এ দেশে জাত বাখানো সৈয়দ কাজী দেখিরে ভাই
যেমন বঙ্গদেশের ব্রাহ্মণ সবাই।
ব্রাহ্মণের দেখাদেখি
কাজী খোন্দকার পদবী রাখি
শরীফি কওলায় ফাঁকি দিয়ে সর্বদাই।
জোলা কলু জমাদার যারা
ইতর জাতি বানায় তারা
এই কি ইসলামের শরা
করিস তার বড়াই?
গানের মধ্যে যুক্তিজালের ঠাস বুনোট। মারফতি ফকিরদের পক্ষ নিয়ে দুদ্দু শাহ-র মর্মান্তিক প্রশ্ন : ওহে সব শরাওয়ালা ইসলামি ধর্মধ্বজী, ব্রাহ্মণদের দেখাদেখি মুসলমান সমাজে যে উচ্চনীচ ইতরভদ্র ভেদাভেদ আমদানি করেছ তা কি শরিয়ত সঙ্গত? তারপরের প্রশ্নটি সাংঘাতিক, সেটা রয়েছে আরেক গানে :
এ দেশের মুসলমানে বড়াই করে
আমরা বাদশাই জাতির খান্দান রে।
সহস্র বৎসর পূর্বে ভাই
মুসলমানের গন্ধ দেখি নাই
যত অনার্য শূদ্র ওরাই
ধর্ম ভারত হয় রে।
এ একেবারে মূল ধরে টান। এদেশে হাজার বছর আগে মুসলমান ছিল না। দেশের আদি ভূমিপুত্র অনার্য আর শূদ্ররাই। ফকিররা তাদেরই অনুযাত্র। ব্রাহ্মণরাও যে বহিরাগত তার ইঙ্গিত অবশ্য নেই। তবে সব লোকায়ত ধর্মই নিজেকে বেদবিধিছাড়া বলে ঘোষণা করে।
ফকির পন্থার উদ্ভবে সুফিতত্ত্বের প্রেরণা থাকতে পারে এমন কথা প্রায় সকলেই বলেছেন। কিন্তু ফকিররা যে আচার-আচরণে ততটা ইসলামনিষ্ঠ নন তার কারণ কি শুধুই প্রতিবাদ বা জাতিভেদ জাত অবিচার? ভেবে দেখা দরকার নেই কি যে, একেবারে অজ গাঁয়ে অশিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষের নিম্নস্তরে শরিয়তের নীতি নির্দেশ কতটা পৌঁছানো সম্ভব এবং কাদের দ্বারা? পক্ষান্তরে এ তথ্য জানা যায় যে, সুফিপন্থীরা ও সাধকরা পদব্রজে ঘুরে বেড়াতেন সর্বত্র। তাঁদের বাণী ও উপদেশ অনেক ব্যাপ্ত ছিল। ফকির, দরবেশ, মিসকিনরা তো স্বভাবেই ভ্রাম্যমাণ। তাঁদের জমিজমা ছিল না, তাই জমির টানে কোথাও স্থায়ী বাস্তু স্থাপনের নেশায় ছিলেন উদাসীন। ভিক্ষাজীবী, তাই সাধারণ মানুষের অন্দরমহল পর্যন্ত তাঁদের যাতায়াত ছিল। সেই সঙ্গে রোগ আরোগ্যের নানা টোটকা জড়িবুটি থাকত ঝোলায়। জাদু শক্তির একটা আলাদা জোর বরাবর আছে অনুন্নত সমাজে। আবদুল ওয়ালী লিখেছেন উনিশ শতকের গ্রাম্য ফকিরদের বিষয়ে যে, এরা পাকা চিকিৎসক। সাধারণ চিকিৎসকের কেরামতি যেখানে কূল পায় না সেখানে এরা রোগ সারিয়ে তোলে। আর এই বিদ্যাকে কাজে লাগিয়েই এরা শিষ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ধরা যাক, কোনও ফকিরের এক শিষ্য দেখল, কোনও মানুষ কঠিন রোগে ভুগছে। সেই শিষ্য তখন রোগগ্রস্ত ব্যক্তিকে কিছু উপদেশ এবং সম্ভবত জড়িবুটিও দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গান ও প্রার্থনা করতেও শেখানো হয়। রোগী সুস্থ বোধ করতে শুরু করলে তার ভক্তি ও বিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন গুরু বা মুখ্য ফকিরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ‘সাধুসেবা’ দেওয়া হয়। রোগীর সাধ্য অনুযায়ী কিছু লোককে আপ্যায়িত করা হয়। এইভাবে শিষ্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
