিকাঠি থাকে গুরু-মুর্শেদের হাতে। একেই তাই বুঝি গানে বলে, ‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে?’ লালনের উপমার উজ্জ্বলতাও কত দীপ্র। তন্ত্রের গোপ্য সাধনার বিষয়ে বলা হয়েছে ‘ইয়ন্তু শাম্ভবী বিদ্যা গোপ্যা কুলবধূরিব’—এই গুহ্য বিদ্যা কুলবধূর মতো গোপন রাখতে হবে। লালন আরও নিগঢ় ইঙ্গিতে বলছেন, স্ত্রীলোক যেমন উপপতিকে প্রচ্ছন্ন করে রাখে মনের গহনে, অথচ বৈধ স্বামীর সঙ্গে সংসার করে, মারফতি সাধনাও তেমনই প্রচ্ছন্ন কিন্তু বাইরে শরিয়তি মুখোশ। কুলবধূর উপমা যেন অনেকটা পরিবার আর সমাজকে ঘিরে কিন্তু স্ত্রীলোকের উপপতি নিতান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের আত্যন্তিকতা বোঝায়। উপপতি শব্দের সঙ্গে দেহগত ইঙ্গিত ও গোপন যৌনতার প্রশ্রয় আছে।
গানটা আগে শুনেছি কিন্তু এমন করে ভাবিনি। ভাবিনি, কারণ মারফতি আসলে তত্ত্বগান, তাই ভাঁজ খুলতে সময় লাগে, বয়স লাগে, বারবার শোনার অভিজ্ঞতা লাগে, তবে খোলে রহস্যের দরজা। এই ভদ্রবেশী ফকির যেমন একটুখানি ফাঁক করে দিলেন দরজা। মনে পড়ল আরেক ফকিরের কাছে শুনেছিলাম মারিফত মানে জ্ঞান। কীসের জ্ঞান? আল্লাকে প্রত্যক্ষ জেনে যে উপাসনা সেই সচেতনতাই হল প্রকৃত জ্ঞান। সুফিরা একেই বলেন, ‘আইনুল একিন।’ ‘মারিফতের কিস্তি’ বলে একটা বইতে লেখা আছে: শরিয়ত-তরিকত-হকিকত এই তিনধারার যে সাধনা তাতে হৃদয় মন থাকে কাচের মতো স্বচ্ছ, কোনও ছাপ বা প্রতিফলন পড়ে না। কিন্তু মারফতি পথে গুরুর নির্দেশ অন্তরে যেন পারা লাগিয়ে দেয় তখন মূল তত্ত্ব বা সত্যদর্শন তাতে ধরা পড়ে। মন তখন আর কাচ থাকে না, হয়ে ওঠে আয়না। লালন তাঁর খাঁচার পাখির গানে ‘আয়না-মহলের’ কথা বলেছেন। মারফতি গান সেই আয়না মহলের গুপ্ত স্বরলিপি।
