মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সুফিবাদ ইসলামের ঠিক উপজাত নয়, বরং সমান্তরাল বিশ্বাস।
কিন্তু এসব তত্ত্ব বা তথ্য বিশদে জানতে গেলে বা তার অন্তর্বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমে ইসলাম সম্পর্কে খানিকটা ধারণা গড়ে নেওয়া দরকার। জানা যাচ্ছে:
‘ইসলাম’ মূলে এক আরবি শব্দ, যার মানে শান্তি আর আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণ কার কাছে? একটা বিশ্বাসের কাছে। যে-বিশ্বাসের উচ্চারণ হল, আল্লা অদ্বিতীয় এবং তাঁর সব নির্দেশ সম্পর্কে প্রশ্নাতীতভাবে অনুগত থাকা। এই আত্মসমর্পণের যে প্রশান্তি সেটাই ইসলাম শব্দের লক্ষ্য। তাই যারা আত্মসমর্পণকারী তারাই ‘মুসলমান’। অর্থাৎ মুসলমান এই আরবি শব্দের মানে আত্মসমর্পণকারী।
এবারে বোঝা দরকার ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে আছে কতকগুলি ‘আকিদা’ বা বিশ্বাস। মুসলমান হতে গেলে কতকগুলি বাক্য মুখে বলতে হয়, অন্তর দিয়ে সেই বাক্যে বিশ্বাস করতে হয় এবং সেই বিশ্বাসের বশে আচরণ করতে হয়—একেই বলে ‘কলেমা’। কলেমার পাঁচটি ভাগ, তার প্রথম ভাগকে বলে ‘কলেমা তৈয়ব’। কলেমার এই প্রথম পাঠের আরবি শব্দবন্ধের বাংলা বয়ান হল আল্লা ছাড়া কোনও উপাস্য নেই এবং মহম্মদ তাঁর প্রেরিত রসুল। রসুল মানে দূত। আল্লার পবিত্র বাণী রসুলের দ্বারাই প্রচারিত।
ইমানদার মুসলমানদের পক্ষে বেশ ক’টি কৃত্য বা করণীয় কাজ আছে, তা ‘ফরজ’ অর্থাৎ অবশ্যপালনীয়। প্রথম কৃত্যকে বলে ‘কলেমা’, দ্বিতীয়টি ‘নামাজ’, তৃতীয় ‘রোজা’, চতুর্থ ‘জাকাত’ এবং পঞ্চম হল ‘হজ’। এই পাঁচটি অবশ্য পালনীয় কাজকে বলে ‘পঞ্চবেনা’ অর্থাৎ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। কলেমায় আস্থা বা বিশ্বাসস্থাপন ব্যাপারটা আগে বলা হয়েছে। ‘নামাজ’ হল ভোর থেকে রাতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে দিনে পাঁচবার মসজিদে বা ঘরে বা যে যেখানে আছে সেখানে নামাজ পড়া। তার কতকগুলি বাঁধা নিয়ম ও কসরত আছে, সেগুলি শিখে নিতে হয়। শুক্রবার দুপুরে মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ বিশেষভাবে করণীয়। ‘রোজা’ হল সূর্যোদয়ের আগে থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস— একমাস ব্যাপী— যা চান্দ্রমাসের গণনা করে নির্দিষ্ট হয়। ‘জাকাত’ মানে দান। ধর্মাচারী মুসলমান তার উদ্বৃত্ত রোজগারের চল্লিশ ভাগের একভাগ দান করে। ‘হজ’ হল ধার্মিক মুসলমানের তীর্থযাত্রা, জীবনে অন্তত একবার, বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে যেতে হয় মক্কা শরীফের উদ্দেশে।
এ সমস্তই ইসলামের ব্যাবহারিক আচরণবিধি, যার নিয়ন্ত্রণ থাকে ধর্মীয় মোল্লামৌলবিদের শক্ত হাতে। প্রকৃত ইমানদার মুসলমান এই পঞ্চকৃত্য পালন করে অন্তরে শান্তি পান কিন্তু বিচারশীল ও ভাবুক মুসলমানদের মধ্যে অনেকে এ সব কৃত্যের মধ্যে ‘কলেমা’ ছাড়া অন্যগুলিকে নিতান্ত বাহ্যিক কিংবা লোকদেখানো বলে মনে করেন; বিশেষত ফকিরি পন্থার অনুগামীরা এ ধরনের বাহ্য আচরণকে প্রতিবাদ শুধু নয়, খানিকটা উপহাস করেন। যেমন লালন বলেছেন :
পাঁচরোক্ত নামাজ পড়ে
শরা ধরে কে পায় তারে?
