আভাসে ইঙ্গিতে ফকির এমন দু’ একটা কথা বলেছিলেন, আমার পক্ষে বোঝা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল ঠিক কি বলছেন। একটু তফাতে চুপচাপ বসে অন্য একজন ফকির কথাগুলো শুনছিল। বেশ বয়স্ক, চুলদাড়ি সব শাদা। হতাশ হয়ে যখন উঠে চলে যাচ্ছি, বুড়ো ফকির আমাকে ডাকল। …কিছুক্ষণ অন্তর্ভেদী চোখে আমাকে দেখে বলল, ‘শোনো বাবা, ফকির-বাউলের সঙ্গ করো সেটা কথাতেই টের পাচ্ছি। ভাল। তবে কি জানো, ভেতরের খবর সবাই জানে না, জানলেও দেবে না। দেওয়ার নির্দেশ নেই। বাইরে থেকে যা জানার অনেকটাই জেনেছ— এরপর যদি জানতে চাও ফকির-বাউলের পেছন পেছন ঘুরে আর লাভ হবে না। গুরু ধর। মুরশীদ ছাড়া কোনোভাবে আসল ভেদ পাবে না।’
দুজনেরই আমাদের একই অভিজ্ঞতা হল কেন? কারণ, একটা জায়গায় বাউল-ফকিররা মিলেমিশে গেছে। সেটা তাদের সাধনার ক্ষেত্রে। বাউলদের খানিকটা বাহ্য খানিকটা গোপ্য। ফকিরদের খানিকটা জাহির খানিকটা বাতুন। অর্থাৎ আধেক প্রকাশ্য আধেক গোপন।
কথাটা হয়তো ভুলই বলা হল— ব্যাপারটা ঠিক আধাআধি নয়। অনুপাত হবে চার ভাগের একভাগ প্রকাশ্য, তিন ভাগ গোপন। এই গোপনকে জানতে গুরু লাগে, দেহ লাগে, নারী চাই, চাই আত্মসংযম। কিন্তু দুনিয়াদারি তো আছে— বেঁচে বর্তে থাকার নানা কৌশল। বাউলদের এই দুনিয়াদারি বেশ দৃষ্টিনন্দন। আলখাল্লা, পাগড়ি, কোমরবন্ধ— একহাতে একতারা কোমরে বাঁধা বাঁয়া। পায়ে ঘুঙুর, শরীর ভরা নৃত্যনাট্য। তাকে জানতে গেলে এই নাট্যকে ভেদ করতে হবে। ক’জন পারে? সবাই তো গানে মজে যায়। ঢলে পড়ে আত্মহারা গায়ন শুনে। কেউ কেউ তাদের গানের নাম দিয়েছে শব্দ গান। সত্যিই তো শব্দের ছটা। তার দীপ্তিতেই শ্রোতারা মুগ্ধ, বিবশা গানের ভেতরে লুকিয়ে রাখা সত্যকে ক’জন বোঝে? সেই যে একজন আমাকে শুনিয়েছিল :
পানি থেকে বরফ হয়
বরফের মধ্যে পানি রয়—
বরফ কিন্তু পানি নয়
পানি কিন্তু বরফ নয়।
এতো শব্দের খেলা নয়, হেঁয়ালিও নয়। জীবাত্মা আর পরমাত্মার তত্ত্ব, পিতা আর সন্তানের তত্ত্ব, এমনকী গুরু আর শিষ্যের তত্ত্ব।
অবশ্য কবুল করতে হবে, ফকিরিতন্ত্র বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। তারা বেশবাসে নাচেগানে মেলা মচ্ছবে কাউকে আকর্ষণ করতে চায় না। তারা দীনবেশে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে দিব্যি মিশে আছে। কাউকে আহ্বান করছে না। মাইক লাগিয়ে জয়দেব মেলার বাউল আখড়ার মতো আসর জমানোর চেষ্টা করছে না। একেবারে জনস্রোতে মিশে আছে কিন্তু গভীরভাবে আত্মস্থ ও আত্মপ্রচ্ছন্ন। ওই যে শাসপুরের রিকশাঅলা, সবজিঅলা, জনমজুর, ফেরিঅলারা নিজেদের ক্ষুকাতর দৈনন্দিন থেকে অতিকষ্টে চাল আর পয়সা বাঁচিয়ে, তিলে তিলে সঞ্চয় করে, একটা চালাঘরের ইবাদতখানা বানিয়েছে তার অন্তমূল্য অপরিসীম। তার জন্য তাদের গর্বের শেষ নেই। মিনার নেই, গম্বুজ নেই, কাবাব তসবির নেই, বোররাখ ঘোড়ার ছবি নেই, আছে খেজুর পাতার তালাই, হাতপাখা, লণ্ঠন আর পানীয় জল কিন্তু সগর্বে বলছে ‘এটাই মসজিদ।’
