এই সংবাদ থেকে আরেকটা সত্য প্রকাশিত হচ্ছে: সমাজে আধা মুসলমান আর পুরো মুসলমান একসঙ্গে সহাবস্থান করত এবং আধা মুসলমানরা ফকিরপন্থার সূত্রে পির উপাসনায় উৎসাহী ছিল। এই পিরবাদ ইসলামের সমান্তরাল শক্তি ছিল। যারা পিরকে ভজনা করত তারা আল্লার কালাম বা কলেমায় বিশ্বাসী ছিল না। ইসলামিয়ায় সামিল হবার চেয়ে তাদের বেশি ব্যগ্রতা ছিল পিরের মুরিদ হবার। এটাও সত্য যে ইসলামি রীতিকৃত্যের খুঁটিনাটি সবাই জানতও না।
যাই হোক, সমাজে ফকিরদের পরাক্রম ও সংখ্যাধিক্য মৌলবাদীদের আশঙ্কিত করেছিল। তাঁরা ফকিরদের ‘ইসলামবিরোধী, শরিয়তবিরোধী, বেশরাহ, বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট’ বলেই ক্ষান্ত হননি, তাদের ‘শৃগালের ন্যায় বিতাড়িত করা উচিত’ বলে রায় দিয়েছেন। ‘জবাবে ইবলিস’ বইতে ফকিরদের সম্পর্কে কঠোরতম ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছিল:
ইহারা… কখনও শতচ্ছিন্ন কাপড় আলখেল্লা পরিয়া চিমটে হাতে ঘুরিয়া বেড়ায়; কখনও দেখা যায় মারেফতীর নামে ইসলামের কুট সমালোচনামূলক গান গাহিয়া বেড়ায়; আবার মন্ত্রপূত করিয়া মলমূত্রেরও সৎ ব্যবহার করিতে দেখা যায়। কখনও লোক দেখাইবার জন্য নামাজ রোজা করিয়া থাকে, আবার একতারা ডুগী তবলা বাজাইয়া গান গাহিয়া পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা করিয়া বেড়ায় এবং যৌন নিয়ন্ত্রণের কোন বালাই নাই।
অভিযোগের তালিকা ক্রমশ বাড়ছে। ইসলামের সমালোচনার গান মানে বিচারমূলক বিশুদ্ধ মারফতি ফকিরি গান, সেইসঙ্গে চারিচন্দ্রের সাধনা ও যৌন স্বাধীনতা—সবই আক্রমণের লক্ষ্য। ফকিরদের কাজকর্মকে ‘কুফরী’ (আল্লাকে অস্বীকৃতি) বলা হয়েছে। ইসলামের সঙ্গে ফকিররা ‘ফিৎনা’ বা ঝগড়াঝাঁটিতে লিপ্ত বলা হয়েছে। তারা ‘মুতখোর’ ‘নাপাক’ (অপবিত্র) আল্লার ‘লানৎ’ বা অভিশাপ তাদের শিরোধার্য এবং তাদের কার্যকলাপ ‘ছিরাতে মুস্তাকিম’ অর্থাৎ সহজ রাস্তা থেকে স্খলিত। তারা গোপনতায় (‘বাতুনী’) বিশ্বাসী বলে সন্দেহজনক ব্যক্তি।
ইসলাম মৌলবাদের চোখে দেখলে মারফতি ফকিরদের আর দোষের অন্ত থাকে না। কিন্তু ইসলামকে একেবারে অবিকল্প অনড় বলে যে চিরকাল ভাবা হয়েছে বা সবাই চোখ বুজে মান্য করেছে তাও নয়। প্রশ্ন, প্রতিপ্রশ্ন, বিচার, মতভেদ বরাবর চলছে এবং সেটাই প্রাণের লক্ষণ। প্রাচীন প্রথা ও অনুশাসন অন্ধভাবে অনুসরণ কবেই বা মানুষ করেছে? তাই ইসলামের বহুতর ওঠাপড়ার গূঢ় পাঠ নেওয়া দরকার। তাতে দেখা যাবে মুসলমানরা মূলত ইমানদার বা বিশ্বাসী। কীসে বিশ্বাসী? তাঁদের ধর্মের আকরগ্রন্থ কোরান ও হাদিসে বিশ্বাসী।
