পর্যালোচনা করে এটা বোঝা গেল যে, সুফিরা ভাবসাধক ও আত্মস্থ। ইসলামের নানা কর্মকাণ্ড ও আকিদা-র বাড়াবাড়ির চেয়ে তাঁরা নিভৃত নির্জনে একক ধ্যানে ও অনুভবে একীভূত হতে চান এবং সেই একীভূত অবস্থাতেই থেকে যেতে চান বরাবরের জন্য। দিব্যোম্মাদ সুফিরা অন্তঃস্পন্দে এতটা নির্ভরশীল যে ভাবাবিষ্ট হয়ে গান গেয়ে ওঠেন, যখন তখন। সেই গানকে বলে ‘সামা’। অথচ শুদ্ধতাবাদী ইসলামে গান গাওয়া নিষিদ্ধ। সুফিদের দর্শন আর আচরণ থেকে বোঝা যায় তাঁরা ঠিক ইসলাম বিরোধী নন। কিন্তু শরার নির্দেশে অনন্যশরণ নন। সুফিবাদকে কেউ কেউ ‘Interpretation of Islam’ বলেছেন কেউ বলেছেন ‘parallel faith’। আসলে সুফিবাদ ইসলামের এক ভিন্ন দিশা, যা মুক্তমনা ও বিচারশীল মুসলমানদের ভাবাশ্রয় দিয়েছে বহুদিন ধরে। বলা বাহুল্য এদেশে ফকিরি মত গড়ে উঠেছে বহুলাংশে সুফিবাদের অনুপ্রেরণায়।
এ ধরনের আলোচনায় সব সময়ে একটা সরলীকরণের ঝোঁক এসে যায়। যেমন কত সহজে বলে ফেলা গেল ইসলাম মূলত কর্মবাদী আর সুফিরা ভাবমার্গের সাধক। মন্তব্যের মধ্যে বেশ ফাঁক থেকে গেল নাকি? বহু নৈষ্ঠিক মুসলমানকে দেখেছি নামাজ রোজা পালন করে আত্মতৃপ্ত ও শান্ত। তবে এটা ঠিক যে ইসলামের ভিত্তিমূলে আছে শাস্ত্রের অনুশাসন ও আচরণবাদের বাধ্যতা। নামাজ পড়তেই হবে, বছরে অন্তত ঈদের দিনে রোজা রাখা উচিত, এমনতর অনুজ্ঞা সকলের পক্ষে রোচক না হতেই পারে। যাঁরা এসব মানেন না, তাঁদের ধর্মনেতারা ভয় দেখান— দোজখের ভয়। সমাজে নিন্দামন্দ রটে। কিন্তু অদৃশ্য এক ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করতে কারুর যদি অন্তর না মানে? পশ্চিমদিকে তাকিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে সমবায়ী ধর্মাচরণে কেউ যদি অনীহ হন? আল্লার রূপ চেহারা নেই, তাই সাধারণ মানুষ যদি তার বন্দনা না করে প্রত্যক্ষ বাস্তব দেহধারী সদাচারী ও বান্ধব মুর্শেদের কাছে অবনত হন, যদি তাঁকে ‘সেজদা’ (প্রণতি) দেন তবে মৌলবিরা খুশি হন না— কিন্তু মানুষটির তো আত্মপ্রসাদ ঘটতে পারে। কুবির গোঁসাইয়ের একটা পদে আছে :
নামাজ পড় যত মোমিন মুসলমানে—
আল্লাজি সদর হন না দিদার দেন না
সেজদা কর কার সামনে?
মোমিন মানে ধর্মনিষ্ঠ, সদর মানে প্রকাশ্য, দিদার মানে দর্শন, সেজদা মানে প্রণিপাত। সরল অর্থ এই দাঁড়াল : হে ধর্মনিষ্ঠ মুসলমানগণ, তোমরা নামাজ পড়ছ কিন্তু তোমাদের উপাস্য আল্লা তো নিজেকে প্রকাশ করেন না, দেখা দেন না, তা হলে প্রণতি কর কাকে?
