মুখর প্রতিবাদে মাথা ঝাঁকিয়ে সেই নারী বলল, ‘না না। মানুষটা খুব ভাল। বড় দরদি। ভালবাসার কাঙাল। কিন্তু ও আমাকে কোনওদিন সন্তান দেবে না, খুব নিষ্ঠুর। তাতে নাকি ওর ভজন সাধন নষ্ট হয়ে যাবে।’
আশ্রম থেকে দিনান্তে সিউড়ি ফেরার পথে উৎপলের কাছে জেনেছিলাম সাধনাবালার কাহিনি। বক্রেশ্বরে ট্যুরিস্ট লজের আশেপাশে ছিল সাধনার ঘর। তার কেউ নেই। লজের পাশে অন্ধকার বালিয়াড়িতে কুপি জ্বেলে সে খদ্দের ধরত। গৌর তাকে উদ্ধার করে এনেছে। সেই পথবেশ্যা হয়েছে তামাঘাটার গুরুমা। তবু মন ভরেনি। সন্তানবতী হয়ে ভরন্ত জীবনের স্বপ্ন এখন তার চোখে। কিন্তু তা পূরণ হবার নয়।
গৌরবাবাকে শেষ দেখি পরের বছরে। পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিল, সমুদ্রগড়ে সে গণেশ প্রামাণিকের বাড়ি আসছে একটা দিবসী উৎসবে। বাউলগানের আসর বসবে। টেপরেকর্ডার নিয়ে গেলে অনেক গান তুলতে পাব। গেলাম বেলাবেলি। শিষ্যবাড়ির দোতলায় বসে আছে গৌর— প্রসন্ন চোখ, হাসি মুখ। বললাম, ‘সাধনা তোমার কাছে আছে এখনো, তাকে তো দেখছিনে।’
—ওই তো ওই কোণে বসে আছে, মেয়েদের মধ্যে। শিষ্যবাড়ির মেয়ে বউদের মধ্যে বসে আছে সাধনা। চোখাচোখি হল, ম্লান হাসল। তার কোলে একটা দু’-তিন বছরের ডাগর ছেলে, জাপটে ধরে আছে তৃষিত বুকের মধ্যে। না, এ তার নিজের সন্তান নয়, শিষ্যবাড়িরই কারুর সন্তান। গৌরবাবা তাকে সন্তান দিলে বাউলধর্মে পতন ঘটবে। আর সে যদি গৌরকে ছেড়ে সত্যিই চলে যায়? কোথায় যাবে? সেই বক্রেশ্বরে কুপি ধরে খদ্দের খোঁজার জীবন না আরেক বাউলের সাধনপথের উপচার হওয়া?
১.৬ ফানা থেকে বাকা
সচরাচর বাউল-ফকির কথাদুটি আমরা শব্দদ্বৈতের মতো হাইফেনবদ্ধ করে উচ্চারণ করি, লিখি, কিন্তু তাদের কি এক বলে ভাবি? সাধারণ মানুষের কাছে, গবেষকদের কাছে গানের রসিকদের কাছে বাউল যে-পরিমাণ সমাদৃত, ফকিররা কি তার এক-দশমাংশ মনোযোগ পেয়েছে কোনওদিন? আজকাল চল হয়েছে বাউল গানের পাশে কোথাও কোথাও ফকিরি গানের আসর। সরকার ফকিরদের দিকে নজর দিচ্ছেন গত দু’-এক দশক—সেটা শুভলক্ষণ। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় বাউল আর ফকিরদের আলাদা দুই আস্তানা, আলাদা অনুষ্ঠান—সেটা নিন্দার্হ। নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বাউল আর ফকিররা মৌলবাদীদের হাতে অত্যাচারিত ও নিগৃহীত হতে হতে শেষ পর্যন্ত রুখে দাঁড়াতে সম্মিলিত হয়েছেন, তাঁদের সংগঠনের নাম ‘বাউল-ফকির সংঘ’— এই প্রয়াস অভিনন্দনীয়। কিন্তু একটু নজর করলে নানা ভাঁজ চোখে পড়ে। দৃশ্যতই বোঝা যায়, সমাজে বাউলদের যে মান্যতা ফকিরদের তা নেই। আমাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভা-সমিতি সম্মেলনে আমরা বাউলদের ডাকি, ফকিরদের নয়। বেশ ক’জন বাউল গান গেয়ে সম্পদশালী হয়েছেন, গাড়িবাড়ি করেছেন এতে কোনও অলীক বার্তা নয়, কিন্তু ফকিরদের আজ পর্যন্ত কোনও সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার খবর আমার কাছে নেই। বিদেশে গত তিন দশক যাঁরা বাউলদের নিয়ে যাচ্ছেন ও মঞ্চে নাচাচ্ছেন গাওয়াচ্ছেন, লিখছেন গালভরা হ্যান্ডআউট তাঁদের