প্রথমদিকে ইসলামে খুব একটা মতভেদ ছিল না, আচরণে ছিল দ্বিধাহীন সাম্য। কিন্তু কালক্রমে শরিয়তের বিধান আর কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যান ও ভাষ্য নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে গড়ে ওঠে কিছু কিছু গোষ্ঠী বা ‘মজহাব’। প্রথম বিভাজন ঘটে শিয়া আর সুন্নিপন্থীদের। মুসলমানদের মধ্যে সুনিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সারা বিশ্বে একমাত্র ইরানে শিয়ারা সুন্নিদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি। সুন্নিদের মধ্যে, অন্তত বাংলায়, চারটি মজহাব। হানাফি, সাফি, হামবিলি ও মালেকি। এর বাইরে আছে আহলে হাদিস বা ফরাজি সম্প্রদায়, যারা হল লা-মজহাব বা কোনও মজহাবভুক্ত নয়। তারা শুধু কোরান ও হাদিসে বিশ্বাসী এবং কঠোরভাবে।
কোরান ও হাদিস ছাড়াও ইসলামে আরও দুটি নির্দেশিকা আছে, যা অনেকটা অন্যরকম। তার একটা হল ‘ইজমা ই উম্মত’ অর্থাৎ মহাজনদের দেখানো পথ, আরেকটা হল ‘কিয়াস’ অর্থাৎ ব্যক্তিগত অনুভব বা চিন্তাভাবনা। একজন মুসলিমের জীবনে কোনও গুরুতর সমস্যা এলে সে প্রথমে কোরানের নির্দেশ দেখবে, তাতে সমাধান না হলে দেখবে হাদিস কী বলছে। হাদিসেও যদি হদিশ না মেলে তখন ইজমা বা কিয়াস সমাধানসূত্র দিতে পারবে। এতে বোঝা যায় শরিয়ত মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিচার বিশ্লেষণ ও মহাজনপন্থাকে বর্জন করতে বলেনি। তা হলে ফকিররা কী দোষ করলেন? তাঁরা মারেফতপন্থী অর্থাৎ শরিয়তের বহিরঙ্গ নির্দেশকে গুরুত্ব দেন না। তাঁদের একটা কথা হল আল্লার অনুভব হতে পারে ‘সিনা’-য় অর্থাৎ হৃদয় দিয়ে, ‘সফিনা’-য় অর্থাৎ শাস্ত্রগ্রন্থ মাধ্যমে নয়। তাই অন্তরঙ্গ অনুশীলনই মারেফত। ‘সাধারণ প্রথাগত শাস্ত্রীয় পথে মানসিক শান্তি, আত্মগত জ্ঞানলাভ, আত্ম-উৎসর্গ ও আত্ম-সংযম সম্ভব নয়।’ তাই শরিয়তকে পেরিয়ে তবে মারেফতে পৌঁছতে হয়। মারেফত মানে প্রকৃত জ্ঞান, যার নির্দেশ জাহেরি কোরানে নেই, আছে অতি গোপনে। সেটা জানতে হয় মুর্শেদের কাছে দীক্ষা নিয়ে। সেই জ্ঞান শাস্ত্রপথে আসেনি, চলে আসছে বহুকাল থেকে সিনায় সিনায়। মারফতি ফকিরদের আলেমরা সহ্য করতে পারেন না, তার কারণ, মারফতিরা শরিয়তকে চরম বা পরম বলে মানেন না— আরও এগোতে চান আত্মদীপনের গহন পথে। সেই দীপন বা দর্শন তো মানুষকে দেখানো যায় না, উপলব্ধি করতে হয়। ব্যাপারটির সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা লালন চমৎকার বুঝিয়েছেন,
শরিয়ত আর মারফত যেমন
দুগ্ধেতে মিশানো মাখন।
মাখন তুললে দুগ্ধ তখন
ঘোল বলে তা জানে সবাই।
শরিয়তের মধ্যেই অন্তঃশীল হয়ে আছে মারেফত, যেমন দুধের মধ্যে মাখন। কিন্তু মাখন তুলে নিলে দুধ যেমন মূল্যহীন ঘোলে পরিণত হয় তেমনই মারফতি তত্ত্বে নিষ্ণাত হলে শরিয়ত হয়ে পড়ে নগণ্য।
