তখন মধ্যযাম— পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াবী প্রহর। এ সময়েই নাকি জীবনের গভীর অনুভব জেগে ওঠে সাধকদের মনে ও মননে। দু’জন করে কাওয়ালি গায়ক মঞ্চে আসছে তারপর টানা ঘণ্টাদুয়েক গেয়ে নূর বাবাকে সেলাম দিয়ে নেমে যাচ্ছে। যেন তাঁকে শোনানোর জন্যই তাদের গানের শিক্ষা। গুরুর কদরদান তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তারা তৃপ্ত।
এইভাবে একাদিক্রমে গানের পর গান শুনতে শুনতে ভোর হয়ে গেল। ভৈরোঁ রাগে বিলম্বিত ছন্দে গান ধরলেন গৃহস্বামী। সে গান দ্ব্যর্থমূলক শব্দবহুল কাওয়ালি নয়, ধ্বনিময় ধ্রুপদ। সমাসন্ন ভোরের অরুণছটার মাঝে সুরের সুরধুনী অপার্থিব আবহ সৃষ্টি করলেও তাতে নিশীথ রাতের প্রাণ ছিল না। গানের মাঝখানে নূর শাহ উঠে আবার চলে গেলেন ঠাকুরঘরে। আসর শেষ হল। অনন্য এক অভিজ্ঞতার তাপ বুকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছি তখন শরীরে কোনও গ্লানি নেই কারণ মন যে কানায় কানায় ভরা।
পরদিন বিকেলে শুভ্রসুন্দর দীপ্তি উজ্জ্বল সেই সুফিসাধকের কাছে বসে শুনতে পেলাম নানারকম কথা। রজা শাহ বাবার বৃত্তান্ত। নূর শাহ বাবার কত কি অনুভূতি। উত্তরপ্রদেশের জাতক, পাকা গমের মতো বর্ণোজ্জ্বল সেই বৃদ্ধ ভাঙা বাংলায় আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন শান্ত স্বরে, প্রসন্ন প্রশ্রয়ের হাসি মুখে ছিল। তারপর কত বছর কেটে গেছে। তাঁর মাড়বার শিষ্য কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়েও কোনও ওষুধ খাননি, শুধু বাবার দেওয়া মাটি খেতেন। তাঁর প্রতি অকলঙ্ক বিশ্বাস রেখে প্রয়াত হলেন। এখনও পার্ক সার্কাস স্টেশন সংলগ্ন কবরখানার দিকে নজর গেলে নূর শাহ বাবার স্মৃতির প্রতি বন্দেগি জানাই। ভাবি, কী আশ্চর্যভাবে সুফিসাধনার সবচেয়ে দুর্লভ দৃশ্য দেখেছি। বাহ্যদশা কাটিয়ে অন্তর্দীপ্ত ধ্যানতন্ময়তায় লব্ধ ‘মুরাক্কিবহ্’ তারপরে ক্রমশ ‘ফনা ফিল্লাহ্’ পেরিয়ে ‘বক্কা বিল্লাহ্’-তে স্থিতি।
সুফি সাধনার এই ঝলক দর্শনের স্মৃতি এখানে উঠে এল এটা বোঝাতে যে ইসলামের নামাজ রোজা হজ জাকাতের ব্যবহারিক পৌনঃপুনিকতার স্থানে সুফিতত্ত্ব কী ভাবে অন্তঃশীল অনুভবের সঙ্গে জীবনকে মিশিয়ে দিতে পারে। নিজের অস্তিত্বকে করে তোলে মহীয়ান। ফকিরিতন্ত্র— সুফিতত্ত্ব থেকেই সম্ভবত আত্মতত্ত্ব উদ্বোধনে ব্রতী হয়েছে। লালনের ভাষায় ‘আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে/ দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে।’ এই আত্মতত্ত্বে অধিকার এলে শরার কেতাব খসে পড়ে, কায়েম হয় ‘দেল-কেতাব’ বা আত্ম-নির্দেশ। ফকিরদের স্বরূপ তথা ফকিরিয়ানা বুঝতে গেলে ইসলাম বুঝতে হবে প্রথমে, তারপরে অনুধাবন করতে হবে সুফিতত্ত্ব। এতক্ষণ সেই প্রয়াস নেওয়া গেল। এবারে ফকিরি পন্থার কথা।
