সাধারণত আমরা ভেবে দেখি না, কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি ফকিরদেরও শ্রেণিগত থাক আছে। বীরভূমের গ্রামে যেসব ফকির পরিবার দেখেছি তারা মরা গরিব, যদিও সেই গরিবিয়ানায় তাদের কোনও গ্লানি নেই। পাথরচাপুড়ির মেলায় প্রচুর ফকির দেখেছি, একেবারে কপর্দকশূন্য ভিক্ষাজীবী। এরকম রিক্ত দরিদ্র ফকির পরিবারের সন্তানদের ফকির পরিবারেই বিয়ে হয়। আবার গ্রামের মধ্যে কিছু অবস্থাপন্ন ফকির দেখেছি যাঁদের সহায় সম্পদ আছে। যেমন হাঁসপুকুরের আবু তাহের, গোরভাঙার আজহার খাঁ, পরানপুরের এনায়েতউল্লাও তেমনই। তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন মুসলমান পরিবারে, কারণ অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে তারা সমান সমান। মেয়েকে কষ্ট দেবে না।
আশ্চর্য যে ফকিরদের মত ও পথ আলাদা কিন্তু সম্ভ্রান্ত ফকিরদের সামাজিক ওঠাবসা সেই শরিয়তি মুসলমানদের সঙ্গেই। অবশ্য গ্রামবাংলায় শহরের মতো অত শ্রেণিভেদ নেই, থাকার কোনও বাস্তবতা নেই। তাই কোনও কোনও মুসলমান পরিবার ফকির পরিবারের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন। ফকিরবাড়ির ছেলেকে পাত্র হিসাবে মুসলমান শ্বশুর খুব পছন্দ করেন। কারণ? কারণটা আবু তাহের ফকির হেসে হেসে বলেছিলেন : ‘কারণ ফকিরদের ছেলেমেয়েরা খুব শান্ত প্রকৃতির হয়। ফকিরের ছেলে মদ মাংস ছোঁয় না, নেশাভাং নেই, ঠান্ডা স্বভাবের। শান্তিপ্রিয়, তাই কখনও বিবিকে তালাক দেবে না এই ভরসায় আলেম মুসলমানরাও মেয়েকে ফকিরবাড়িতে বউ করে পাঠায়, খুব আগ্রহ তাতে।’
এনায়েতউল্লার অভিজ্ঞতা বিপরীত। তাঁর সুদর্শনা ফরসা মেয়েটিকে যে মুসলমান বাড়ি বিয়ে দিয়েছিলেন সেখান থেকে ফেরত এনেছেন। কারণ তারা গোমাংস খায়। ফকিররা বড় একটা মাংসই খান না, বেশির ভাগ নিরামিষাশী, বড়জোর মাছ চলে। এনায়েত ফকিরের মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়িতে শুধু গোমাংস খেতে বাধ্য করা নয়, হুকুম করেছে সেই মাংস বেঁধে পরিবেশন করতে হবে। মেয়েটিকে বাধ্য করা যায়নি। ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ভেবে দেখতে গেলে এও কিন্তু একরকম সামাজিক অত্যাচার। অন্য মোড়কে এটা হল ফকিরদের ওপর মৌলবাদীদের সামাজিক নির্যাতন। আখড়া ভেঙে দেবার হুমকি, একতারা কেড়ে নেওয়া, বা গান গাইতে না দেওয়ার সঙ্গে জোর করে গোমাংস খাওয়ার অত্যাচারে তফাত কতটা?
