হাজারে একজন যেত পাঠার্থী হয়ে এবং সেই পাঠ তার অর্ধাংশের কাছে থেকে যেত অসম্পূর্ণ। কারণ দু’-চার পাঁচ ক্রোশ অন্তর হয়তো ছিল একটি বিদ্যালয়, মক্তব আরও কম। গ্রামে শিক্ষকই বা কই? আর ছিল সীমাহীন দারিদ্র্য। কাঙাল হরিনাথের মতো মেধাবী ছাত্র ‘পান্তাভাত, জামীরের পাতা আর লবণ’ খেয়ে পাঠশালাতেই পাঠ সাঙ্গ করতে বাধ্য হন সেকালে। আহমদ শরীফ আরেকটা জরুরি মন্তব্য করে বলেছেন:
কলকাতার, মুর্শিদাবাদের এবং অন্যত্র নিবসিত উর্দুভাষী শিক্ষিত অভিজাত মুসলিমরাই নিজেদের বাংলার মুসলিম বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন প্রমাণ দেওয়ান খান বাহাদুর ফজলে রচিত গ্রন্থ (Origin of the Mussalmans of Bengal 1895) এবং নবাব আবদুল লতিফের লিখিত উক্তি। লতিফ বাংলাভাষী দেশজ মুসলিমদের ‘ছোটোলোক’ মুসলিম বলেই জানতেন।
শুধু আশরাফ-আতরাফ ভেদ নয়, অর্থনৈতিক তারতম্য, বৃত্তিবদ্ধতা, অশিক্ষা এবং ভাষাগত ব্যবধানও উনিশ শতকের শেষ দশকে প্রকট হয়ে উঠছিল। ভদ্রলোক-ছোটলোক বিন্যাস ব্যাপারটি চুড়ান্তভাবে ইসলামবিরোধী। এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে ফকিররা এগিয়ে এসে গ্রামীণ জনতাকে দীক্ষিত করতে শুরু করলেন মানবিক মন্ত্রে ও সুবোধ্য বাংলা গানের জাদুস্পর্শে। ফকিররা নিজেদের মুসলমান বলেই পরিচয় দিতেন এবং জনসমাজে মিশে গিয়ে ক্রমে ক্রমে তাদের মারফতি তত্ত্বে শিক্ষিত ও মুর্শেদ-ভক্তে পরিণত করতেন। শরিয়ত-তরিকত-হরিকত সব পথের কথা বলেও শেষ আশ্রয় যে মারফত তা বোঝাতেন। লৌকিক ঢঙে গ্রাম্য ভাষায় বোঝাতেন শরিয়ত হল গাছ আর মারফত ফল। ফল পেতে গেলে তো গাছে উঠতেই হবে। কিন্তু ওই পর্যন্তই, এবারে বলো তো গাছ খাব না ফল খাব? এসব লোক লৌকিক প্রত্যক্ষ ব্যাপক প্রচারের পাশে মোল্লা মৌলবিদের সংখ্যা আর কত ছিল সেই ব্রিটিশ রাজত্বে? তা ছাড়া আহমদ শরীফের যুক্তিতে,
কোরআন-হাদিস অনুগ বিশুদ্ধ ইসলাম বিশ্বাসে ও আচরণে মানা সম্ভবও ছিল না দুটি কারণে। প্রথমত, শাস্ত্র ছিল আরবি ভাষায় লিখিত, বিদেশীর বিভাষা আয়ত্ত করা বিদ্যালয়-বিরল সেই যুগে ক্বচিৎ কারুর পক্ষে সম্ভব ছিল, আলিম মৌলবী আজও সর্বত্র শত শত মেলে না। দ্বিতীয়ত, স্থানিক কালিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে পরিবেশে মানুষ আশৈশব লালিত হয়, তার প্রভাব এড়াতে পারে না। শাস্ত্রীয় গোত্রীয় ও স্থানীয় ঐতিহ্যের আচারের, সংস্কারের মিশ্র ও সমন্বিত প্রভাবেই মানুষের মন-মনন-আচার-আচরণ নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে বাঙালির ধর্ম সাধারণভাবে বিশুদ্ধ ‘ইসলাম’ নয়,—মুসলমান ধর্ম যাতে রয়েছে যুগপৎ শরীয়ত ও মারফত, কোরআন-হাদিসের পাশে পির-দরবেশ-দরগাহ, মন্ত্র, মাদুলি, তাবিজ, দোয়া, ঝাড়-ফুঁক-তুক-তাক।