বহুকাল আগে, সেই ১৮৯৮ সালে মৌলবি আবদুল ওয়ালী তাঁর ইংরাজি গদ্যে লেখা নিবন্ধে (‘On some curious Tenets and Practices of a certain class of Fakirs of Bengal’) একটা পদাংশ ব্যবহার করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছে:
আউলে ফকির আল্লাহ্ বাউলে মুহাম্মদ
দরবিশ আদম সফী এই তক হদ।
তিন মত এক সাত করিয়া যে আলী
প্রকাশ করিয়া দিল সইমত বলি ॥
এ ধরনের পদ ব্যাখ্যা করবেন যথাযথভাবে সেরকম মননশীল পণ্ডিত বা সাধক পাওয়া কঠিন। একজন লোকায়ত সাধকের কাছে এই পদটি আউড়ে ওয়ালীসাহেব ব্যাখ্যান চেয়েছিলেন। তিনি মোটামুটি যা বলেছিলেন তা হল আউলদের মধ্যে আল্লা আছেন ফকিররূপে, বাউলদের মধ্যে মহম্মদ রসুল আর আদম তনের মধ্যে রয়েছেন দরবেশ। এই তিন মতের সমন্বয়ই হল সাঁইমতে। আমাদের লালন সাঁই সেইজন্য এতবড় মান্যতা পান। তাঁর মধ্যে ফকির-বাউল-দরবেশ সব কিছুর মিলন।
এ সব ব্যাখ্যা শুনে যাওয়া ছাড়া উপায় কী? নিতান্ত মনগড়া কিংবা গোঁজামিল ভাষ্য যদি ভাবি তাতেও দোষ নেই। একালের শিক্ষিত পণ্ডিতদের মধ্যে আরবি-পারশি লজ জানা গৌতম ভদ্র খুব সতর্ক বিশ্লেষক এবং তথ্যের ভাণ্ডারী। তাঁর লেখা থেকে কিছু ইঙ্গিত আমরা নিতে পারি ফকির বা দরবেশ প্রসঙ্গে। তিনি মনে করেন,
দরবেশের প্রতিশব্দ রূপে নানাভাবে নানা শব্দ এসেছে। ফকির, কলন্দর, আজাদি বা মিসকিন। কোনটা আরবি, কোনটা বা ফারসি।… দরবেশিয়ানায় ব্যাখ্যায় আছে, ‘ফকিরিয়ানা, গরিবিয়ানা, দরবেশিয়ানা গুজরান ইয়া মেজাজ।’ ফকির, গরিব, মিসকিন ইত্যাদি শব্দের মধ্যে দারিদ্র, নিঃসম্বলতা, নিঃস্ব অবস্থাও বোঝায়। সেটা যে আদৌ আধ্যাত্মিক তা কিছু নয়। গরিব গুর্বোর সাধারণ প্রতিশব্দ ফকির। কিছু না থাকা যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোই যেন এদের চিহ্ন, আস্তানা তো মানুষকে আটকে দেবে।
তলিয়ে ভাবলে মনে হতে পারে ফকিরিয়ানার দুটো চেহারা। একটা হল দীন দরিদ্র নিঃসম্বল নিঃস্ব মানুষ। আরেকটা হল একরকম ত্যাগব্রতী প্রবণতা, স্বেচ্ছায় মেনে নেওয়া দরিদ্র ঠাঁইনাড়া জীবন। এক্ষেত্রে বোঝা দরকার, জীবনকে গ্রহণ করবার দুটো ছক আছে— হয় দীনদারি না হয় দুনিয়াদারি। দুনিয়াদারি হল ভোগসুখ সহায় সম্পদ সম্পত্তি কর্তৃত্ব এবং তার পরিণামে অনিবার্য দুঃখ শোক বেদনা। আর দীনদারি মানেই বাহ্য উপভোগের সম্পদ আহরণের পথ ছেড়ে স্বেচ্ছায় দরিদ্র নিরুপাধি জীবনকে মেনে নেওয়া। ব্যাপারটা বোঝাতে একটা গানের সাহায্য নিতে পারি, গানটা আগে একবার উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হচ্ছে :
