এ জন্যই কি পণ্ডিতদের টীকাভাষ্য পুস্তককে ফকিররা গুরুত্ব দিতে চায়ই না, উল্টে বিরোধিতা করে? এমনকি শাস্ত্রকেও তারা গুরুত্ব দিতে নারাজ।
লিয়াকতের এ-জাতীয় অনুভব ও অনুধাবনে অনেক সংগত কথাই উঠেছে কিন্তু তার সঙ্গে আরও দুয়েকটা কথা আমরা তুলতে পারি।
প্রথমেই বলা দরকার ফকিরিপন্থা কোনও ধর্ম নয়, বরং একটি বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের পথে সভাবে থেকে জীবনাচরণ। সেই জায়গাটায় কিন্তু কোনও সংশয় বা তর্ক নেই— একেবারে সবল আর দ্বিধাহীন উচ্চারণ। স্পষ্ট করেই বলা— এটাই মসজিদ, এটাই ইবাদতখানা, এটাই সঠিক পথ এবং ওরা ভ্রান্ত, ওরা অন্ধ, ওরা আচার-সর্বস্ব। ওদের মূলেই গন্ডগোল। স্ববিরোধিতা ও অধার্মিক হালচাল পদে পদে। লিয়াকত চমৎকার এক উদাহরণ দিয়েছে।
ঈদে বা বকরীদে প্রায় সব মুসলমান যায় ঈদগায়ে নামাজ পড়তে। তাদের সঙ্গে যায়। অনেক ছোট ছেলেমেয়ে। নামাজের সময় তারা মাঠের বাইরে থাকে। নতুন রঙচঙে পোষাকে শিশুবালকদের এই অনামাজী আনন্দউজ্জ্বল সমাবেশও উৎসবের এক উপরী পাওনা। এটা হলে ভাল ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। এই শিশু-বালকদের অনেককে বড়দের খুলে রাখা জুতো-চপ্পল আগলানোর ভার দেওয়া হয়, যাতে চুরি হয়ে যায়। পয়সার বিনিময়ে তারা অচেনা লোকেরও চটি-জুতো আগলায়। এখানে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ুক না পড়ুক, ঐ পবিত্র দিনটাতে ঈদগায়ে উপস্থিত হয় সকল নামাজী। এই নামাজীরাও তাদের মধ্যে ঢুকে থাকা চোর সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ। ঐ পবিত্র দিন, ঐ পবিত্র নামাজ পাঠ, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মানুষের ভিতরের আবর্জনাকে পরিষ্কার করা দূরে থাক ধামাচাপা দিতে পারেনি। শরিয়তের বাহ্য আচরণ পালনে যে মানুষের চারিত্রিক ত্রুটিগুলি দূর হয়ে যায় না, এর থেকে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? ফকিরেরা তাই বলে—যতই পড়ো লোকদেখানো শরার নামাজ, মারফতি চেতনা ছাড়া না হবে তোমাদের নামাজ, না হবে তোমরা মানুষ। মারফত-ই আত্মপরিচয়, যা না পেলে যতই পড়ো সে শুধু কাগজ আর কালি— জীবন সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান হবে না।
এসব তাদের চাপা কথা নয়, প্রকাশ্য। এ কথা তারা বলে, বলছে চিরকাল। অগ্রাহ্য করছে শরিয়তের অনুশাসন, যাচ্ছে না মসজিদে, রাখছে না রোজা। বিবাহ দিচ্ছে নিজেদের মধ্যে, কবর দিচ্ছে নিজের জমিতে। এতে গোঁড়া মুসলমানদের ক্রোধ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তার ফলে ফকিরদের একতারা ভেঙে, দাড়িগোঁফ কেটে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে, সমাজে একঘরে করে এমনকী শারীরিকভাবে নিগ্রহ করে, তাদের গ্রাম্যবাস্তু থেকে তাড়াতে চায়।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পশ্চিমবঙ্গে বাউলরা অতটা বিপন্ন নয়, যদিও তারা ফকিরদের বিপন্নতায় মথিত ও সমব্যথী। বাউলরা কেন নিগ্ৰহমুক্ত তার একটাই কারণ—তাদের মধ্যে প্রতিবাদী অংশ ততটা নেই।