লালন ফকির এমন রোগ সারানোর নিদান বাতলাননি কোনওদিন কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন বহু জায়গায়। তাঁর নাকি বিশ হাজার শিষ্য বা বায়েদ ছিল। হতেই পারে, কারণ তিনি ছিলেন দিব্যজ্ঞানী ও উচ্চস্তরের ভাবসাধক গায়ক। তিনি যে ভাল গাইতে পারতেন এবং বাইরে গিয়ে গাইতেন নিজের লেখা গান তার লিখিত প্রমাণ রয়েছে জলধর সেনের জবানিতে। গানের শক্তি অপরিসীম, তাই তাঁর গানেই যে বহু মানুষ বশ হয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। বাউল ফকিররা তাঁর সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গানের চাবি দিয়ে কেবলই খুলে চলেছেন মানুষের মনের তালা। কোরানের আয়াতের আরবি ভাষার চেয়ে বাংলা গানের বাণী অনেক সরাসরি ও অন্তরস্পন্দী।
এ ছাড়া আহমদ শরীফের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় কেন গ্রাম সমাজের মানুষ আগেকার দিনে ব্যবহারিক ইসলামের চেয়ে ফকিরি মতের দিকে ঝুঁকেছিল। তার হিসেব অনুসারে দেখা যায় ১৮৭১ সাল নাগাদ অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষদিকে উভয়বঙ্গে শতকরা বত্রিশজন মুসলমান ছিলেন। এঁদের এবং
এঁদের বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ্য সমাজভুক্ত জ্ঞাতিদেরও কোনো লেখাপড়ার অধিকার ও ঐতিহ্য ছিল না। সুনির্দিষ্ট বৃত্তিজীবীতে বিভক্ত ও বিন্যস্ত সমাজে পেশান্তরের সুযোগ-সুবিধেও ছিল বিরল, তাই বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম সমাজে বৃত্তি ও অর্থসম্পদগত দুঃস্থতার দুরবস্থার এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত পরিবর্তন ছিল দুর্লক্ষ্য।
সমাজ প্রগতির সবচেয়ে বড় লক্ষণ হল জ্ঞানচর্চা আর বিদ্যালাভের অধিকার তথা পারিপার্শ্বিক সুযোগ। নবাবি শাসনে ও ব্রিটিশ রাজের আমলে গ্রামের মানুষের সে সুযোগ ও অধিকার ছিল না এবং সবচেয়ে যেটা ক্ষতিকর সেই সমাজে বৃত্তিত্যাগ বা জাতিবৃত্তি ছেড়ে অন্যতর জীবিকার জীবনে যাবার বিকল্প ছিল না। ভাগ্যবাদী সব মানুষ অন্ধ শাস্ত্রশাসনের দাপটে আর কুসংস্কারের তামসে আবদ্ধ ছিল। তাই বাঙালি হিন্দু মুসলমান বা অন্য ধর্মীদের আর্থিক দুরবস্থা ও সমাজ অবস্থানের কোনও ফেরফার হত না। এর মধ্যে যুক্তিতর্কের অবকাশ, শাস্ত্র-কোরান-পুরাণ ব্যাখ্যানের মতো মুক্ত মনন অর্জন, প্রতিবাদী চেতনা গড়ে উঠতে পারে কি? সাধারণ মানুষ তাই উদরপূর্তি আর অন্ধকার জীবনকেই মেনে নিত। কেবল, শরীফের তথ্য অনুযায়ী,
কেনা-বেচা, জমি-জমা সংক্রান্ত হিসেব নিকেশের প্রয়োজনবোধে এবং কোরআন পড়ার ও নামাজ-রোজা সম্বন্ধীয় আবশ্যিক নীতি-নিয়ম-রীতি-পদ্ধতি জানার-জানানোর গরজ-চেতনা বশে কেউ কেউ সন্তানকে বিদ্যালয়ে মক্তবে পাঠশালায় পাঠান। এমন লোক হয়তো ছিল হাজারে একজন।
