এখানে স্পষ্টই বলা আছে, রোজা নামাজ হজ জাকাত এসব ইসলামি বাহ্যাচার করার কোনও নিষেধ নেই ফকির হয়ে গেলে। কিন্তু মুরশিদ ভজনা করতেই হবে, সেটা আবশ্যিক। ভেতরে যে কথাটা প্রচ্ছন্ন রয়ে গেল তা সূক্ষ্ম ও দ্যোতনাময়— অর্থাৎ মুরশিদ ভজনা করলে তিনি বুঝিয়ে দেবেন ইসলামের পঞ্চবেনা কতটাই ভ্রান্ত, কতটাই বাঁধা গতের একঘেয়েমি। সেটা বুঝলে শিষ্য নিজে নিজেই ওই বাহ্যপথ ত্যাগ করবে।
বাহ্য ছেড়ে অন্তরের দিকে মানুষের অভিযাত্রা খুব নতুন কথা নয়, অন্তত এদেশে। সেই কোন মধ্যযুগের সন্তরা, সেই কবীর-দাদূ-রজ্জবরা মানুষের মধ্যে জাগাতে চেয়েছিলেন আন্তরধর্মকে। সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি, জীববলি বা কোরবানি, অসার শাস্ত্রনির্দেশ, পাথরের দেবতা আর মন্দির-মসজিদের বিপরীতে তাঁরা চেয়েছিলেন আত্মবোধন ও মুক্তমনের স্বাধীনতা। মানবতার যথার্থ লক্ষ্য তো সেটাই। তার সঙ্গে পরে যুক্ত হয় সুফিদের রহস্যভাবনা, ধ্যান-জপ-অনুভবের একান্ত আত্মস্থ জগৎ। সেই আত্মস্থতা অর্জনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হল দেহ। দেহ মানে কামনাবাসনাবদ্ধ অস্তিত্ব, লোভে মোহে বন্দিসত্তা, আলস্যপ্রবণ, বিরামপ্রয়াসী, ভোগী আর ইহজগতের দাস। অথচ এই দেহকে ঘিরেই কায়াবাদীদের সাধনা। সুফিরা যে নিরন্তর জিকির আর মুরাকাবার সাহায্যে স্থিত হতে চান ‘ফানা’ স্তরে এবং তাকেই শাশ্বত করে হতে চান ‘বাকা’, তার জন্যে দেহের নিয়ন্ত্রণ দরকার। অর্জন করতে হয় দেহের ওপর মনের কর্তৃত্ব। সুফিসাধনায় সে রকম কিছু তরিকা আছে। দুটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানাই।
খুব ছোটবেলায় আমাদের শহরে বড় রাস্তার ধারে ধুলোয় বসে থাকত এক পাগল। সবাই তাকে পাগল বলেই জানত। কারণ লোকটি ছিল বাহ্যজ্ঞানহীন, নির্লিপ্ত স্বভাবের। একটা ছেঁড়া কাপড় আর জীর্ণ ফতুয়া পরে একমুখ দাড়ি গোঁফ নিয়ে সে দিনরাত বসে থাকত পথে। রোদে জলে ঝড়ে নির্বিকার। পুরো গ্রীষ্ম আর বর্ষা চলে গেল তার শরীরের ওপর দিয়ে। মানুষটি নির্বাক ও আত্মমগ্ন। পরে একদিন কোথায় উধাও হয়ে গেল। কোথা থেকে এসে কোথায়ই বা গেল কেউ জানল না। জানতে চেয়েছিলও কি? উন্মাদের নিজস্ব পাঠক্রমে আমাদের মতো মানুষের, উন্নতিকামী জীবের কীইবা কৌতূহল থাকতে পারে?
পরে, প্রায় চল্লিশ বছর পরে, বিশেষ এক সূত্রে জানতে পারলাম লোকটা পাগল ছিল না (যা সবাই ভেবেছিল) বা ব্রিটিশের গোয়েন্দা (কেউ কেউ বলত), ছিল সুফিপন্থার সাধক। তার মুর্শেদ তাকে শরীর চেতনা থেকে মুক্ত হবার জন্য ওই ভীষণ কষ্টকর তরিকা দিয়েছিলেন। পরে কলকাতার সেই মুর্শেদ তাকে নির্দেশ দেন মানুষ-টানা রিকশা চালাতে। সেই কষ্টও অতিক্রম করার পর তাঁর ভাবসাধনা ও জপধ্যানের অধিকার এসেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন কাদেরিয়া খান্দানের নাম করা পির ফকির। পার্ক সার্কাসের কবরখানায় রেললাইনের ধারে তাঁর ঐশী সমাধিতে এখনও ভক্ত সমাগম হয়।
এই সিদ্ধ সাধককে আমি দেখেছি আবার দেখিনি। চাক্ষুষ তো দেখেছি ছেলেবেলায়, স্কুল যাবার পথে। সত্যদৃষ্টি ছিল না, ভেবেছি উন্মাদ। আসলে দিব্যোম্মাদ, কিন্তু তা বোঝার বয়স হয়নি, কেউ বলেওনি। তাঁর মুখাবয়বটি পর্যন্ত মনে করতে পারি না, কিন্তু তাঁর সেই স্থির বসে-থাকা মূর্তিটি মনে আছে। নিশ্চয়ই আত্মস্থ। অন্তরে চলছিল অনুভবের সংলাপ তাঁর মাশুকের সঙ্গে। এসব কথা আমি জানতে পারি তাঁর মুরিদ নূর শাহ-র কাছে। পুরো নাম নূর শাহ বাবা। উর্দুভাষী ভিন্ন প্রদেশী মানুষ। সুফিসাধনার টানে এসেছিলেন তাঁর মুর্শেদ রজা শাহ বাবার চরণাশ্রয়ে।
নূর শাহ বাবাকে যখন দেখেছি তখন তাঁর বয়স সত্তরের কোঠায়, আমার চল্লিশ। অধ্যাপনা করি আর গ্রাম গ্রামান্তে খুঁজে বেড়াই বাউলবৈরাগী উদাসীনদের। ফকিরি পন্থার কিছুই জানি না। নূর শাহ বাবার সঙ্গে আমার-দেখা বাউলবৈরাগীদের কোনও মিল খুঁজে পেলাম না। মানুষটির মুখমণ্ডল সৌম্য ও প্রশান্ত। চোখ দুটি সুদূরসন্ধানী। সত্তরেও খাড়া নির্মেদ শরীর। একমুখ সাদা দাড়ি। মাথা পরিপাটি করে কামানো। পরনে সাদা ফতুয়া আর সাদা তহবন্দ, গলায় পাথরের মালা, হাতে তসবি বা জপমালা।
আমাদের শহরের এক ধনী মাড়বার নন্দন জীবনের অনেকটা অংশ ভোগসুখ আর ব্যাবসাবাণিজ্য করে কাটিয়ে হঠাৎ হয়ে পড়েন উদাসীন বৈরাগী স্বভাবের তাঁর অন্ত্য জীবনে। বরাবরই ভজন ও খেয়াল গাইতেন, শিখেছিলেন গুরুর কাছে নাড়া বেঁধে। বাড়িতে গৃহদেবতা গোপাল বিগ্রহকে ঘিরে মহাসমারোহে রাস ও ঝুলন উৎসব হত। কোন সূত্রে কার প্ররোচনায় কে জানে, তিনি হঠাৎ পার্ক সার্কাসে তিলজলায় গিয়ে নূর শাহ বাবার কাছে রহস্যনিমীল সুফিপন্থায় দীক্ষা নেন সস্ত্রীক এবং সাধনায় মগ্ন হয়ে পড়েন গভীর উৎসাহে। তাঁর বাড়িতেই আমি প্রথম নূর শাহ-র মতো উন্নত মার্গের সুফিসাধক দেখার সৌভাগ্য অর্জন করি। সৌভাগ্য, কেননা অত উচ্চস্তরের সুফি মুর্শেদ সকলকে দেখা দেন না, তাঁদের আস্তানায় প্রবেশাধিকার অর্জন তো অসম্ভব। ওই মাড়বার শিষ্যের বাড়িতে তিনি ক’দিন ছিলেন এবং সেই উপলক্ষে একসন্ধ্যায় বসেছিল কাওয়ালি গানের আসর। আসর বসেছিল সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ, শেষ হয়েছিল ভোর ছটায়। মনে আছে, তখন গ্রীষ্মকাল। আসরে আমি আমন্ত্রিত ছিলাম আরও ক’জন ভাগ্যবানের সঙ্গে।
