বলা বাহুল্য, ফকিরদের হালহকিকত আমার চেয়ে লিয়াকত অনেক বেশি জানে, তবু সে বীরভূমের শাসপুরে আমিন শাহ ফকিরের সন্ধানে গিয়ে থ হয়ে যায়, কারণ তাকে দেখে একজন ফকির বলে মসজিদে নিয়ে যেতে। লিয়াকতের বিস্ময় মসজিদ শুনে। ফকিরদের মসজিদ হয় নাকি? কিংবা ফকিররাও কি তবে মসজিদে যায়? আসলে আলম শাহ বাড়ি ছিলেন না। আসবেন, এসে পড়বেন, সন্ধের আগে। ফকিরের বউ অচেনা অজানা লিয়াকতকে বলে, ‘চিন্তা নেই। ভাত খান, আরাম করুন— আজ থাকুন। কাল যাবেন।’
একেবারে খাঁটি ফকির পরিবারের অভ্যর্থনা, সেবাকুশল সত্তার উন্মোচন। অজ্ঞাতকুলশীলকে ভয় কীসের? চুরি ডাকাতি? বাড়িতে সামগ্রী বলতে কিছুই তো নেই। বেচারি লিয়াকত দুবরাজপুরের সাতকেন্দুরি থেকে বেরিয়ে তিন ঘণ্টা বাসে করে এসে, তারপরে শাসপুর পৌঁছেছে। একেবারে রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। আমিন শাও নেই, অগত্যা থাকতেই হবে। কিন্তু মসজিদে নিয়ে যেতে বলছে কেন? তার অস্বস্তি লাগে। মসজিদের দিকে সে ঘেঁষে না। লিয়াকত ভাবল।
কাকে বোঝাব— মসজিদ মানে মিনার খিলান ও গম্বুজের আঙ্গিক অপরূপ সৌধ। যার ভিতরে থাকেন মৌলবি ও নামাজি মানুষজন। আমি নামাজি নই, আবার মৌলবিদের সঙ্গ ভাল লাগে না বলে দূরে থাকি।… বলতেই হচ্ছে আজ পর্যন্ত কোনও মৌলবি হাফিজকারী আলেম অর্থাৎ কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় মুখপাত্রের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়নি বা প্রগাঢ় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বরং মৌলবিনা-মানা বেনামাজি (বাহ্যিকভাবে) ফকিরদের সঙ্গেই আমার প্রাণের টান, নাড়ির নিবিড় একাত্মতা। এমনকি আনুগত্যও।
লিয়াকত মাঝে মাঝে নিজে নিজে গেয়ে ওঠে আপন মনে :
মুরশিদ যার সখা তার কীসের ভাবনা?
যার হৃদয়মাঝে কাবা নয়নে মদিনা।
তার লেখা কবিতায় আছে আরেকটু ভেতরের কথা। যেমন :
মন্দির মসজিদের নামে ইটপাথরের খাঁচা নয়।
সহজ বংশীধ্বনির মতো—
নীড়ের থেকে নীড়
‘আয়না মহল’ যেখানে গড়ে উঠল
লালনের নৃত্য অপরূপ একতারা উঁচানো হাত ধরে।
অনেকদিন আগে জালাল শা ফকির তাকে বলেছিলেন মৌলবিদের সঙ্গে কেন ফকিরদের কোনওদিন মিলমিশ হয় না। জালালের বক্তব্য :
মৌলবি আলেম হাফিজকারীদের সঙ্গে ফকিরদের কোনওদিন মিল হবে না। চিরদিন বিরোধ আছে এবং কিয়ামত (মহাপ্রলয়ের দিন) পর্যন্ত থাকবে। আসলে কি, ওরা কোরআনের হাড়মাংস নিয়ে টানাটানি করে, আর আমরা ফকিররা আছি মগজ নিয়ে। একসঙ্গে ওঠা বসা সম্ভব?
