এই বিশাল বিস্তীর্ণ জনপদ আজকের বাংলাদেশে এমন প্রশাসনিক বিভাজনে শনাক্ত করা যাবে না, কারণ বহু জেলা ও উপজেলায় এখনকার নববিন্যাসের অন্য চেহারা। তবে এসব অঞ্চলে লোকায়ত জীবন এখনও অনেকটা আছে। তবে বাউল গানের বদলে ‘বাউল্যা’ বা ‘বাউলিয়া’ গান, কিংবা ‘ফকিরালি’ গান সংজ্ঞাই এদিকে বেশি প্রচলিত। সিলেটের মানুষ খালেদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু চৌধুরী ও দিনেন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে আলাপচারিতে জেনেছি তাঁদের শৈশব কৈশোরে তাঁরা যেসব গান শুনেছেন শিখেছেন তা হয়তো ততটা বাউলবর্গীয় নয়। বরং ফকিরালি গান তাঁদের অধিকতর চেনা। মারিফতি ফকিরদের গান তাঁদের স্মৃতিতে এখনও সজীব।
হাবিবুর রহমান একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন মুসলমান কট্টরবাদীদের সঙ্গে মারফতি ফকিরদের দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে। তাঁর ধারণা :
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পদে তদানীন্তন নিম্ন বাংলায় (যশোহর-বরিশাল-ফরিদপুর) ওয়াহাবী ও ফারায়েজী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে। এ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সমাজ থেকে শের্ক ও বেদাতী দূর করা। এদের অভিযানের ফলে অনেকে গান-বাজনা ছেড়ে দেয়। কেউবা পালিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার সাটুরিয়া থানা এমনিতর একটি পলাতক বাউলদের মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
এ রকম কোনও পলাতক বাউল বা ফকিরকেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠেনি, কারণ এখানকার মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সে সময় তেমনতর উগ্রপন্থী সংগঠন ছিল না। কিন্তু নিম্নবঙ্গে উত্তরবঙ্গে ও পূর্ববঙ্গের বিস্তৃত অংশে ধর্মোন্মাদ কট্টর ইসলামি জনসমাজ বিশেষত মোল্লাতন্ত্র বাউল ও মারফতি ফকিরদের বিতাড়নে ও চিত্তশুদ্ধিতে সক্রিয় ছিল। তার ফলে ওই বঙ্গে যা ঘটেছিল তা হাবিবুর রহমানের মন্তব্যে আমরা জানতে পারি। তাঁর সিদ্ধান্ত :
বাউল সাধনা মূলত দেশজ ও সুফীতত্ত্বের সমন্বিত সাধনা। কিন্তু ফারায়েজী ওয়াহাবী আন্দোলনের ফলে বাউলের সাধনসংগীতে দেশীয় তত্ত্বের বিয়োজন ঘটে। এ গানে হেদায়েতি (হিদায়েত শব্দটির অর্থ সঠিক পথে পরিচালিত বা নির্দেশিত হওয়া) বিষয়ক ভাব ও সুফীতত্ত্বের অবতারণা করা হয়। বস্তুতপক্ষে এই সময় থেকেই বাউল গানের বিচার শাখার সূচনা হয়। বাউলের মধ্যে সাধন-ভজনে মৌলিক বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সেগুলোর সুচারু ব্যাখ্যারই অপর নাম বিচার গান। ঢাকা জেলা ও এর সন্নিহিত অঞ্চলে বাউল গান ‘বিচার গান’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের পশ্চিমাঞ্চলে ও জাতীয় গান ‘ফকিরালী’ এবং পূর্ব সিলেটে ‘বাউলা’ গান নামে পরিচিত। কুষ্টিয়া যশোহর ও খুলনা জেলায় ও গান ‘ভাব’ ‘ধুয়া’ ও ‘শব্দগান’ নামে বহুল পরিচিত।
হাবিবুর রহমানের মন্তব্য পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়, তথ্যের ভ্রান্তিও আছে, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন আছে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে। হেদায়েতি প্রয়াসে বাংলার মৌল বাউল গানের দেশজ ভাব ঝরে গিয়ে গড়ে উঠেছে বিচার গানের নতুনত্ব এমন সিদ্ধান্ত অন্য কারুর লেখায় পাইনি। তা যদি হয়ে থাকে তবে বুঝতে হবে একদল বাউল পালিয়েছিল, আরেকদলের গানের অন্তঃশরীরে ধর্মব্যবসায়ীরা পরিবর্তন এনেছিলেন, যাকে বলে Thematic variation। তা কেন হবে? গানকে অনৈসলামিক বিবেচনা করলে তাকে সমূলে উৎপাটন করাই স্বাভাবিক। কারণ এখনকার দিনে মুর্শিদাবাদে বাউল ফকিরদের সঙ্গে কট্টর ধর্মান্ধ মুসলমানদের যে বিরোধ তা হল গান গাওয়া নিয়েই। গান করাই তাঁদের মতে গোনাহ্ বা পাপ। তারপরে আসে গানের বিষয়গত বিরূপতা। একতারা বা অন্য বাদ্যযন্ত্র ভেঙে দেওয়া আসলে গানের বিরুদ্ধেই লড়াই। নদিয়ার গোরভাঙার মনসুর ফকির আমাকে বলেছে, ‘এই যে দেখছেন বাড়ির বাইরে আমরা এই ঘরখানা বানিয়েছি, সন্ধেবেলা ওখানে আমরা গান গাই। ওরা বলেছে গান বন্ধ কর। অবিশ্যি আমরা সেকথা মানিনি। গান চলছে।’
কিন্তু বিচার গানের উদ্ভব মারফতি ফকিরদের নিজেদের প্রয়োজনেই হয়েছে। ফকিরি পথ সর্বদাই বিচারশীল। প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের ‘বাহাস্’ বা বিতর্ক চলে, নিজেদের মধ্যেও সর্বদা চলে গানে গানে তত্ত্ব তালাশ। শরিয়তি বড় না মারফতি বড়? আল্লা না নবি? নবি কে মুর্শেদ কে? ভজে পাই কি পেয়ে ভজি? এ ধরনের তর্কমুখর তত্ত্ব ও প্রতিতত্ত্বের বুনোট, উত্তর-প্রত্যুত্তরের আসর সর্বদাই আছে গায়ক সম্প্রদায়ে। সে সব বিষয়ে প্রত্যেক বড় গায়কই সচেষ্ট ও সচেতন। তাঁদের শিক্ষাদীক্ষাও ব্যাপক। গানের সঞ্চয় ঈর্ষণীয়। ভাল বিচার গানের সভা শ্রোতাদের শিক্ষিত হবার পক্ষে অনবদ্য পাঠশালা।
কিন্তু এই প্রসঙ্গে একটা গুরুতর কথা সেরে নিতে হবে। আমাদের সমাজ কাঠামো এমন যে, কোনও গ্রামে মুসলমান সমাজে ঘৃণিত ও অবমানিত হয়েও ফকিরদের থাকতে হয় তাদের মধ্যেই। মুসলমান পরিবারের নানা প্রথা প্রকরণ উৎসবে অংশ নিতে হয়। ছেলেমেয়েদের আরবি নাম রাখতে হয়। বিয়েশাদিও ফকিরের সন্তানের কোনও হিন্দুর ঘরে হবার নয়। এ নিয়ে সমস্যাও হয়। একটা সংকটের কথা মনে পড়ছে। পরানপুরের এনায়েতউল্লা ফকিরি মতে আছেন। তাঁর পিতা পাঁচরুল্লা বিশ্বাসও ওই মার্গে ছিলেন। বেশ কিছু জমিজমা আছে, সমাজের মান্যমান ব্যক্তি। তাঁর সাধনার মার্গ হল ফকিরি, কিন্তু তাই বলে তিনি দীনহীন ফকির তো নন। দালানকোঠা ত্যাজ্য করে গাছতলাও সার করেননি জীবনে। দিব্যি বড় দোতলা বাড়ি, ধানের মরাই, জেনারেটর। গ্রামের আলেম মুসলমানদের সঙ্গে তাঁর প্রণয়ও নেই বিরোধও নেই। মানুষটি মধ্যশিক্ষিত এবং মুর্শিদাবাদে কোথাও বাউলফকিরদের নিগ্রহ হলে তিনি সেখানে হাজির হন, প্রতিবাদী ভূমিকা নেন।
