এই জায়গাটাই ফকিরিয়ানার উৎস। অপ্রত্যক্ষ আল্লার বদলে মুর্শেদ, শরিয়তের আচার মার্গের বদলে মারিফতের ভাবমার্গ, নামাজের বদলে গান, মসজিদের বদলে নিজদেহ, কোরানের বদলে দেলকেতাব। এর পাশে সমাজে আরেকটা চোখে-আঙুল-দিয়ে-দেখানো ভেদবাদ ছিল। যাকে বলা চলে মুসলমানের জাতিভেদ। বাউল ফকিরদের নিয়ে যাঁরা প্রত্যক্ষ গবেষণা করেছেন তাদের অনুধাবন এইরকম যে,
ক) এরা মূলত এক ছোটখাটো ধর্মগোষ্ঠী এবং গোষ্ঠীসংগঠনের মূলে রয়েছে স্পষ্ট প্রতিবাদী মনোভঙ্গি। এই প্রতিবাদ গড়ে উঠেছে জাতিভেদ থেকে। সমাজে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে তারা নিজেরাই এক ক্ষুদ্র সমাজ গড়ে নিয়েছে। তার মানে হিন্দু আর মুসলমানদের বৃহত্তর সমাজ কাঠামোর ভেতর ভেতর রয়ে গিয়েছিল বর্ণবৈষম্য, তারই প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতন্ত্রের সূচনা। অভিজাত মুসলমান আর নবাব বাদশাদের প্ররোচনায় সেখ সৈয়দ মোঘল পাঠানরা মুসলমান সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে ও বর্ণে স্থাপিত হন অন্যপক্ষে এ দেশের অগণিত ধর্মান্তরিত মুসলিম নিম্নশ্রেণিভুক্ত হয়ে পড়েন।
খ) তত্ত্বগতভাবে অবশ্য ইসলামে জাতিবর্ণভেদ থাকার কথা নয়, তবে বাস্তবে অন্তত গ্রামিক সমাজস্তরে শ্রেণিভেদ প্রত্যক্ষ। সেই ভেদের চেহারায় ধরা পড়ে যে ‘আশরাফ’ বলতে উচ্চবর্ণ আর ‘আতরাফ’ বলতে নিম্নবর্ণ বোঝায়। আশরাফ বা শরীফ আদমি তাঁরাই যাঁরা আরব, পারসিক ও আফগান খানদান থেকে ভারতে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছিলেন অথবা উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। তাঁদের আভিজাত্য ও কৌলীন্য বেশি। আর এদেশের ধর্মান্তরিত মুসলিমরা যেন খানিকটা হেয়, ভদ্রেতর বর্গের। তাদের নাম আতরাফ বা আজলফ। এই আতরফের মধ্যে আরও যারা নিচুস্তরের (যেমন জোলা, নিকিরি, কাহার, নলুয়া বা বেদে) তাদের নাম ‘অর্জল’ বা ‘রাজিল’।
তথ্যত দেখা গেছে আশরাফ-আতরাফে তেমন সামাজিক লেনদেন ছিল না এবং বিবাহ সম্পর্ক হয়নি। আতরাফদের সঙ্গে অর্জলদেরও সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না।
গ) স্বভাবত এসে পড়ে সামাজিক সুযোগ সুবিধা ও অর্থনৈতিক ছকের কথা। বোঝাই যাচ্ছে আশরাফরা ছিলেন সুবিধাভোগী জমিদার ও উচ্চ পদাধিকারী। আতরাফরা খেটে খাওয়া মানুষ। অর্জলরা একেবারে গতরজীবী।
আশরাফদের মধ্যে আবার চিত্তাকর্ষক শ্রেণিভেদের বৃত্তান্ত পাওয়া গেছে। যেমন সৈয়দরা সবচেয়ে মান্য বা উঁচু থাকের যেহেতু তাঁরা মহম্মদ কন্যা (‘Prophet’s daughter’) ফতিমার বংশধারার। সৈয়দদের পরে সেখ, মোঘল ও পাঠান। মুসলমান শাসনাধীন ধর্মান্তরিত দেশি মুসলমানদের কোনও উচ্চপদে নিয়োগ করা হত না। ইলতুৎমিস তাঁর প্রশাসন থেকে তিরিশজনকে খারিজ করে দিয়েছিলেন তাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় ছিলেন বলে। এ ব্যাপারে একটি মজার তথ্য পাওয়া যায় ইমতিয়াজ আমেদের বই থেকে। জানা যাচ্ছে :