প্রসঙ্গত মনে পড়ল, একবার নদিয়া জেলার হাঁসপুকুর গ্রামে আবু তাহের ফকির নামে এক তাত্ত্বিকের ডেরায় সারাদিন ছিলাম। সেখানে তাঁর এক ফকির শিষ্য জলিলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সে মুসলমান হয়েও শরিয়ত ছেড়ে মারফতি ফকির হয়েছিল। আবু তাহেরের বায়েদ (শিষ্য) জলিল একজন সাধারণ অশিক্ষিত কৃষিজীবী। কেন ইসলাম ছেড়ে সে ফকিরি পথ নিয়েছে জানতে চাইলে সে খুব স্পষ্ট ভাষায় আমাকে বলেছিল, ‘বাবু, আন্দাজি ধর্মে আমার পেট ভরলো না। তার চেয়ে সামনে এই যে খাড়া রয়েছেন গুরু বর্জোক, আমার সুখে দুখে সর্বদা আছেন, কত ভালবাসেন, কাছে এলে শান্তি পাই, দুদণ্ড বসি, দুয়েকটা ভালো কথা উপদেশ শুনি— এই আমার ভালো।’
আন্দাজি ধর্ম কথাটা বেশ দ্যোতক। বর্জোক অর্থে ‘বরজখ’ অর্থাৎ উপাস্য আর উপাসকের মধ্যেকার ব্যক্তি যিনি। সাধারণ মানুষের ধর্মোপলব্ধি ও ধর্মধারণার সারল্য জলিলের বাক্যে সুন্দর ফুটে উঠেছিল। এ যেমন সরল সত্য তেমনই কৌশলী বিবরণ এবারে দেব। বহরমপুরে একটি মুসলিম যুবার কাছে গণসংগীত শুনছিলাম। তাকে হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি মুসলমান?’ সে আমাকে অবাক করে উত্তর দিল, ‘ক্লাস নাইন পর্যন্ত ছিলাম। তারপরে আর আচার-আচরণ পালন করি না। তেমন বিশ্বাসের জোর নেই। জাত ধর্ম বর্ণ এসব মানি না তো।’ না, তার কোনও অসুবিধা হয় না। গা ঢাকা দিয়ে থাকে মোল্লাদের দৃষ্টির আড়ালে। এরপরে সে নিজের থেকে বলল, ‘তবে ঈদের নামাজের দিন বেশ লুকোচুরি চলে! শুনবেন মজা? আমার বাড়ি হল গ্রামে, কান্দিতে। ভোরে উঠে বহরমপুর থেকে পালাই। ভাই বেরাদাররা প্রশ্ন করে, “ঈদের নামাজ পড়বে না?” তাদের বলি, “গাঁয়ে গিয়ে পড়ব সেইজন্যে যাচ্ছি।” তারা নিশ্চিন্ত হয়। এরপর কান্দিতে পৌঁছলে বয়োজ্যষ্ঠরা জিজ্ঞেস করেন, “বাপ, নামাজ পড়বে না?” আমি বলি, “সে তো সকালেই পড়ে এসেছি বহরমপুরের বড় মসজিদে।” তাঁরাও নিশ্চিন্ত হন। আসলে কি জানেন আমাদের ধর্ম খুব কড়া। সকলে নজরদারি রাখে। কিন্তু আমি ফাঁক দিয়ে পালাই। বুঝলেন তো?’
এমন স্পষ্ট কথা না-বোঝার মতো কি? সাধারণ মানুষ, কি হিন্দু কি মুসলমান, চায় নিজের মতো করে বাঁচতে। হ্যাঁ, তাদের ধর্মভয় আছে, স্বৰ্গনরকের অস্পষ্ট ধারণাও আছে, তবু মানুষ সুযোগ সুবিধা পেলে ফাঁকি দেয়, এটা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে এমনি মানুষকে নানা বাধাবন্ধ নিষেধ আর অনুশাসন মেনে চলতে হয়, কত লড়াই কত প্রতিবন্ধ, তাকে পেরিয়ে খুঁজে নিতে হয় আনন্দের রসদ, রঙ্গ ব্যঙ্গ কৌতুক। ধর্মের বিধান যদি তার মধ্যে এসে আরও এক প্রতিকূলতা গড়ে তোলে— স্বচ্ছন্দ জীবনপ্রবাহের মধ্যে মন্ত্র, শাস্ত্র, মন্দির, মসজিদ, পুরোহিত, মোল্লা এসে পড়ে, আসে ধর্মের আচারগত বাধ্যতা তবে ভেতর ভেতর একটা দ্রোহ আসে। প্রতিবাদের এক ক্ষীণ সাহস জাগে। তারপরে কোথাও সেই দ্রোহের সমর্থন পেলে জলিলের মতো ইসলামের আচারকৃত্যে সংশয়ী মানুষ ঢুকে পড়ে সেখানে। তা ছাড়া গরিব খেটে খাওয়া মানুষ তার প্রত্যক্ষ প্রতিদিনের জীবনে দেহগত অনুভব আর ইহগত অস্তিত্বকে বেশ বুঝতে পারে— তাতে কোনও আন্দাজি বিষয় নেই, কল্পনাও লাগে না। তার জায়গায় অদৃশ্য ঈশ্বরানুভূতি, তার উপাসনার নানা নটিখটি, মসজিদে যাবার বাধ্যতা, কঠোর শ্রমকিণাঙ্ক দিনপাতের মধ্যে সারাদিন নির্জলা রোজা রাখা ভাববিলাসিতা কিংবা অর্থবানদের ব্যাপার বলে মনে হতে পারে। এই রকম ভাবনা থেকেই একজন লোককবি লিখেছিলেন : ‘নামাজ আমার হইল না আদায়/ নামাজ আমি পড়তে পারলাম না বিষম খান্নাতের দায়।’ খান্নাত মানে অভাব।
