নির্মলা মা এককালে নাকি খুব ভাল গাইত আর নাচত। তার নাচে প্যারিস মজেছে এককালে। সিডির কভারে নির্মলার যে গানরত চেহারার রঙিন ফোটো রয়েছে তার সঙ্গে এখনকার চেহারার মিল পাওয়া শক্ত। এবারে তাই নাচ নয়, শুধু গান শুনলাম। আশ্রম থেকে বিদায় নেবার সময় নির্মলাকে মনে হল বটগাছের মতো। চারদিকে ডালপালা মেলে তৈরি করেছে স্বস্তি ও সান্ত্বনার একটা আশ্রয় ও আত্মতা। তার সন্তানকুল দেশেবিদেশে ছড়ানো। চলে আসবার আগে বললেন, ‘রামনবমীতে বসে সোনামুখির উৎসব আর বাউল মেলা। তিনদিন পর এটা ভেঙে এখানে নবাসনে চলে আসে সব বাউল। তখন আসবেন। ভালমন্দ সবরকম বাউল দেখাব। তাদের সেবাদাসীদের দেখবেন।’
পরে নির্মলা মা-র সূত্রে খবর পাই গৌরবাবার। সিউড়ি থেকে মহম্মদবাজার হয়ে তার আস্তানায় যেতে হয়। একদিন সকালে সঙ্গীসাথিদের নিয়ে চলে গেলাম। গরিব গ্রাম, বিশেষত্বহীন, চাষিদের বাস। খোঁজ নিয়ে গৌরবাবাকে পাওয়া গেল তার ঘরে। সবাই বলল এটা একটা সৌভাগ্য, কারণ গৌরবাবা বড্ড ঠাঁইনাড়া স্বভাবের।
‘আসুন আসুন’—গৌরবাবার আহ্বান বড় আন্তরিক, কিন্তু চেহারাটার সঙ্গে বাবা কথাটা মেলে না। বড়জোর পঁয়ত্রিশ বয়স। সুঠাম সুগঠিত শরীর, বলশালী। কাঁচা দাড়িগোঁফ, বাবরি চুল। খালি গায় সাদা খাটো অধোবাস। মুখে প্রত্যয়ের হাসি। এবারে দেখা গেল তার সাধনসঙ্গিনীকে। গৌরবাবার মাথায় মাথায় চেহারা, খাড়া পিনদ্ধ শরীর। সাদা সস্তা জামা আর থান পরনে। চোখেমুখে সাধিকাভাব একেবারে নেই। গাঁয়ের নিচুঘরের নিরক্ষর মেয়ে। ডাঁটো চেহারার খাটুয়ে দেহ। গৌরবাবা একে নির্ঘাত সাধনার জন্য এনেছে। এ গান বাজনা জানে না, ভাবভঙ্গিও তেমন মোহিনীমার্কা নয়। চোখের কোণে বিদ্যুৎ নেই। হাসিটা সরল।
গৌরবাবার দাওয়ায় বসেছিল জনচারেক মানুষ মুগ্ধ দৃষ্টিতে। গৌর বললেন, ‘এদের বাড়ি হল আপনাদের নদে জেলার তামাঘাটায়। নাম শুনেছেন? এরা আমার ভক্ত শিষ্য। আমাকে নিতে এসেছে দল বেঁধে। তামাঘাটা চেনেন? সেই ধর্মদা পেরিয়ে, নদী পার হয়ে। এই সুবল রমেশ তোমরা তামাঘাটার গল্প বলো বাবুকে।’
—হ্যাঁ গল্পই বটে। বাবু তামাঘাটা খুব অধম জায়গা ছিল। গরিবদের গ্রাম। কোনওরকমে কৃষিকার্য করে চলত। ফসল ভাল হয় না ওদিকে, জমির স্বভাব খারাপ। তো আমাদের বাপ পিতেমো সহায় সম্পত্তি বিশেষ করতে পারেনি, হাতের কাজও কেউ জানত না, তাই গরিবানা ঘোচেনি, লেখাপড়া শেখেনি, দিগরে একটা প্রাইমারি বিদ্যালয়ও ছিল না।
সুবল এই পর্যন্ত বলার পর রমেশ বলতে লাগল, ‘এবারে ধরুন সেই সেবার নকশাল আমলে নবদ্বীপে খুব কাটাকাটি খুনজখম হচ্ছিল। নবদ্বীপের বসাক পরিবার ছিল বাস্তুহারা তাঁতি। তাদের ছিল পঞ্চাশটা তাঁত। প্রচুর টাকাপয়সা করেছিল। নকশালরা তাদের নোটিস দিল, চাইল দু’লাখ টাকা। বলতে পারেন একরকম প্রাণের ভয়ে বা তাঁত বাঁচাতে বসাকরা চলে আসেন তামাঘাটায়, দুটো পরিবার। তখন আমরা সবে জন্মেছি।’
—তামাঘাটা কেন?
—কেউ তাদের বুদ্ধি দিয়েছিল। অসার জায়গা, দুর্গম আর মানুষজন কম। তা ধর্মদা থেকে দু’ ক্রোশ হেঁটে নদী, সেই নদী পেরিয়ে জলা জমি ধরে এক ক্রোশ মাঠ ভেঙে তবে তামাঘাটা! বসাকরা গোরুর গাড়িতে তাঁত চড়িয়ে চলে এল নবদ্বীপের বাড়িতে তালা লাগিয়ে। বেশি নয় পাঁচটা তাঁত এনেছিল। ধরুন, তা থেকেই তামাঘাটার ভাগ্য ফিরে গেল। একেবারে গুরুর কৃপা, অলৌকিক।
—তাই নাকি? কী হল?
—তামাঘাটার চাষারা শিখে গেল তাঁতের কাজ। বসাকরা ছিল শিল্পী, ভাল টাঙ্গাইল শাড়ি বানাত। তামাঘাটায় তারা কমপয়সায় মজুর পেয়ে গেল। রমরমা ব্যাবসা। তারপর দেশকালের অবস্থা শান্ত হলে বসাকরা নবদ্বীপ ফিরে গেছে, তাঁত ক’টা বেচে দিয়েছে আমাদের। এখন ধরুন তামাঘাটায় চল্লিশ পঞ্চাশ ঘর আমরা তাঁত বুনি। লোন নিয়ে ঘরে ঘরে তাঁত বসেছে। মহাজনরা দাদন দেয়। বসাকরা আরেকটা কাজ করে গেছে। নিজেরা সায়ংসন্ধ্যা হরিনাম করত, আমাদেরও বোষ্টম বানিয়ে গেছে। তামাঘাটায় এখন চার চারটে সংকীর্তনের দল। আর শাড়ির ব্যাবসা করে খুব সচ্ছল অবস্থা। তাই গ্রামে ইস্কুল বসেছে। তামাঘাটার বুটি শাড়ি আর জামদানির এখন খুব নাম। চাষের বদলে এখন তাঁতি, গলায় কণ্ঠিধারী বোষ্টম।
আত্মগর্বের হাসি হেসে গৌরবাবা বললেন, ‘এখন রমেশরা মাকু চালায় আর দেহতত্ত্বের গান গায় : “অতি সাবধানে ঘুরাই প্রেমের নাটা”। তঁতের বুনন দিয়ে দেহের কথা বলা হচ্ছে গানে। আমারই শিক্ষা।’
‘কিন্তু তোমার বাড়ি বীরভূমের এত ভেতর দিককার গাঁয়ে। তোমাকে এরা পেল কোথায়? হদিশ দিল কে?’— আমি জানতে চাই।
—হ্যাঁ! সেটা এক ঘটনা। রমেশরা বর্ধমানের সমুদ্রগড়ে যায় প্রতি হাটে শাড়ি বেচতে গুরুবারে। সেখানে সুফল জানা আমার শিষ্য। বছর দুই আগে সেবার সুফলের বাড়ি গেছি আমি। রাতে গানের আসরে ওরা এল। তারপরে আলাপ, গুরুবরণ, ক্রমে দীক্ষাশিক্ষা। তামাঘাটায় এখন আমার একচেটিয়া শিষ্যসামন্ত। পঁচিশ ঘর। এই তো সামনের মাসের পুণ্যিমায় ওদের গায়ে অন্নমচ্ছব, চলে আসুন। গান শুনবেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তো যাবই। কী তুমিও যাবে তো?
সুবল রমেশরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘গুরুমা না গেলে হয়?’
গুরুমা? এতক্ষণে তার নামটা জেনেছি: সাধনাবালা। একে কোথা থেকে জোটালো গৌরবাবা? আমার সঙ্গী উৎপল বলল, ‘আপনাকে পরে বলব।’