এখানে ‘শরা’ মানে শরিয়ত। ফকিরেরা শরিয়ত মানেন না তাই গোঁড়া মুসলমানরা তাঁদের বলেন ‘বেশরা’। আল্লা অদ্বিতীয় ও একমাত্র উপাস্য কলেমার এই বিশ্বাস না মেনে ফকিররা গুরু বা মুর্শেদকেও মানেন। এমনকী বলেন ‘যে হি মুরশেদ সে হি খোদা।’ এতো মারাত্মক কথা। আল্লার শরিক আছে একথা ঘোর অনৈসলামিক। ইসলাম বিশ্বাস করে আল্লা লা-শরিক, তাঁর শরিক নেই। ফকিররা সেটা না মেনে গুরুকে আল্লার শরিক করেন বলে মোল্লারা তাঁদের বলেন ‘শের্ক বা মুশরিক’— বলেন ‘বেদ্বীন’ অর্থাৎ ধর্মহীন।
এমনতর সওয়াল-জবাব, তর্ক কূটতর্ক নিয়ে পরে ভাবা যাবে, তার আগে জেনে নেওয়া দরকার, ইমানদার মুসলমানদের সমান্তরালে যে সুফিবাদ গড়ে উঠেছিল তাদের ধর্মকর্ম আচার বিশ্বাস কী ধরনের ছিল। ইসলামের ক্রিয়াকরণের বাস্তবতা ও বাধ্যতা অনেক ভাবসাধকের ভাল লাগেনি। অদৃশ্য উপাস্যের সঙ্গে অন্তরের ঘনিষ্ঠতা অর্জনের আবেগে সুফিরা ধ্যানের পথ নিতে চাইলেন। রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়,
তার পক্ষে একমাত্র শরিয়ত (কলিমহ্, নামাজ, রুযহ্, হূজ, যকাত্) মেনে খাঁটি মুসলমান হিসাবে ধর্মীয় পরিচয়ের নির্দিষ্ট কোনো বাতাবরণে থাকলেই চলে না, তার চাই মর্মের সাধন অর্থাৎ ‘ত্বরিক্কত’।…শরিয়তের পঞ্চাঙ্গ কর্মের মতোই সুফিরাও তরিকতের ত্রিবিধ কর্ম সম্পাদনে ব্রতী হয়। ‘জিক্র্’ অর্থাৎ জপ, ‘রাবিতা’ অর্থাৎ সংযোগসূত্র এবং ‘মুরাক্কিবহ্’ অর্থাৎ সতত জপ করার সঙ্গে সংসার অনাসক্ত মনকে শুদ্ধ করে রাবিতা অর্থাৎ সংযোগসূত্র বা গুরুর মাধ্যমে বিশুদ্ধ মনে শান্ত হয়ে আল্লার ধ্যান অর্থাৎ মুরাক্কিবহ্ করে আলোকময় পরমে (নূর) নিজেকে বিলীন করতে অহং লোপ হলো সবিশেষ জরুরি। অহং লুপ্ত ‘ফনা ফিল্লাহ্’ অবস্থাও শেষ নয়, সেই অবস্থার ভেতর শাশ্বত হয়ে থাকা অর্থাৎ ‘বক্কা বিল্লাহ্’ হল শেষ পরিণতি।
নানারকম আরবি শব্দের ঝংকারে পাঠকদের অস্বস্তি লাগতে পারে। তাই ওই সব শব্দের লোকায়ন ঘটে যেসব সরল শব্দ তৈরি হয়েছে সেগুলি ব্যবহার করলে সুবিধা হবে। প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক সাধনার চারটি পথ— শরিয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারফত। শরিয়ত মানে যা শরাসম্মত। ধার্মিক মুসলমানরা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যেসব বিধান মেনে চলেন সেগুলি ‘কোরান’ ও ‘হাদিস’ থেকে পাওয়া। এ ধরনের বিধানগুলিকে একত্রে বলে ‘শরিয়ত’। ‘তরিকত’ মানে যা বিভিন্ন তরিকা বা মার্গসম্মত। ‘হকিকত’ অর্থে যা হক (ন্যায়) সম্মত। আর ‘মারফত’ বা মারিফত হল অধ্যাত্ম জ্ঞানের পথ। সুফিরা নেন তরিকতের মার্গ। এ পন্থায় জিকির সহযোগে মুরাকিবা বা সতত সাধনার সাহায্যে পরম প্ৰেয়র সঙ্গে অভেদ হওয়ার প্রয়াস পান সাধক। এই প্রয়াসে ‘ফানা’ বা অহং লুপ্ত হওয়াই চরম নয়, শেষ কথা হল ‘বাকা’ অর্থাৎ ফানায় চিরন্তন হয়ে যাওয়া।