অনুষ্ঠানপত্ৰীতে, তাঁদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ বা আবেগ নেই ফকিরদের বিষয়ে। প্রতিবছর বীরভূমের পাথরচাপুড়িতে ‘দাতা বাবার’ নামে যে বার্ষিক জমায়েত হয় ফকিরদের, সেখানে বাবুসম্প্রদায় কিংবা ছাত্রছাত্রী গবেষকদের বড় একটা দেখা যায় না। ফকিরদের নিয়ে দূরদর্শন প্রতিবেদন কিংবা ডকুমেন্টারি ফিল্ম ততটা হয়নি। তাঁদের গানের ক্যাসেট যদি বা হয়ে থাকে তবে তার প্রচার বা সমাদর হয়নি। ফকিরদের মধ্যে থেকে কোনও পূর্ণদাস বা পবনদাসেরা এখনও উঠে আসেননি, যাঁরা আন্তর্জাতিক গানের বিশ্বে দাপাবেন। প্রকৃত ফকিরদের নিয়ে আজ পর্যন্ত সবিস্তারে প্রকৃত বাংলা ছোটগল্প লেখা হয়েছে কি সন্দেহ, সফল উপন্যাস তো অসম্ভব। অথচ বাউলদের নিয়ে অনেক লেখা রয়েছে কথা সাহিত্যে। ফকিরিগানের সংকলনও করেননি কেউ। তবে রাজ্য সংগীত আকাডেমির পক্ষে কঙ্কন ভট্টাচার্য ফকিরি গান টেপরেকর্ডারে ধরেছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে, সেটা জানি। ‘লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র’ ফকিরি গানে উৎসাহ দিচ্ছেন— এগুলি ব্যতিক্রম। আরেকটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী উদাহরণ দুবরাজপুরের ফকিরডাঙার ‘অচিনপাখি’, সংস্থা, যাঁরা তাঁদের পত্রিকায় ফকিরিগান ছেপে চলেছেন এবং বেশ ক’বছর ‘অচিনপাখি’ নামে গরিব ছাত্রদের সঙ্গে ফকিরদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যাচর্চার পরিবেশ গড়েছেন।
কিন্তু সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গে ফকিররা পড়ে আছে সমাজের একটেরে। উপেক্ষিত, অনাদৃত। অসহনীয় দারিদ্র্য আর অনপনেয় অশিক্ষা তাদের জন্ম জন্মান্তরের বিধিলিপি। হিন্দু সমাজ বাউলদের দেখে, ফকিরদের উপেক্ষা করে। মুসলমান সমাজ ফকিরদের ঘৃণা করে, কারণ তারা বেনামাজি, রোজা রাখে না, গান করে প্রকাশ্যে (যা নাকি ইসলামে নিষিদ্ধ) এবং ধর্মনেতাদের মান্য করে না। কিন্তু অনীহার আসল কারণ অন্য। ফকিররা মুসলমান শরিয়তি নির্দেশ না মেনে বেরিয়ে গেছে নিজেদের পথে, খুব একটা গ্রাহ্যও করে না মূল স্রোতকে। ধর্মের বাহ্য আচারে তাদের আস্থা নেই। লোকদেখানো আন্দাজি পথ তাদের অপছন্দ। তারা আত্মমগ্ন উদাসীন ও আত্মতৃপ্ত।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ফকিরদের নিয়ে যে কোনও ভাবনা নেই, করণীয় কর্তব্য নেই, পরিকল্পনা নেই তার মূলে কিন্তু ফকিরদের অদ্ভুত জীবনশৈলী। তাদের তো কিছুমাত্র ভোগসুখ বা ভালভাবে বাঁচার বাসনা নেই। উপাস্যকে তারা অন্তরে চায় বলে পার্থিব কিছু চায় না, অথচ বৈরাগীও নয়। অনেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণে অবিশ্বাসী, বেশ ক’টি সন্তান সন্ততি নিয়ে চালাঘরে খেয়ে না-খেয়ে বেঁচেবর্তে থাকে। চাহিদা নেই, প্রতিষ্ঠাকামী নয়, ঘরে বিদ্যুৎ নেই, আসবাব নেই, আদবকায়দা নেই। অথচ আশ্চর্য সেবাপরায়ণ এবং অতিথিসৎকারে সদা সতর্ক। বিনীত, অকৃত্রিম, অনভিজাত ও অনাড়ম্বর। সবকিছু ত্যাগ করে তবে তো ফকির হওয়া যায়। ওরা নিজেরাই বলে ফকিরের কোনও ফিকির নেই। বাউল-ফকির উভয়েরই অবশ্যমান্য লালন শাহ একটা গানে বলেছেন :
