সত্যি বলতে, আমি কখনও কাদেরিয়া সুফি খান্দানের হালচাল জানিনি, দেখিনি তাদের সমাবেশ। যখন গেলাম তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই বিকাল। গৃহস্বামীর প্রশস্ত প্রাঙ্গণে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছিল। একটু উঁচু মঞ্চে গানের আসরের বন্দোবস্ত। প্রাঙ্গণের সর্বত্র শতরঞ্চি পাতা শ্রোতাদের জন্য। মাঝখানে একটি প্রশস্ত গালিচায় শ্বেতশুভ্র চাদর পাতা, ফকির বাবার বসার জন্য। বসবার জায়গায় দু’পাশে ও পিছনে মোট তিনটে তাকিয়া, মুর্শেদ হেলান দেবেন প্রয়োজনে। সমস্ত পরিবেশ শান্ত, অদৃশ্য গন্ধ ধূপ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। খুবই সীমায়িত সংখ্যক শ্রোতা, সাকুল্যে বিশজন হয়তো। তার মধ্যে টানা মোটর গাড়িতে এসেছেন জন পনেরো ভক্ত, তাঁরা দৃশ্যত মুসলমান এবং বেশ ধনী বলে মনে হল। অন্তত আটজন কাওয়ালি গায়ক এসেছেন যন্ত্রীদের নিয়ে। সকলেই চোস্ত উর্দুতে কথা বলছেন। জানা গেল নূর শাহ বিকাল থেকে আছেন ঠাকুর ঘরে। সেখানে উঁকি মেরে দেখলাম তিনি চাদরের ঘোমটা টেনে একেবারে নিঃসাড়ভাবে ধ্যানস্থ, এ-জগতেই যেন নেই। সামনে তাঁর গুরু রজা শাহ বাবার ফোটো। অসামান্য শান্ত পরিবেশ।
ওদিকে মাঝে মাঝে ছোট গেলাসে শরবত আর চা এসে যাচ্ছে। কেউ অসহিষ্ণু নন, নিচুস্বরে কথালাপ চলছে। দু’জন কাওয়াল যন্ত্র বেঁধে মঞ্চে প্রস্তুত, বাবা এলেই গান শুরু হবে। সন্ধ্যা উতরে যাবার একটু পরে হঠাৎ ঠাকুর ঘরের দরজা খুলে নুর শাহ এসে তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। কোনও কথা নয়, শুধু প্রসন্ন চোখে সবাইকে দেখলেন, ঠোঁটে ফুটল একটু হাসি। একজন ভক্ত টাটকা আনকোরা একশো টাকা, পঞ্চাশ-বিশ-দশ টাকার নোট তাঁর সামনে রেখে গেলেন। দেখে মনে হল অন্তত হাজার পাঁচেক টাকা। ভাবলাম, একি ফকিরের নজরানা? মন একটু একটু বিরূপ হচ্ছিল। ভাবছিলাম যত সব বড়লোকী কাণ্ড, ধর্মের নামে বিলাস৷ পরে, সারারাত ধরে বিস্ময় পরিকীর্ণ চোখে দেখব ওই পাঁচ হাজার টাকাই বাবা দান করে দেবেন কাওয়ালদের গানের সমজদারি করে। একে বলে কদরদানি। খুব ভাবের গানে গায়কের চেতনা যখন ঊর্ধ্বস্তরে উঠে যাবে, সকলে বিবশ হয়ে পড়বেন সুরের জাদুতে, সেই মায়াময় অপরূপ ক্ষণে নূর শাহ বাবা দশ বিশ পঞ্চাশ একশো টাকা যেমন মনে হবে তুলবেন। একজন ভক্ত এসে সেই টাকা নিয়ে শিল্পীকে দেবেন। শিল্পী জানাবেন আভূমি কৃতার্থ কুর্নিশ।
