সাধনা এক ধামা মুড়ি আর এক কেটলি চা আনল। রমেশরা কাপে ঢেলে চা দিল। বাটি করে মুড়ি। আমাদের সঙ্গে মিষ্টি ছিল এক প্যাকেট, সেটা খোলা হল। গৌরবাবা একমুঠো মুড়ি কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘জয় গুরু।’ সাধনাও বলল, ‘জয় গুরু।’
এবারে গৌরবাবা আর সাধনাকে পাশে বসানো হল, তাদের ফোটো তোলা হবে। তাতে সাধনার ঘোর আপত্তি আর লজ্জা। মনে ভাবলাম, এ তো আর হরিপদ-নির্মলা নয় যে সিডি কভারে রঙিন ফোটোর জন্য একতারা উঁচিয়ে পোজ দেবে। সাধনদাস-মাকি কাজুমির মতো অকুণ্ঠিত স্টেজ পারফরমারও নয়। এ একেবারে গ্রাম্য সাধক— অকুলীন ও জড়তাগ্রস্ত। অবশ্য খুবই আন্তরিক তাদের ব্যবহার। খুবই বিনীত। গৌরবাবা বলেই ফেলল, ‘আমাদের বাড়িতে অন্নসেবা নিতে আপনার কষ্ট হবে। সাধনা ভাল রাঁধতে জানে না। জাতে রুইদাস, যাকে বলে মুচি।’ কথায় বলে, ‘মুচি হয়ে শুচি হয় যদি হরি ভজে।’
হরিভজনের উদার সমন্বয়বাদ দিয়েই মহাপ্রভু সব জাতকে এক করতে চেয়েছিলেন— খানিকটা পেরেছিলেনও। এখন অবশ্য বৈষ্ণব ধর্মে অতটা উদারতা নেই, জাতপাত আছে। উচ্চবর্গ ব্রাহ্মণ কায়স্থরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মকে কবজা করেছে। নিম্নবর্গের বৈষ্ণব ভক্ত বলতে বোঝায় সহজিয়া আর জাত-বৈষ্ণব। তামাঘাটায় যে বসাকরা গিয়েছিল তারা সহজিয়া। গৌরবাবা জাত-বৈষ্ণব, তবে এখন বাউলপথে আছে। সাধনাবালা হয়তো রুইদাসী বোষ্টম বা চামার বোষ্টম। সত্যিই সে রান্নাবান্নার রকমসকম তেমন জানে না, বরং দেহতত্ত্বের করণকারণ অনেকটা জানে, সেইজন্য গৌর ওকে আশ্রয় দিয়েছে।
কে যে কাকে আশ্রয় দিয়েছে বলা কঠিন অবশ্য, বিশেষত নিম্নবর্গের গৌণধর্মে। নামাশ্রয়ের পর গুরু দেন মন্ত্রাশয়। শিষ্য সবশেষে পায় রূপাশয়ের সাধনপন্থা, যাকে বলে ‘দমের কাজ’ অর্থাৎ দেহগত সাধনা। তাকে কামে থেকে হতে হয় নিষ্কামী, বিন্দুসাধনের কঠিন ব্রতে লাগে ‘রূপ’ মানে নারী। যে সে নারী নয়, লক্ষণযুক্ত, শান্ত ও প্রেমময়ী। সাধনাবালা নিশ্চয়ই সে ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য। গৌরবাবা তাকে সামাজিক আশ্রয় দিয়েছে না সাধনাবালার কাছে অনুগত হয়ে আছে সে রূপাশ্রয়ের তাগিদে, কে জানে?
চা-মুড়ি খেয়ে তামাঘাটার শিষ্যরা গেল গুরুপাটের রান্নাবান্নার আহার্য কিনতে, আমার সঙ্গীরা বার হল গ্রাম পরিক্রমায়। এবারে আমি মুখোমুখি বসলাম বাউল দম্পতির। সাধনা বলল, ‘বসলে চলবে? কাজ আছে না?’
গৌর সাবলীলভাবে তার নারীসঙ্গীর উরুতে থাপ্পড় মেরে বলল, ‘আরে বোসসা বোসো। জানেন বাবু এত ভালবেসেও এই মেয়েটার মন পেলাম না। সর্বদা পালাই পালাই করছে। দাঁড়ে বসে না মোটে। অথচ ওকে দেখে আগের শক্তিটা চলে গেল।’
সাধনা বলল, ‘চলে গেল কেন? আমি কি তাড়িয়েছি?’