এককথায় বলা চলে, শরাওয়ালাদের সঙ্গে বেশরা ফকিরদের নীতিগত লড়াই বহুদিনের এবং তাতে দৈহিক শক্তি ও সামাজিক প্রতিপত্তির ব্যবহার চলে আসছে নানাভাবে ও নানামাত্রায়। একটা কথা সচরাচর মনে থাকে না যে, শরিয়তিই হোক মারফতিই হোক, আমাদের এই বাংলায় বেশির ভাগ মুসলমানই ধর্মান্তরিত। কেউ দুই পুরুষ কেউ তিন পুরুষ আগে ছিল হিন্দুধর্মের আওতায়, তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশ আবার নিম্নবর্গের গ্রামিক হিন্দু। তার ফলে গ্রামীণ সংস্কৃতির বহু আচার ব্যবহার ও কুসংস্কার তাঁদের মধ্যে রয়ে গেছে। তাই তাঁরা যখন ইসলাম ধর্মে চলে এলেন তখন কলেমা তৈয়বের প্রথম নির্দেশ বা বিশ্বাস ‘আল্লা একমাত্র উপাস্য’ একথাটা সর্বাংশে মান্য করতেন না। লা-শরিক আল্লার উপাসনার পাশে তাঁরা ‘বুৎপরোস্তি’ বা পৌত্তলিকতা এবং ‘পিরপরোস্তি’ বা পিরমুর্শেদের আরাধনাও করতেন। সাধারণ মানুষ তাঁরা, গ্রাম্য ও অশিক্ষিত— তাই নানা গ্রাম্যদেবতা, শীতলা-ষষ্ঠী-লক্ষ্মীপুজো ইত্যাদিতে বিশ্বাস রাখতেন। দেওয়ালি, হোলি, ভাইদ্বিতীয়া, লক্ষ্মীবার, নবান্ন মানায় ছিলেন উৎসাহী। শরিয়তিরা এসব বরদাস্ত করতেন না অর্থাৎ আল্লার সঙ্গে অন্য শরিকের উপাসনা। গাল দিতেন তাঁদের ‘মুশরিক’ বলে। তাতে কি তাঁদের নিবৃত্ত করা যেত? তাঁরা তাঁদের অন্ধবিশ্বাসে দরগাতলায় সিন্নি মানত করতেন, পিরের কাছে কবচ তাবিজ ধারণ করতেন, সন্তান কামনায় গাছে বাঁধতেন ঢেলা। ইতিমধ্যে গ্রামে গ্রামে পিররা ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রভাবের কাছে অদৃশ্য আল্লার উদ্দেশে কলেমা পাঠ অনেক নিষ্প্রভ লাগত। ইসলামিয়ায় দাখিল হলেও ইসলামি রীতিকৃত্য অনেকে জানতেনই না। রফিউদ্দিন আমেদের বই থেকে জানা যায় :
Despite the reformists’ eloquent claims, the rural Muslims continued with their older way of life to a marked degree. A late-nineteenth-century observer was appalled at the ‘pauparism, lethargy and negligence’ of the average Bengali Muslim in matters of their own faith that he went so far as to describe them as a ‘sect’ which observed ‘none of the ceremonies of its faith, which worships at the shrines of a rival religion and tenaciously adheres to practices which were denounced as the foulest abominations by its founder’. Not one in ten could reportedly recite the simple Kalimah, or creed, considered indispensible for every Muslim.
প্রতিবেদনে যে-চিত্র ফুটে উঠেছে তা মুসলমান ধর্মনিষ্ঠদের পক্ষে বেদনাদায়ক কিন্তু বাস্তব। ইসলামি রাতিকৃত্য তথা বাত্যাচার পালনে তথা নামাজ-রোজায় সাধারণ মুসলমানের আলস্য ও অবহেলা তখনও ছিল, এখনও আছে। প্রতি দশজন মুসলমানের একজনও কলেমা আবৃত্তি করতে পারত না এ তথ্য পরিতাপজনক কিন্তু সত্য। কিন্তু কেন পারত না? ব্যাপারটি মনস্তাত্ত্বিক—কারণ কোনও ধর্মান্তরিত মানুষই সদ্য সদ্য তার পুরনো ধৰ্মাভ্যাস ও আচরণ ভুলতে পারে কি? একদিকে তার লৌকিকজীবন ও তার বিশ্বাস-সংস্কার, আরেকদিকে আনকোরা নতুন ইসলামিয়ার অজানা নির্দেশিকা— সে কোনদিকে যাবে? তা ছাড়া সংসারের বিপদে আপদে, সন্তানের আকস্মিক রোগ বালাইয়ে যে পিরফকির আর দরগাতলায় হত্যে দিতে অভ্যস্ত, দেবদেবীর নাম নিয়ে বুকে সাহস পায়, সে কেন এসব রাতারাতি বাতিল করে অদৃশ্য আল্লাতে শরণ নেবে? প্রকৃতপক্ষে এই যে লোকায়ত গ্রামীণ ইসলাম ধর্ম এ যেন এক মিশ্র বিশ্বাস, না-হিন্দু না-মুসলমান।