যেন একটা অত্যাশ্চর্য অমা নিশিথিনী— পরিপূর্ণ, উদ্বেল অথচ সংযত। চারদিকে শুধু সুরের গুঞ্জরন, তাতে শুদ্ধতম স্বরক্ষেপণের কৌশলে মন বিবাগী হতে চাইছিল। গান তো নয়, যেন অপার্থিব অনুভবের মায়াবী উৎসারণ। উর্দুভাষায় রচিত বাণী একটু আড়াল টানছিল ঠিকই কিন্তু সেসব গান ঠিক অর্থবোধের বাধ্যতায় সীমাবদ্ধ নয়, অনেক ব্যাপ্ত আর সম্ভ্রান্ত। গায়ক যেন সেই গানের বেদনায় নিজের আকুতিকে নিংড়ে দিচ্ছিলেন। তাঁদের মুখাবয়বে সে কী আততি, সে কী সমর্পণ! কাওয়ালি গানের ভক্তিমার্গ এই একবারের মতো আমার জীবনে অনর্গলিত হয়ে কোন অজানা ঐশী মায়ায় ভরে দিয়েছিল কিছুক্ষণ।
কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য একটা কথা— দেখছিলাম স্থির নির্বিকল্প মুর্শেদের মূর্তি। যেন তিলোকের ওপারে, গানের সুরের আসনখানি ডিঙিয়ে, বাবার চৈত্যপুরুষ (Psychic Being) পর্যটন করছিল অন্য কোনখানে। সুফি সাধনার লব্জে পর্যটন আর পর্যটকের প্রসঙ্গ আগেই বলেছি। লিখতে গিয়ে মনে পড়ল অনন্ত দাসের একটা পদ :
মন চলো যাই ভ্রমণে—
কৃষ্ণ-অনুরাগের বাগানে।
চমৎকার ভাবনার বুনোট। কৃষ্ণ-অনুরাগ রূপ একটা পুষ্পবিকশিত সৌরভময় বাগান যেন সাধকের মনের মধ্যে তৈরি হয়ে আছে। সেইখানে চলে যেতে ইচ্ছে পরিভ্রমণে। সেই স্থান বড় মধুর বড় হৃদয়হরা, কাওয়ালির আসরে নূর শাহ বাবার শরীরটা স্থির উপবিষ্ট কিন্তু তাঁর মন আনন্দিত ভ্রমণে নিরত। সেই গভীর চলা আমাদের কাছে একেবারে অদৃশ্য, গোপন।
ভাবছিলাম নিজের কথাও। কী চঞ্চল মন, কিছুতেই কি সুরের পদ্মে বসতে পারছে আমার প্রাণভ্রমর? পারছে না। শুধু এটা দেখছি, ওটা দেখছি। দেখছি কাওয়ালি শিল্পীদের বিচিত্র রঙিন কারুকাজ করা অঙ্গবাস। তাদের মাশুকে নিবিষ্ট চোখের কোণে সলাজ নিবেদন— তাও দেখছি। শুধু গান আমাকে নিয়ে যেতে পারছে না কোনও শান্ত ভ্রমণের উৎসমুখে। কী অস্থির আর অপটু আমার শরীর। একজায়গায় স্থির হয়ে বসার অভ্যাস নেই, কেবলই ঠাঁইবদল করছি, অস্বস্তি সারা শরীরে। মাঝে মাঝে যাচ্ছি প্রকৃতির ডাকে। মাঝে। মাঝে চা খেয়ে ঘুম তাড়াচ্ছি। বুঝতে পারছি এই স্থূল দেহের কী পরাক্রম। আমি দেহগতভাবে কত অসহায়, মনের নিয়ন্ত্রণ কত অসম্ভব।
অথচ ওই সামনে-বসা নূর শাহ বাবা, শান্ত অচঞ্চল জাগর স্থির। শরীরের তিনপাশে আরামে ঠেস দেবার তাকিয়া কিন্তু একবারও এলাচ্ছে না সত্তরোর্ধ্ব কাঠামো। সেই বিকেল থেকে ছিলেন ঠাকুরঘরে ধ্যানস্থ, সেখান থেকে সটান আসরে এসে উপবেশন। প্রকৃতির ডাক তো অনেক দূর, কোনও বাহ্যাচারই নেই। হাতের ওঠাপড়া কিংবা বসার ছাঁদ একটুও বদলাচ্ছে না। শুধু টাকা দেবার সময় যা একটু নড়াচড়া। চা পানের প্রশ্নই নেই— কোন অলৌকিক স্বর্গীয় মদে যেন নেশাতুর। কেবল স্থিরদৃষ্টি, অন্বেষী ও অন্তর্গূঢ়। এই তা হলে ‘রাবিতা’— উপাস্য আর উপাসকের মধ্যে আন্তঃসংযোগ। এই কি তবে সুফিসাধনার চরম বা পরম স্তর ‘ফানা’? উনি কি চিরন্তন প্রেমবন্ধনে বাঁধা পড়ে পরম প্রেয়র সঙ্গে সেতুসম্ভব সম্পর্কে গড়ে তুলে একেবারে ‘বাকা’ হয়ে গেছেন। চলছে অশ্রুত অনুচ্চারিত সংলাপ?
