আমি দালান কোঠা ত্যাজ্য করি
গাছতলা করেছি সার।
ধুতি চাদর ত্যাজ্য করি ডোরকৌপীন করেছি সার।
অর্থাৎ মানুষটা সর্বাংশে ত্যাগী নয় কিন্তু ভোগের পথ থেকে স্বেচ্ছায় সরে এসেছে, জীবনের আয়োজনকে খানিকটা খর্ব করে নিচ্ছে। দালান কোঠাতে থাকাই যায়, ছিলামও সেখানে, কিন্ত এখন সার করেছি বৃক্ষতল। সভ্যসজ্জা আভরণ ছেড়ে ডোরকৌপীনে নিজেকে বেঁধেছি। এর ইঙ্গিত বেশ পরিষ্কার। অনিকেত যোগজীবনে বৃক্ষতলই আশ্রয়, ডোর কৌপীন দেহসংযমের প্রতীক। আমাদের প্রাচীন চিত্রকলায় দরবেশ বা ফকিরদের যে ছবি পাই তাতে হয় তাঁদের ভ্রাম্যমাণ রূপ, না হয় বৃক্ষতলে বসে উপদেশরত রূপে দেখা যায়। সর্বত্রই তাঁদের দীনবেশ।
মানুষের পক্ষে এই রাজভিখারি হবার বিকল্প কারুর কারুর জীবনে আসে। গৌতম ভদ্র সুন্দর লিখেছেন :
বাদশাহি ও দরবেশি দুই পৃথক জীবনযাত্রা, আচরণবিধি। এরা আলাদা কোন সম্প্রদায় নন। লোকেরা বাদশাহি পথে যেতে পারে, আবার ইচ্ছা করলে দরবেশি পথও বেছে নিতে পারে। ব্যক্তি বিশেষে বাদশাহও দরবেশ হন, দরবেশেরও বাদশাহ হতে কোন বাধা নেই।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? নদিয়া-মুর্শিদাবাদ-বীরভূম-বর্ধমানে আমি গত কয়েক দশকে অনেক ফকিরের সঙ্গ করেছি। লিখিত সাহিত্যেও ফকির চরিত্রের সন্ধান মেলে। জলধর সেন লিখেছেন কেমন করে কাঙাল হরিনাথ ফিকিরচাঁদ ফকির নাম নিয়ে গান রচনা করলেন তার বৃত্তান্ত। লিখছেন :
সেদিন প্রাতঃকালে লালন ফকির নামক একজন ফকির কাঙালের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন।… তাঁহার এক অমোঘ অস্ত্র ছিল— তাহা বাউলের গান।… সেই লালন ফকির কাঙালের কুটিরে, সেইদিন আসিয়াছিলেন এবং কয়েকটি গান করিয়াছিলেন।
প্রাতঃকালে যখন গান হয়, তখন আমরাও উপস্থিত ছিলাম, গানও শুনিয়াছিলাম : কিন্তু আমরা যে সে গানের মর্ম ধরিতে পারিয়াছিলাম তাহা বলিতে পারি না। …বাউলের গান তখন তেমন প্রচলিত হয় নাই; ক্কচিৎ কখনও দুই একজন ফকির বা দরবেশের মুখে এক আধটা দেহতত্ত্বের গান আমরা শুনিয়াছি।
উনিশ শতকীয় এই অকপট জবানি থেকে দুয়েকটা সাময়িক তথ্য ও বিচার উঠে এসেছে। জলধর সেন লালন শাহকে একজন ফকির বলে চিহ্নিত করেছেন অথচ তাঁর কণ্ঠে শুনেছেন বাউল গান। এরপরের মন্তব্য হল বাউল গান তাঁর দুর্বোধ্য লেগেছে এবং বাউল গান তখন লোকসমাজে তত প্রচলিত ছিল না। বরং ফকির দরবেশদের (বলা বাহুল্য তারা স্বভাব ভ্রাম্যমাণ) মুখে এক-আধটা দেহতত্ত্বের গান শোনার অভিজ্ঞতা ছিল। এই ভাষ্য খুব মূল্যবান, কারণ এর থেকে বোঝা যাচ্ছে ফকিরি গান অনেক আগে থেকে প্রচলিত ছিল, বাউল গানের ধারা তার পরের। ফকির আর দরবেশ যে দুটি আলাদা সম্প্রদায় তাও বোঝা যায়।
লালনের সেদিনকার গান অবশ্য জলধর সেন কিংবা অক্ষয়কুমার মৈত্রের মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনে খুব নতুন করে অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তার ফলে তাঁরা এক ধরনের নির্বেদমূলক গান লিখে বসেন বাউলগানের ধাঁচায়। গান লেখা হলে তাতে ভণিতা দেন ‘ফিকিরচাঁদ ফকির’। পরে সেই গানে কোনও চলতি সুরু কাঠামো লাগিয়ে হরিনাথকে শোনান। হরিনাথ তাতে উৎসাহিত হয়ে নিজেও গাইতে গাইতে শেষে নৃত্যপর হলেন। এবারে তাঁর নবজন্ম হল। তিনি লিখতে শুরু করলেন একরকম পারমার্থিক ভাবনার গান, গানের পর গান, গড়ে উঠল গানের দল, ফিকিরচাঁদি গানের ঢং, তার সুরে সারাদেশ পরিপ্লাবিত হল।
কাঙাল হরিনাথের গানে ফিকিরচাঁদ ফকির ভণিতাটি সমারূঢ়। এটা তাঁর নিজের উদ্ভাবন নয়। তাঁর বান্ধববর্গ এই ভণিতার নির্মাতা। কেমন অনায়াসে জলধর সেন লিখেছেন, ‘আমাদের ত ধর্মভাব ছিল না, কোনও “ফিকিরে” সময় কাটানোই আমাদের উদ্দেশ্য।’ সেই ফিকির অবশ্য কাঙালের বেশ মনঃপূত হয়ে গেল। ১২৯৩-১৩০০ সালের মধ্যে ১২ পৃষ্ঠা করে ‘কাঙাল-ফিকিরচাঁদ ফকিরের গীতাবলী’ ১৬ খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
ফকিরদের আলোচনায় নানা ধরনের তথ্য আর বৃত্তান্ত ব্যবহার করে বোঝাতে চাইছি কী কারণে কে জানে ফকির সাজতে অনেকে চেয়েছেন ইতরভদ্র দু’-তরফেই। ফকির নামে আত্মপরিচয় দিতে অনেকে চেয়েছেন। গ্রাম বাংলার গত দেড় শতক ধরে ফকির নামে বহুজনকে পাওয়া গেছে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে। অনেক গীতিকার বা মহাজন ফকিররূপে পরিচয় দিয়েছেন নিজের। রবীন্দ্রনাটকে দাদাঠাকুর মঞ্চে এসেছেন ফকিরবেশে। কিন্তু। কোনও অনিবারণীয় কারণে ফকিরদের অনুষঙ্গে মুসলমান পরিবেশের একটা ছাপ থেকে যায়। অর্থাৎ অনেকে মনে করেন শরিয়তের পথ ছেড়ে যাঁরা মারফতির পথে এসেছেন তাঁরাই বুঝি ফকির। কিন্তু হিন্দু ফকিরও বহু আছেন। ফকিরিয়ানা একটা Life style বা জীবনপ্রবণতা বলাই ভাল।
কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে ফকিরদের প্রত্যক্ষ যুযুধান সম্পর্ক বহুদিন ধরে রয়ে গেছে। একটা সময়ে ফকিরদের বাউলদের অন্তর্ভুক্ত যে ভাবা হত তার প্রমাণ রেয়াজউদ্দিনের বই ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ থেকে পরিস্ফুট। উত্তরবঙ্গে একসময়ে বাউলখেদা আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা কি বাউল ছিলেন না মারফত পন্থার ফকির ছিলেন?
বাংলাদেশের গবেষক হাবিবুর রহমান পূর্ব ও নিম্নবঙ্গে বাউল সংগীতাঞ্চলের রূপরেখা এঁকেছেন সরেজমিন ঘুরে। তাঁর সিদ্ধান্ত :
সমগ্র কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা (সুন্দরবনাঞ্চল অর্থাৎ রামপাল, সরোনখোলা, মোরেলগঞ্জ, পাইকগাছা, দাকোপ ও শ্যামনগর থানা ব্যতীত), ঢাকা, টাঙ্গাইল (মধুপুর থানা ব্যতীত), ময়মনসিংহের জামালপুর মহকুমা (শ্রীবর্দী, ঝাড়িয়াগীতি, নাক্লা দেওয়ানগঞ্জ, শেরপুর ও নলিতাবাড়ি ব্যতীত) ও সদর দক্ষিণ মহকুমা এবং সিলেট জেলার সদর মহকুমা (জয়ন্তিয়া ও গোরাইন ঘাট ব্যতীত), মৌলভীবাজার মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার ছাতক, জগন্নাথপুর সুনামগঞ্জ থানা এবং হবিগঞ্জ মহকুমার সদর, চুনারুঘাট, বাহুবল ও নবীনগঞ্জ থানা নিয়ে বাউল সংগীতাঞ্চল রূপায়িত হয়েছে।
