ফেরেব ছেড়ে কর ফকিরি।
আসল ফকিরি মতে
বাহ্য আলাপ নাইগো তাতে।
‘ফেরেব’ শব্দটার অর্থ বোঝা যাবে ‘ফেরেব্বাজ’ কথাটির অনুষঙ্গে, অর্থাৎ প্রতারক, মিথ্যাবাদী, ধান্দাবাজ। এইসব ত্যাগ করে তবে ফকিরি ধর্ম পাওয়া যাবে। আসল ফকিরি মতে বাহ্য আলাপ থাকে না, অর্থাৎ তার সবটাই অন্তর্জগতের ব্যাপার, ধ্যানময় ও নীরবতালব্ধ। এমনতর, উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন ফকিরিপথও খুব নিষ্কন্টক নয়— কারণ চারপাশে বহুতর প্রতিকূল ও প্ররোচনা। লালন তাই বলতেন :
ফকিরি করবি খ্যাপা কোন্ রাগে।
হিন্দু মুসলমান দুইজন দুই ভাগে ॥
আছে বেহেস্তের আশায় মোমিনগণ
হিন্দুদিগের স্বর্গের মন ॥
ফকিরি সাধনায় এটাই বড় বিঘ্ন। সমাজের হিন্দু মুসলমানে মিলমিশ নেই, দুইজন দু’ভাগে বিভাজিত। তবে তাদের দু’জনেরই লক্ষ্য এক, ঐহিক নয়— পারত্রিক। ধর্মনিষ্ঠা মোমিন মুসলমান চায় বেহেস্ত, হিন্দুরা চায় স্বর্গ। ফকির এর কোনওটাই কামনা করে না। সে চায় আত্মস্থ হতে। জপ ধ্যান জিকির তার কাম্য। কাম্য আল্লা। তাই তাঁর ধ্যানে সে ‘ফানা’ হতে চায়। হতে চায় দিওয়ানা। তার কাছে পার্থিব সবকিছু ম্লান, তাৎপর্যহীন, অসার। সেইজন্য প্রকৃত ফকির কোনওদিন আলোকিত মঞ্চে উঠে বৃত্তাকারে নাচবে না বাউলদের মতো, সাজবে না বর্ণময় চোখধাঁধানো বস্ত্রে, অলংকারে। আনন্দলহরী, ক্যাসিও, ডুগি তবলা, আড় বাঁশি, সারিন্দা, কিছুই তার লাগে না। বড়জোর একতারা বা দোতারা, ক্কচিৎ বেহালা। কিছু না থাকলে থালা বাজিয়ে চলে তাদের গান, চিমটেয় রাখে তাল। ‘ভোলামন’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে না— মোটকথা কোনও ব্যাপারে তাদের ফিকিরি বা বাহ্য কিছু আড়ম্বর নেই।
ফকিররা জীবনবিমুখ বৈরাগী নয়, গেরুয়া পরে না। দীনবেশে একেবারে রাজভিখারি। এই জন্যই তাদের কথা কেউ জানল না— কেউ সমাদর করল না। তারাও সেটা চায়নি। সবার অধম হয়ে দীনাতিদীন হয়ে খোলামেলা নিসর্গের মধ্যে তাদের উপাস্যসন্ধান। তাদের কোনও পাঠ্যবই নেই, পাঠ্য হল ‘দেলকেতাব’— আত্মপাঠ। শরীরের মধ্যেই নাকি মসজিদ। সেখানে সর্বদাই চলছে দায়েমি নামাজ। রোজা মানে কায়মনোবাক্যের সংযম— সেতো রোজকার কাজ— সর্বদাই রোজা। হজ বা তীর্থে তাদের মতি নেই।
আমার গবেষণা-সহকারী দুবরাজপুরের সাতকেন্দুরির লিয়াকত আলিকে ভার দিয়েছিলাম বীরভূমের ফকিরদের সম্পর্কে পায়ে হেঁটে খোঁজ নিতে। লিয়াকতের নিজের বাড়ির খুব কাছে ফকিরডাঙা। সেখানে দায়েম শা ফকিরের সাধনার স্থান ও সমাধি। দায়েম শা-র সন্তানরা ওখানেই থাকেন। একবার সেখানে গিয়ে ফকিরি আস্তানা চাক্ষুষ দেখে এসেছি বছর দশেক আগে। লিয়াকতই নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে মহম্মদ জালাল শাহ-র কণ্ঠে শুনেছিলাম দায়েম শাহ-র গান— সংগ্রহ করেছিলাম তার বেশ ক’টি। পরে লিয়াকত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে ওই ফকির পরিবারের সঙ্গে এবং আপ্ত ইচ্ছায় জালাল শাহ-র ছোটমেয়েকে বিয়ে করেছে। ব্যাপারটা খুব অভিনব, কারণ সাধারণত ফকিরদের সঙ্গেই ফকিরদের মেয়ের বিয়ে হয়। স্বাভাবিক সাংসারিকতাময় আমাদের যে জীবন, যাতে থাকে কিছুটা ভোগবিলাস, সাজাগোজা, ঘরগোছানো, সঞ্চয়স্পৃহা, দেখনদারি, আসবাব ও সম্পদ, সেতো ফকিরদের থাকে না। সেই বাড়ির মেয়ে কী করে এসে খাপ খাওয়াবে নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের বাঁধা ছকে?
মেয়েটিকে লিয়াকতের মনে ধরেছিল বলেই বিয়ে করেছে নিশ্চয়। তবু কিছু মজা থাকে সবসময় তার মধ্যে। স্বভাব বাউন্ডুলে লিয়াকত। শিক্ষিত যুবক সে, আধুনিকমনস্ক। জাতিবর্ণভেদ বোঝে না। চমৎকার কবিতা লেখে। বাউলদের সঙ্গে চরম ঘনিষ্ঠতা। ইচ্ছে হলে প্রচণ্ড গাঁজা টানে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : ‘লিয়াকত, তুমি একজন ফকিরের মেয়ে বিয়ে করলে কেন?’ লিয়াকতের চোখে কৌতুকহাস্যের ছটা খেলে গেল। বলল, ‘ফকিরের মেয়ে তো? কোনও ডিমান্ড নেই। কিছু চাইবে না। হা হা হা।’
আসলে ফকিরের সঙ্গেই ফকিরের মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ভাবতে গেলে লিয়াকত মর্মে মর্মে পাকা ফকির। তারও কোনও চাহিদা নেই এই জীবনের কাছে। কিন্তু বিয়েটা একদিক থেকে জোড়কলমী। মুসলমান বংশের ছেলের সঙ্গে ফকির কন্যার বিয়ে। লিয়াকত অবশ্য জন্মেই মুসলমান, কিছুই মানে না। তবে মরমি মানবতাবাদী। তার শ্বশুরবংশটি বেশ। সেটা বলার মতো।
মহম্মদ ভ্রমর শাহ-র বাড়ি ছিল বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায়। জাত ফকির। তাঁর সন্তান দায়েম শাহ। আলমবাবা নামে এক ফকির দায়েমকে শিষ্য করে ডেকে নেন দুবরাজপুরের এই আলমডাঙায়। এখন সেটাই মুখে মুখে ফকিরডাঙা। দায়েম শাহ ছিলেন মগ্ন সাধক ও গীতিকার। ফকিরডাঙার শান্ত নির্জন গাছতলায় আলমবাবা আর দায়েম শাহ-র সমাধি দেখলে মনে তৃপ্তি আসে। আখড়ার গা বেয়ে চলে গেছে রেললাইন। দিনে যত আপ-ডাউন ট্রেন যায় ভক্তযাত্রীরা সমাধি তাক করে পয়সা ছোড়ে। খুব জাগ্রত থান হয়ে উঠেছে লোকবিশ্বাসে। কতজন মানসা করে।
দায়েম শাহ-র ছেলে জালাল শাহ। পেশা ফকিরি গান। ঘুরে বেড়ান গলায় গান নিয়ে। লিয়াকত এই ফকির বাড়িতে বিয়ে করে একটা নতুন ঢেউ তুলেছে। সে দেখল এদের হতদরিদ্র জীবনে কোনও অভিলাষ বা পার্থিব বাসনা নেই, শিক্ষাও নেই এক ফোঁটা। এখানে সে কয়েকজন হৃদয়বান বন্ধুর সাহায্য ও সহযোগে ‘অচিনপাখি’ বিদ্যালয় খুলেছে। ফকিরদের সন্ধানে এসে লিয়াকতকে আবিষ্কার ও তার বন্ধুতা অর্জন আমার জীবনের একটা বড় অভিজ্ঞতা। আর একটা সত্য এই যে, বাউলদের জানতে বুঝতে তাদের ডেরায় না গেলেও চলে কিন্তু ফকিরদের জানতে গেলে তাদের আস্তানায় যেতেই হবে।