এতক্ষণে আমরা স্থিত হতে পারলাম খাঁটি বাঙালি মুসলমানদের মন আর মর্জির চেহারায়। বাঙালি জাতি হিসেবেও মিশ্র, ধর্মবোধেও মিশ্র। এদেশে বিশুদ্ধ ‘ইসলাম’ ধর্ম যেমন নেই, বিশুদ্ধ ‘হিন্দু’ ধর্মও কি আছে? তাতে বৌদ্ধতান্ত্রিক-যোগীদের সংযোগ আছে। বৈদিক সংরাগ যেমন আছে, তেমনি আছে বেদবিরোধী চেতনা। সেই সঙ্গে বৈষ্ণব অনুষঙ্গও উপেক্ষণীয় নয়। ফকিরি মতেও সহজিয়া বৈষ্ণব সাধনার ধারা মিশে গেছে। এমনকী বাঙালি চিত্ত এমনই উদার ও সমন্বয়ী যে বাংলা ভাষায় মুসলমান গীতিকাররা লিখেছেন বৈষ্ণব পদ ও শাক্তগীতি। তার জন্য আলেম মোল্লারা কোনওদিন তাঁদের, এমনকী ধর্মান্ধ মধ্যযুগেও, কোতল করেননি বা ‘মুশরেক’ বলে গান দেননি। ফকিরদের ক্ষেত্রে তবে কেন এত নিপীড়ন ও হুমকি? কেন এত আখড়া জ্বালানো আর একতারা ভাঙা! তার কারণ তারা দরিদ্র ও অসংঘবদ্ধ, তাদের পেছনে নেই উদার মধ্যবিত্তের সমর্থন ও রাজশক্তির আনুকূল্য। তারা শুধু নির্জন একক।
উনিশ শতকের শেষ দশকে লালন ফকিরের প্রয়াণ ঘটলেও ফকিরিপন্থার অবসান ঘটেনি, বরং দ্বিগুণ তেজে গানে গানে তা বাংলার গ্রামে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, জালাল, রশিদ, হাসন রজা থেকে শুরু করে ফুলবাসউদ্দিন, নসরুদ্দিন, শীতলাং শাহ হয়ে বিশ শতকের প্রথম দু’দশক ফকিরি গানে সমাচ্ছন্ন ছিল। সেই বাড়বৃদ্ধি দেখেই ১৯২৫ সালে রেয়াজউদ্দিন রংপুর থেকে ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ প্রকাশ করে ইসলাম রক্ষণের জিগির তুলেছিলেন। বইটির নাম ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’, কিন্তু আক্রমণের লক্ষ্য ফকিররা, কারণ সেসময় বাউল ও ফকিররা ছিল সমার্থক। বইটির উদ্দেশ্যই ছিল ফকিরিপন্থার উচ্ছেদ। কারণ, এই ফকিররা,
ভিতরে অমোছলমান, বাহিরে মোছলমানী নামে নাম, মোছলমান মহল্যায় বাস, মোছলমান কন্যাগণের সহিত বিবাহসাদী ও মোছলমানের সকলপ্রকার সামাজিকতায় ভুক্ত। এই অপরিচিত অপ্রকাশ্যভাবে ইহাদের মোছলমানের সহিত মেলামেশার ফলে দলে-দলে অশিক্ষিত মোছলমান ইহাদের ধোকাবাজী বুঝিতে না পারিয়া সনাতন এছলাম ধৰ্ম্মকে ও পবিত্র কোরআনকে ত্যাগ করতঃ কাফের মোরতেদ হইয়া যাইতেছে।
রেয়াজউদ্দিনের মতো হাজী মৌলবিদের দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনার সঠিক কারণটা এবার বোঝা গেল। দলে দলে ধর্মত্যাগের ঘটনা কট্টর ধর্মনিষ্ঠদের পক্ষে অসহনীয় হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। সেইসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে বেশরা ফকিররাও খুব দুর্বল ছিল না সেসময়। খবরে দেখা যাচ্ছে আফজল আলী নামে একজন শরিয়তবাদী মুসলিম নেতা বেশরাদের ভয়ে গ্রাম ত্যাগ করে ভিন গাঁয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ‘তবু পীর রুস্তম শাহের নামে আধা মুসলমানদের পুরো মুসলমানে রূপান্তরিত করার আশা ছাড়েননি।’