তার মানে তারা অনুক্ত উচ্চারণে বলছে ‘ওটা মসজিদ নয়’ অর্থাৎ ওই যে মিনার-খিলান-গম্বুজ শোভিত বহু দূর থেকে শোভমান সাম্প্রদায়িক মসজিদ, ওটা একটা দেখনদারি জিনিস, দুনিয়াদারির উচ্চারিত ঘোষিত অংশ। ওইখান থেকে রোজ মাইকের নিনাদে মোয়াজ্জিনের আজান বেজে ওঠে। তাতে বলা হয়, ‘ওহে ইমানদার মুসলমান, তোমরা চেতন হও, আল্লার আরাধনার সময় হয়েছে।’
ফকিররা অবাক হয়ে বলবে, আল্লাকে ডাকার আবার সময়-অসময় কি? সে তো সর্বদা চলছে। তার জন্য অত ডাকাডাকির কী আছে? শাসপুরেও লিয়াকতের নতুনতর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেদিন ওই চালাঘরের মসজিদেই তার দিনটা কেটে গিয়ে সন্ধে নেমে এসেছিল। অতখানি প্রশস্ত সুযোগ হাতছাড়া করেনি সে, আলাপ-আলোচনা করেছে, বেশ কিছু ফকিরি গান টুকে নিয়েছে। তার বেশির ভাগই মহম্মদ শাহ-র রচনা। মন দিয়ে বহুক্ষণ ধরে শুনেছে ফকিরিগান মুরিদদের কণ্ঠে। তারপর রাত নটা নাগাদ তার ওপর নির্দেশ হল মসজিদ থেকে বেরিয়ে কবর চত্বরে বসার। ফকিরতন্ত্রের মুরিদ বা বায়েদ এমন ক’জন আর লিয়াকত বাইরে এসে বসল। লক্ষ করল, দরজা বন্ধ করে মসজিদের অভ্যন্তরে শুরু হল গুরুনির্দেশিত ক্রিয়াকরণ ও জপজিকির ধ্যান। এতক্ষণকার চেনা কয়েকজন সহৃদয় মানুষের সঙ্গে তার একটা আড়াল তৈরি হয়ে গেল। একরকম দূরবর্তিতা এসে গেল। আধঘণ্টা পরে আবার তাদের ডাক এল ঘরে যাবার। তার সবকিছু জানার জন্য কৌতূহল ছিল কিন্তু বায়েদ না হলে তারা কিছু জানাবে না।
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, জানালেও লিয়াকত বুঝত কি? আমাদের বিষয়সর্বস্ব ভোগী ও প্রদর্শনকামী জীবনের অবস্থানে থেকে কী করে স্বেচ্ছারিক্ত অথচ ভাবসম্পদে ধনী, ফকিরদের মর্মকথা আর ইবাদতের গহন পথে পৌঁছব আমরা? তবে কি আমাদের মতো পুথিপড়া পণ্ডিতদের ফকির-গবেষণা ও নিবন্ধ রচনা নিষ্ফল? লিয়াকত একেবারে এইখানে ঘা মেরে প্রশ্ন তুলেছে :
বাস্তবিকই আমি তো তেমন কিছুই জানি না। প্রশ্ন হয়, এই যে বাইরে থেকে এদের নিয়ে এতো গবেষণা, লেখালেখি ও পুস্তক প্রকাশ, নানাদিক থেকে সেগুলি অত্যন্ত মূল্যবান হওয়া সত্ত্বেও কোথাও এক বিশাল ফাঁকি থেকে যাচ্ছে। একটা হল ফকিরিতত্ত্ব ও তাকে আয়ত্ত করার প্রয়োগসংক্রান্ত ক্রিয়াকরণ বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা। অন্যদিকে এটাই ফকিরদের যাবতীয় জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও চালচলনের মূলে—এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না। ভিন্ন ও প্রায় বিপরীত জায়গায় অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তির (গবেষকের) পক্ষে এগুলো যথার্থভাবে বোঝা ও মূল্যায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