‘ওইটেই তো গোলমাল। তোমরা পরস্পরকে ভাবলে সতীন। আরে ওসব সতীন টতীন সংসার-ধর্মে হয়, বাউলের আবার সংসার কোথায়? তোমরা হলে আমাদের শক্তি। আমার তো ইচ্ছে যে তিনজন শক্তি নিয়ে সাধনা করে সিদ্ধ হব।’
এ যে একেবারে অন্য জগতের সংলাপ! ভাবলাম গোপ্য সাধনার গভীর নির্জন পথে আমি অনেকটাই গেছি কিন্তু তার নানা বাঁক তো দেখিনি। এখানে যেমন এসে পড়েছি একেবারে নিম্নবর্ণের বাউলসাধনার জাদুবাস্তবে। গৌরবাবা হরিপদ গোঁসাইয়ের মতো প্যারিস যায় না, তার কাছে আসে না মিশেল বা জেনিপা। সাধনদাসের কাছে মাকি এসেছে জাপান থেকে সেটা এখানে অকল্পনীয়। কিন্তু গৌরবাবাই কি কম চমকপ্রদ? রূপাশ্রয়ের সংকল্প নিয়ে নিম্নবর্ণ থেকে টেনে আনছে কায়াসাধনার সঙ্গিনী। মানুষটা তার সাধনপথের জন্য কি খুব স্বার্থপর? তিনজন সঙ্গিনী চাই তার অথচ তারা তিনজন থাকবে মিলেমিশে? তাদের মধ্যে কলহবিবাদ হবে না? তারা তো সাধিকা নয় কেউ, পুরুষের সাধনার নিমিত্তমাত্র, কিন্তু তারা কি মনহীন যন্ত্র? কেন তারা পরস্পরকে সইবে?
গৌরবাবাকে বললাম, ‘তিনজন শক্তি নিয়ে সাধনা করা যায়? তন্ত্রে শুনেছি চক্ৰসাধনায় বসে সাধক ও সাধিকারা। বাউলমতেও এমন আছে?’
—আছে। আমার তো তবু তিনশক্তির সাধনা। আমার গুরু করেছিলেন এগারোজন নারী নিয়ে সাধনা। সিদ্ধ হয়েছিলেন। আর আমি অধম, একজনকেই বশ করতে পারলাম কই?
এতক্ষণ পরে আত্মগর্বী লৌকিক সাধকের আননে ফুটে উঠল স্নান অসহায়তা। কায়াবাদী সাধনপথে প্রকৃতিশক্তির এমন জোর আগে দেখিনি। হীন বংশে জন্ম কিন্তু যৌবনগরবে দৃপ্ত সাধনাবালার সাধারণ বেশবাস আর কৃষ্ণকান্ত চেহারায় ফুটে আছে চমৎকার নির্লিপ্ত না কি বিজয়িনীর অভিমান? গৌর বলে, ‘ক’মাস ধরে কেবলই শাসানি দেচ্ছে “চলে যাব চলে যাব।” কেন গো চলে যাবে? থাকো না।’
সাধনা অবহেলে বলল, ‘কতদিন আছি বলো তো? চারটে জয়দেব হয়ে গেছে।’
এবারে আমার চমকের পালা। বছর গোনার এমন ভাষা আমার জানা ছিল না। জয়দেব কেঁদুলির পৌষ সংক্রান্তির মেলায় একত্রে যাওয়া এদের বছরের একক। সেই হিসেবে গৌর আর সাধনাবালা চার বছরের জুটি। এবার তাতে ভাঙন লেগেছে। কিন্তু কেন চলে যাবে? গৌর বলল, ‘সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করুন বাবু। আমি দেখি একটু ওধার পানে যাই।’
জীবনের এক অবিশ্বাস্য কিংবা অপূর্বকল্পিত এই অভিজ্ঞতা সন্দেহ কি? আমার মতো একজন নাগরিক বুদ্ধিজীবী বসে আছি নিম্নবর্ণের রুইদাসীর সামনে। তার জীবন আর আমার জীবন একেবারে আলাদা, সমান্তরাল রেখা যেন, কোনওদিন মিলতে পারে না। প্রায়ান্ধকার মাটির দাওয়া, ওপরে খড়ের ছাউনি, দরিদ্র বাউলের আস্তানা। সাধনাবালা বসে আছে লজ্জানত মুখে। বললাম, ‘কেন থাকবে না তুমি? মানুষটা কি খারাপ? অত্যাচার করে?’