ফকিরিপন্থার সুচনাই হয়েছে একরকম দ্রোহ বা প্রতিবাদ থেকে। একে বলা যেতে পারে গূঢ় অন্তর্দোহ এবং তা ইসলামি শরিয়তি নির্দেশের বিরুদ্ধে। ফকিরদের এই অন্তর্দ্রোহের ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সুফিদের সাধনায়। ইসলামের বাহ্য আচারের বিরুদ্ধে সুফিরাই প্রথম অন্তর্দীপ্ত ও আত্মস্থ হবার আহ্বান জানায় শুষ্ক শাস্ত্রগ্রন্থের নির্দেশ একদিকে, আরেকদিকে তাদের সজীব অনুভবেদ্য গহন জীবনের আমন্ত্রণ। উপাস্যকে তারা পেতে চায় প্রেমে, তাই ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি, লোকদেখানো নামাজ রোজা জাকাত ও হজ তাদের কাছে গৌণ। ধর্মনেতাদের অনুশাসনের চেয়ে আত্মার নির্দেশ সুফিদের কাছে অনেক বড়। বিজ্ঞজনের ধারণা :
ঈশ্বরের সহিত মিলনাভিসারী সাধককে সুফীরা বলেন ‘পর্যটক’ এবং মানবের ঈশ্বরলাভের প্রচেষ্টাকে বলা হয় ‘পর্যটন’। পর্যটক হইবার জন্য গুরুর (‘শেখ’ বা ‘পীর’) নিকট হইতে সুফীসাধনমার্গের নিগূঢ়তত্ত্ব শিক্ষা করিতে হইবে। তাঁহার যোগ্যতায় গুরু সন্তুষ্ট হইলে তাঁহাকে দীক্ষিত করিবেন এবং তালি দেওয়া পোশাক (বৈরাগ্য ও দারিদ্র্যের চিহ্ন) দিবেন।
ধর্মসাধনাকে যখন বলা হয় পর্যটন এবং সাধক যেখানে পর্যটক, সেখানে অনুক্ত কথাটি হল এই ভ্রমণ আসলে খাড়াখাড়ি বা ঊর্ধ্বগ। নিজের শরীর-মন-সত্তাকে উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে গেলে পার্থিবভাবে ভারমুক্ত হতে হবে— অর্থাৎ বিষয়বৈভব সাজসজ্জা ত্যাগ করা দরকার। সেইজন্য গুরু শিষ্যকে দেবেন সরল অঙ্গবাস, যাতে কোনও জেল্লা নেই, দৃশ্যতও যা বৈরাগ্যসূচক। নানা টুকরো কাপড়ের তালি, অনেকের মতে, ঔদার্যের ব্যঞ্জনা। নানা মত নানা পথের উদার সমীকরণ করে এই সুফিপন্থা গড়ে উঠেছে।
এসবই অনুমানের কথা। সুফি কথাটা নাকি এসেছে ‘স্বূফ’ থেকে। শব্দটি আরবি, অর্থ হল পশম। তার মানে এদেশে প্রথম যখন সুফিরা এসেছিলেন তখন তাদের পরনে থাকত পশমের জোব্বা। তারপরে গ্রীষ্মপ্রধান ভারতে পশমের বিকল্পে এসে গেছে তালিদেওয়া সুতি আলখাল্লা। সুফি-সন্ত-বাউলদের নিয়ে নিবিড় গবেষণা করে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন :
পশমের পোশাক-পরা লোকজনরা ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিলাসিতাহীন, অনাড়ম্বর এবং অনাসক্ত জীবনের প্রতীক ছিলেন। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর নিজেও এই পশমি পোশাক বা জোব্বা পরতেন। আদর্শ খালিফাদের পর যখন ইসলামে আড়ম্বর, বিলাসিতা এবং ইহলৌকিক আসক্তি বাড়তে থাকল, তখন একদল মানুষ ব্যক্তিগত আচার-আচরণের মাধ্যমে সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে পালটা আদর্শ হয়ে দাঁড়ালেন। সরব হয়ে নয়, নিরুচ্চারভাবেই এই সংখ্যালঘু মানুষজন বিশাল এক জাতির সামনে তাদের আড়ম্বরপূর্ণ, বিলাসপ্রিয়, ভোগাসক্ত জীবনের বিপরীত মেরুতে নম্র প্রতিবাদ হয়ে রইলেন নির্জন সাহসে৷ এঁরাই তখন ‘সুফি’ বা পশমের জামা-পরা লোক হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেন।