নিজামুল মুল্ক্ জুনাইদির সুপারিশে সম্রাট ইলতুৎমিস যখন জামাল মারজাককে নিয়োগ করলেন কনৌজের এক উচ্চপদে তখন তাতে আপত্তি জানালেন আজিজ বাহ্রুজ নামে এক উচ্চ আমলা, কারণ জামাল নিম্নবর্ণজাত। সঙ্গে সঙ্গে ইলতুৎমিস সেই নিয়োগ তো বাতিল করলেনই উপরন্তু নিজামুলের বংশ বৃত্তান্ত নিয়ে তদন্ত করতে আদেশ দিলেন। তদন্তে ফাঁস হল নিজামুল জাতে জোলা, সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত হলেন।
এসব বিবরণ থেকে প্রতিভাত হচ্ছে একসময় মুসলমান সমাজে শ্রেণিঘৃণা কী পর্যায়ের ও কত হিংস্র ছিল। মুসলমান সমাজ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁদের বই থেকে এমন তথ্য উঠে এসেছে স্বাধীনতার আগে কলকাতার উচ্চশিক্ষিত ধনী মুসলমানরা বাংলা বলতেন না। তাঁরা ছিলেন উর্দুভাষায় স্বচ্ছন্দ।
শাহ ফকিরদের নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা করে নৃতাত্ত্বিক রণজিৎকুমার ভট্টাচার্য তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত করেছেন :
They, however, feel that they are regarded low by the high status Muslims, because the common Muslims have no ability to appreciate their deep phi-losophy of life and consider them not much above the class of ordinary beg-gars.
এমন ধরনের তথ্যের মধ্যে ইতিহাসের ও সমাজের কিছু সার কথা আমরা খুঁজে পাই এবং রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে : এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে।
উচ্চবর্গের মানুষ ও অভিজাত জীবন একটা সত্য কখনই বোঝে না যে, মানুষের মনের শক্তি অদম্য এবং তার ভিতরে প্রতিবাদের বহুরকম ভাষা ও কৌশল আছে। যে সময় মুসলিম সমাজ তার পবিত্র ধর্ম ও শুদ্ধ জীবনদর্শনের উচ্চ মাচায় বসে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের ভাবছিল ভিখারি, গরিব ও নিম্নস্তরের জীব—তখন তাদের শোষিত সত্তা পরম অভিমানে চাইছিল মুক্তি ও মানবাধিকারের মর্যাদা। লক্ষ করা যাচ্ছে লালন ফকির তাঁর জীবন সায়াহ্নে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত ছেঁউড়িয়ায় এসে বাঁধলেন তাঁর আস্তানা। ওই গরিব মহল্লায় থাকতেন মোমিন কারিগর সম্প্রদায়, তাঁত বোনা ছিল তাঁদের জীবিকা। পরিচয়ে আতরাফ কিংবা অর্জল। তাঁদের মধ্যেখানে বাস করে তিনি গানে লিখলেন, ‘লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না নজরে।’ তাঁর গান সব কিছুকে ছাপিয়ে ঘোষণা করল অপরাজেয় মনুষ্যত্বের জয়। জাতিবর্ণহীন শ্রেণিহীন মানুষ। তাঁর ফকিরিপন্থায় দলে দলে নির্জিত অপমানিত শোষিত মানুষ এসে যোগ দিলেন। শোনা গেল প্রতিবাদের এক নতুন ভাষা লালনশিষ্য দুদ্দু শাহ-র গানে। ব্যঙ্গ করে তিনি লিখলেন :