এতসবের পরেও তাকে কিনা যেতে বলছে মসজিদে? লিয়াকত শ্লথ পায়ে এগোয়। পথ দেখাচ্ছে এক কিশোর। মৌলবি বা আলেমদের সঙ্গে ফকিরদের আরেকটা গুরুতর, অমিলের কথা লিয়াকতের চোখে পড়েছে। সে তাই উল্লেখ করেছেল:
মুলসমানত্বের নামে উর্দু— আংশিক হিন্দিরও— ভাষা-সংস্কৃতির ছাপ মৌলবির কথাবার্তা, পোষাক ও আচরণে যতখানি সুস্পষ্ট, তার কণামাত্রও বাংলা বা বাঙালির নয়। এখানেও ফকিরের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। উর্দু-হিন্দি পরিত্যাগ করে এরা বাংলা ভাষাতেই রচনা করেছে গান, গাইছেও বাংলাতে। সাধনতত্ত্বের ভাবকে প্রকাশ করতে এরা আরবি ফারসি কখনও বা উর্দু শব্দ ও ভাবধারাকে আত্মীকরণ করে বাংলার ভাবধারা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে আরও ব্যাপক, প্রসারিত ও প্রকাশক্ষম করে তুলেছে। মৌলবিদের মতো বাঙালি জাতিসত্তাকে উপেক্ষা করেনি, বরং সুহৃদ ও বন্ধু হয়ে উঠেছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে ফকিরের উদার, মানবিক ও সমন্বয়বাদী ভূমিকাকে যে গোঁড়া ও পরগাছা মৌলবিরা হিন্দুয়ানীর ছাপ বলে অপব্যাখা করবে এবং শুদ্ধকরণের নামে খড়গহস্ত হয়ে সাধারণ মুসলমানদের লেলিয়ে দেবে তাতে আশ্চর্য কি?
এবারে কিশোরটি ছোট্ট একটা মাটির ঘরের সামনে লিয়াকতকে এনে খাদিমকে খুঁজতে লাগল। লিয়াকতের আবার ধন্ধ লাগে। মসজিদে তো খাদিম থাকেন না, খাদিম হলেন পিরের মাজারের সেবাইত। তবে? তালা খুলে ছেলেটা মাটির ঘরে ঢুকল। পেছনে লিয়াকত। দেখল,
ভিতরটা নিকানো, পরিচ্ছন্ন। এক কোণে জলের কলসি, পাশে গ্লাস। অন্য কোণে খেজুরপাতার দু’-তিনটে তালাই। দেওয়ালে ঝোলানো লণ্ঠন। তাকে কয়েকটা বই ও খাতা। … মেঝের উপর একটা তালাই বিছিয়ে ছেলেটি বসতে বলল। একটা ধাঁধার মধ্যে ভাবছি— মসজিদ বলে এ আমি কোথায় এলাম? এমন সময় একজন ঘরে ঢুকলেন। ছোটখাটো সাধারণ চেহারা, লুঙ্গির মতো করে পরা ধুতি, গায়ে গেঞ্জি। বললেন, ‘আমিই খাদিম।’
‘আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতে বলল একটা লোক। আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম’। খাদিম আমার দিকে চোখ ফেরালে বললাম, ‘যাক ছেলেটি সে কথা না শুনে আমাকে এখানে এনে ভালই করেছে।’
‘ছেলেটি আপনাকে মসজিদেই এনেছে। এটাই মসজিদ। এটা ফকিরের মসজিদ। আমরা ও মসজিদে যাই না।’
খাদিম ব্যাখ্যা করলেন, ‘মসজিদ কি? এবাদতখানা তো? আকার-প্রকার তো গৌণ। এটাই আমাদের এবাদতখানা।’
বিস্মিত হতবাক লিয়াকতকে খাদিম শোনালেন ফকিরিয়ানার সবচেয়ে সরল সত্য। খুব গরিব, রিকশাঅলা, ফেরিঅলা, জন-মজুর, ভিক্ষাজীবী গায়ক— যাদের জমি নেই, আছে সামান্য ভিটে, তারা ঘরে ঘরে চাল পয়সা জমিয়ে বহুদিনের চেষ্টায় গড়েছে এই মসজিদ। কারোর সাহায্য নেয়নি। ফকিরদের তৈরি ফকিরদের জন্য মসজিদ। লিয়াকত ঘুরে ঘুরে ফকিরদের অনেক গান সংগ্রহ করেছে সেটা বড় কথা নয়, তার চোখ দিয়ে সে চিনিয়েছে ফকিরিতন্ত্র সেটাই তার সবচেয়ে বড় কাজ। ওই যে একবার একজন আমাকে বলেছিল, ‘বাইরে বাইরে যতটা বোঝার তোমার বোঝা হয়ে গেছে। বাকিটা বুঝতে গেলে তোমাকে দীক্ষা নিয়ে শরীরে আচরণ করতে হবে।’ আশ্চর্য যে একবার পাথরচাপুড়ির মেলায় এক ফকির লিয়াকতকে হুবহু একই কথা বলেছিলেন। সে আমার মতোই ফকিরিপন্থার ভেদ বা রহস্য বুঝতে চেয়েছিল, আর আমি চেয়েছিলাম বাউলতত্ত্ব জানতে, এটুকুই যা তফাত। লিয়াকত লিখছে:
