ইত্যবসরে ফকির গুরুরা তাদের আশ্রয় দেন। বোঝান, শরিয়তকে অতিক্রম করে মারফত পৌঁছতে হবে। তাতে বেহেস্ত না মিললেও ইহজীবনে সুখ শান্তি পরিতৃপ্তি মিলবে। আল্লাকে ধরো গুরু বর্জোকের প্রদর্শিত সরল অনুভবের পথে। রোজা বা দেহসংযমের চেয়ে আত্মসংযম অনেক জরুরি। দম আর শ্বাসের কাজ গুরুর কাছে বুঝে নিয়ে কায়াসাধন করে সন্তানের জন্মরোধ কর। ঊর্ধ্বরেতা হও। সন্তান মানেই শরিক। শরিক মানেই তোমার ব্যক্তিগত শান্তি স্বস্তির অবসান। অভাব, দারিদ্র্য, কান্না, অসুখ, শোক, তাপ, দুঃখ। এরপরে আছে মুর্শেদের বলা দারুণ সব যুক্তির প্যাঁচ। তারা রঙ্গ করে বলেন, ‘আরে বোকা শোন, সারাদিন উপোসী থেকে রাতে খেয়ে যদি আল্লাকে পাওয়া যায় তবে মানুষের চেয়ে অনেক আগে বাদুড়রা বেহেস্তে যাবে, তাই না?’ ‘আর হজ? সেকি গরিবের জন্যে? কতদূরের পথ, কত টাকার ব্যাপার। ওসব বড়লোক শরীফ আদমিদের ব্যাপার স্যাপার। কেন গরিব কি আল্লাকে পাবে না? সবখানেই তো আল্লা, তবে মক্কা যেতে হবে কেন? আল্লা গরিবেরও। এই দেহই মক্কা। এই দেহ-মক্কাতেই নিয়েত বাঁধ্। মুর্শেদকে ধর্।’ এই সব বলে মুর্শেদ গান ধরেন কিংবা কোনও শিষ্যকে দিয়ে গাওয়ান :
এই দেহ মিথ্যে নয় মন
এই দেহেই আছে আছে রতন।
এমন গান শুনলে কার না মন ভিজবে? শিষ্য তখন গুরুকে জিজ্ঞেস করে, এই গান করা ‘না-জায়েজ’ বলেন মোল্লা-কাজিরা। অথচ গান করতে, গান শুনতে খুব মিষ্টি লাগে, মন ভরে যায়। গান গাওয়া কি হারাম?
গুরু তখন দুদ্দু শাহ-র লেখা একখানা মোক্ষম গান শোনান। তাতে বলা হচ্ছে :
গান করিলে যদি অপরাধ হয়
কোরান মজিদ কেন ভিন্ন এলহানে গায়?
আরবি পাৰ্শি সকল ভাষায়
গজন মর্সিয়া সিদ্ধ হয়।
বেহেস্তের সুর নাজায়েজ নয়
দুনিয়ায় কেন হারাম হয়?
এমনতর যুক্তির কাছে মোল্লাদের অনুশাসন কেমন করে দাঁড়াবে? আরবি পারশি ভাষায় লেখা গজল বা মর্সিয়া গান যদি এত সমাদর পায় গুণীসমাজে, শ্রোতাদের ভাল লাগে, তবে বাংলা ভাষার গানে দোষ কোথায়? তার চেয়েও বড় কথা, স্বর্গে গান যদি নিষেধ না হয় তবে মর্ত্যে কেন তা অপবিত্র বা নিষিদ্ধ হবে? কাজেই গান করো প্রাণ ভরে। নামাজ রোজা জাকাতের পণ্ডশ্রম না করে গানে গানে তাঁকে ডাকো। লালন বলেছেন :
শুনতে নাই আন্দাজি কথা
বর্তমানে জানো হেথা।
হেথা মানে সুখদুঃখে ভরা আমাদের বড় প্রিয় এই মর্ত্য পৃথিবী। যাতে আমরা বর্ত রয়েছি। এবারে গুরু একটু একটু করে মুরিদকে বোঝাবেন—
আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে।
তারপরে বলবেন :
মানুষ-মক্কা মুরশিদ পদে।
এসবই লালনের বাণী, ফকিরের মধ্যে সেরা ফকির। সেই লালন আরও এক পা এগিয়ে যা বলেছেন তার তাৎপর্য অপরিসীম। বলেছেন :
পড়গে নামাজ ভেদ বুঝে সুঝে—
বরজখ নিরিখ না হলে ঠিক
নামাজ আরও মিছে।
ভেদ মানে রহস্য। নামাজের মূল রহস্য মসজিদে ওঠাবসা নয়, মানবদেহই মসজিদ। গুরু বরজখের কাছে নিরিখ ঠিক না করে যে বাহ্য-নামাজ তা মিথ্যা, ভ্রান্তিপূর্ণ। এইবারে এইখানে লিয়াকতের সংগ্রহ করা চমৎকার গানখানি শোনা যেতে পারে। শাসপুরের সেই মেটে চালাঘরের নিরাভরণ ফকিরি মসজিদে জালাল শাহ আর তালেব শাহ দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছিলেন:
আল্লা কি মসজিদ বানাইলেন দুনিয়ার ভিতরে
তিন গম্বুজ তিনটি সিঁড়ি ভিতরে তার খোদার ঘড়ি
রেখেছে নয় দরজা ছয়জনা মৌলবী ফিরে
আল্লা কি মসজিদ…
খাঁটি দেহতত্ত্বের গান। শরীরের নয় দরজার (দুই চোখ, দুই নাসারন্ধ্র, দুই কান, মুখবিবর, পায়ু ও উপস্থ) প্রসঙ্গ এদেশের দেহবাদীদের খুব পুরনো কথা, কিন্তু ছয়জন মৌলবি বলতে যে শরীরের ছয় রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) বোঝানো হয়েছে যেটা রীতিমতো ব্যঙ্গমূলক। এ হল ফকিরদের তরফ থেকে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ উম্মা ও জেহাদ। এর ভাঁজে বলার কথাটা হল শরীরের ভেতরকার রিপুদের যেমন দমন বা পরিত্যাগ করতে হবে, তেমনই মৌলবিদেরও। এরপরে গানের শেষের কথা হল :
দেহের মসজিদে নামাজ পড়লে রত্ন মিলে—
সেই মসজিদের মতল্লি হয়ে
থাকো তাহার মসজিদ আগলে।
‘দেহ-মসজিদ’ ‘দেহ-মক্কা’ ‘দেল-কেতাব’ এসব উচ্চারণ ফকিররা পরপর গেঁথে দেন। এই পরম রত্নময় দেহকে রক্ষা করতে হবে, থাকতে হবে আগলে। মুর্শেদের সেটাই নির্দেশ।
শরিয়তনিষ্ঠ মুসলমানদের যে-পাঁচরোক্ত নামাজ পড়তে হয়, ফকিরদের নামাজ সে ব্যাপারে ভিন্ন নির্দেশ দেয়। লালনের গানে বলা হয়েছে :
পড় রে দায়েমি নামাজ এ দিন হল আখেরি।
মাশুক রূপ হৃদয় রেখে
দেখ আশক বাতি জ্বেলে
কিবা সকাল কিবা বিকাল
দায়েমির নেই অবধারি।
এ হল ভাবের নামাজ, শ্বাস নিয়ন্ত্রণের শরীরী সাধনায় সর্বক্ষণ অন্তরে চলবে ‘দায়েমি’ নামাজ, তার সকাল বা বিকাল কেন, কোনও কালাকালই নেই। উপাস্যের প্রেমময় রূপ হৃদয়ে প্রস্ফুট রেখে, প্রেমের প্রদীপ জ্বেলে নিরন্তর সাধনাই প্রকৃত নামাজ। শরিয়তি নামাজ হল বাহ্য ও পোশাকি।
ফকিরি পন্থায় নানা যুক্তি-বুদ্ধির কৌশল দেখা যায়, সমন্বয় ও উদারতার কথাও থাকে, প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ না থাকতেও পারে, থাকে প্রচ্ছন্ন নির্দেশ। যেমন একটা গানে বলা হচ্ছে :
মুরশিদ ভজনা বিনে ও জীবের উপায় নাই—
রোজা নামাজ হজ্জ জাকাত মানা কিছু নাই
মুরশিদ ভজনা বিনে জীবের আর গতিক নাই।
